চলতি বছরের ২৬ মার্চ। চীনের হাইনান প্রদেশের কিয়ংহাই বোয়াও বিমানবন্দরে অবতরণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বহনকারী চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইনসের বিশেষ উড়োজাহাজ। বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪টায় অবতরণ করা উড়োজাহাজ থেকে নামার পথে বিছানো ছিল লালগালিচা। প্রধান উপদেষ্টাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন হাইনান প্রদেশের গণসরকারের ভাইস গভর্নর ওয়াং জুনশো।
চীনে অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরটি ছিল চারদিনের। সফরে দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় দুই দেশের সম্পর্ক ‘নতুন উচ্চতায়’ নিয়ে যাওয়ার কথা। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সফরে হওয়া বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচির প্রশংসা করেছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের চীন সফর—সবকিছু দুই দেশের সম্পর্ক আরো গভীর হওয়ার ইঙ্গিতবাহী মনে হলেও চীনের পক্ষ থেকে সরকারি পর্যায়ে বড় কোনো প্রকল্পের ঘোষণা বা কোনো ঋণ প্রতিশ্রুতির আশ্বাস নেই।
গত ২৫ জুন প্রকাশ হয়েছে বিদেশী ঋণের প্রতিশ্রুতি ও ছাড়ের হালনাগাদ তথ্য। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ওই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ১১ মাসে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও চীনের থেকে ঋণ প্রতিশ্রুতির অর্থমূল্য শূন্য।
ইআরডির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রতিশ্রুতি নিয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে খুব নিকট ভবিষ্যতে বড় কোনো প্রকল্পের জন্য ঋণ চুক্তি বিষয়ে কোনো আলোচনা এখনো হয়নি। অতি সম্ভাবনাময় (হাইলি প্রবাবল) হিসেবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গৃহীত নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ‘ফোর ভেসেল’ প্রকল্প যেকোনো দিন স্বাক্ষর হতে পারে। এ প্রকল্পের অর্থমূল্য অন্তত ৩০ কোটি ডলার। এগুলো নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে। মোংলা বন্দরের কমার্শিয়াল কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর হয়েছে। আগামীতে হাসপাতাল নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। সেটাও জিটুজিতে হবে। ইআরডি থেকে চীনকে একাধিক ঋণ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সেগুলো চীনা কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করছে। এ বিষয়ে চীনের কোনো প্রশ্ন থাকলে ইআরডি উত্তর দিচ্ছে। সব মিলিয়ে ঋণ চুক্তির প্রক্রিয়া চলমান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘চীনা ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। দেশটির আমলাতন্ত্র অনেক স্ট্রং। আবার আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক পরিবর্তনও একটা ফ্যাক্টর। গত আগস্টে বর্তমান সরকার কাজ শুরু করার পর সবকিছু বুঝে নিতে কিছুটা সময় গেছে। বর্তমান সরকার অনেক চীনবান্ধব। এ প্রেক্ষাপটে আমরা কাজ করছি। কিন্তু একটা উদ্যোগ নেয়ার পর রাতারাতি সেটা সম্পন্ন হয় না। সব মিলিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে দুই-তিন বছর সময় লেগেই যায়।’
ইআরডির সংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র বলছে, ফোর ভেসেল হাইলি প্রবাবল লিস্টের একটি প্রকল্প। এছাড়া চলতি অর্থবছরের আরো কয়েকটি প্রকল্প মূল্যায়ন পর্যায়ে আছে। কিন্তু এগুলো কবে নাগাদ স্বাক্ষর হবে তা বলা যাচ্ছে না। অনেক দিন ধরেই চীন থেকে বড় কোনো প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাচ্ছে না। এর সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়। তবে মোটা দাগে একটা কারণ আছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ইআরডির আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আগে ডলারে প্রকল্প ঋণ নেয়া হতো। চীনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আছে আরএমবিতে ঋণ নেয়ার। এক্ষেত্রে সুদহার, বিনিময় মূল্যসহ বাংলাদেশের অনেক কিছু বিবেচনা করতে হচ্ছে। এগুলো নিয়ে দরকষাকষি হচ্ছে। আমরা এক রকম বলছি, ওরা আরেক রকম বলছে।’
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণে গত ১১ মাসে অন্তত একটি ঋণ প্রতিশ্রুতি চীনের পক্ষ থেকে না আসাটা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন না পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্টরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঋণ চুক্তি না হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ ইআরডির পক্ষ থেকে বলা সম্ভব। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক বেশ সৌহার্দপূর্ণ। অতি সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেভাবে এগোচ্ছে তাতে চীনের প্রতিশ্রুতি না আসার কোনো কারণ নেই। চীনা মুদ্রায় ঋণ গ্রহণের আলোচনাটি কেবল বড় ঋণ চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এসব ক্ষেত্রে চীনারা চূড়ান্ত চুক্তিতে আসতে দেরি করতে পারে। কিন্তু ২০১৬ সালের মতো দেড় বা ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তির ক্ষেত্রে চীনা মুদ্রায় ঋণের বিষয়টি প্রতিবন্ধক হওয়ার কথা না।
তবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারণ যেটাই হোক গত ১১ মাস নয়, চীন থেকে নতুন কোনো ঋণ সহায়তার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি মিলছে না প্রায় দুই অর্থবছর ধরে। বিশেষ করে ২০২৪ পঞ্জিকাবর্ষের শুরুতে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। এ বিষয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ভঙ্গুরতা আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিল চীন। পটপরিবর্তন হতে পারে এমন অনুমানও করতে পেরেছিল বেইজিং। এ কারণে গত বছরের জুলাইয়ের শুরুতে শেখ হাসিনার চীন সফরে অবকাঠামো খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো ঋণ চুক্তির ঘোষণা আসেনি। সফরসূচির নির্ধারিত সময়ের আগে দেশে ফিরে এসেছিলেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের পতনের পর আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল চীন থেকে ৭ বিলিয়ন ডলার সহায়তার আশ্বাস পাওয়ার কথা জানায়। যদিও এ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো চুক্তি সই হয়নি।
এমন অবস্থায় প্রধান উপদেষ্টার সফরে দেশটি থেকে বড় অর্থনৈতিক সহায়তা পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা ছিল অনেকের। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতির পর্যবেক্ষক, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিকভাবে নির্বাচিত সরকার না আসার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার ক্ষেত্রে রক্ষণশীল মনোভাব প্রদর্শন করতে পারে চীন।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে চীন থেকে এ-যাবৎকালে পাওয়া অর্থসহায়তার মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে কোনো প্রতিশ্রুতি না এলেও ছাড় হয়েছে ৪১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার।
বর্তমানে চীনের অর্থায়নে চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু রেললিংক প্রকল্প, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অধীনে ডাবল পাইপলাইনের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং স্থাপন প্রকল্প, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের সিস্টেম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, পিজিসিবির সঞ্চালন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং রাজশাহী ওয়াসার সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন। এসব প্রকল্পের সবগুলোরই ঋণ সহায়তার চুক্তি সই হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আগে।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এ মুহূর্তে চীনের কাছে বাংলাদেশের বড় কিছু আশা করাটা ভুল মনে করেন চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকার, ভিন্ন রকম আচরণ করলেও তারা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছেন না। বরং আরো জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের বুঝতে হবে যে অন্তর্বর্তী সরকার বললেই বোঝা যায় যে এর কোনো স্থায়িত্ব নেই। অর্থাৎ তাদের সঙ্গে বড় ধরনের বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি, বড় প্রকল্প শুরু করাটা যুক্তিযুক্ত না। বেসরকারি খাতে দুই পক্ষ মিলে গেলে আর কোনো সমস্যা নেই। সেক্ষেত্রে কোন সরকার থাকল কি থাকল না, তাতে কিছু যায় আসে না। এ ধরনের প্রকল্প চলতেই পারে। আর আগের থেকে যে প্রকল্পগুলো চলছে সেগুলো যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সেটাও দেখার চেষ্টা করবে চীন।’
ভিন্ন ভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা একেক সময় একেক কথা বলছি—বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘চীন থেকে ফিরে আসার কয়েকদিনের মধ্যে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার প্রেক্ষাপটে মাতারবাড়ীর সঙ্গে তুলনা করা হলো। বলা হলো পায়রা বন্দর একটা খাল বন্দর। আমাদের নিজেদের বন্দরসংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা যদি এ কথা বলেন তাহলে চীন কি খুব খুশি হবে? এটা অনুধাবন করা প্রয়োজন যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন হলো অন্তর্বর্তী সমর্থন। ফলে চীন রাজনৈতিক সরকার এলে তখন তাদের সঙ্গে কাজ করাটা উচিত মনে করছে। এজন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে সফরে নিয়ে যাচ্ছে। বোঝার চেষ্টা করছে যে এ দলগুলো কী চিন্তা করছে—বাংলাদেশ কোনদিকে যাবে? চীনের যেসব প্রকল্প আছে, সেগুলো নিয়ে তাদের ধারণা কী? চীনের কাছে তারা কী আশা করে—সবকিছু চীন বোঝার চেষ্টা করছে। ফেব্রুয়ারিতে যদি নির্বাচন হয়, আগে থেকেই সব গুছিয়ে রাখা ভালো মনে করছে তারা। তারা ভবিষ্যতের চিন্তাভাবনা করে এগোচ্ছে।’
সংগত কারণেই ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন এখন কার্যকর সাড়া দেবে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘চীনের রাজনীতিটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ৫ আগস্টের পরে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে একটা অবনতি ঘটেছে, যা চীনের অনুকূলে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব তৈরি করতে চীন এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। যার প্রস্তুতি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও অন্য সফরগুলো হয়েছে। আর ঋণ অর্থায়ন বা বিনিয়োগ হার্ড ইস্যু। এজন্য তারা অবশ্যই রাজনৈতিক সরকারকে অগ্রাধিকার দেবে। রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে যখন ঋণ চুক্তি হয় তখন সেটার স্থিতিশীলতা থাকে। যেমন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতি হলেও কোনো ঋণ চুক্তি বাতিল হয়নি। আলটিমেটলি চীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকারের জন্যই অপেক্ষা করছে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রতি চীনের সমর্থন কৌশলগত। আর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সখ্যতা মূলত ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি। দেশটি বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ অবকাঠামো বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করে রাখছে। রাজনৈতিক দলের সফর হলো তাদের সঙ্গে আগে থেকে চীনের বোঝাপড়ার ক্ষেত্র তৈরির কৌশল।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক কাঠামোয় একটা বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যেকোনো উন্নয়ন অংশীদারের অবস্থান “ওয়েট অ্যান্ড সি” হওয়ার কথা। সাম্প্রতিক সময়ে চীনে বাংলাদেশীদের সফরের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও যাচ্ছেন, যা বিভিন্ন খাতের নতুন অ্যাক্টরদের মাধ্যমে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। হয়তো এর মাধ্যমে চীন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করছে। এ ধারাবাহিকতায় অনেক প্রতিশ্রুতি হয়তো শুধু আলোচনা পর্যায় পর্যন্ত রয়ে গেছে, কিন্তু কোনো ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। আমি মনে করি রাজনৈতিক সরকারের চেয়েও চীন বেশি অপেক্ষা করছে স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থার জন্য। চীনকে বরাবরই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনাগ্রহী দেখা যায়। তারা মূলত চায় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের বিনিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে। ওই স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থাটা কীভাবে আসবে সেটার জন্যই তারা পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রেখেছে।’
চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলের ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল চীন সফরে যায়। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা ছাড়াও তাদের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের নেতারাও ছিলেন প্রতিনিধি দলে। প্রতিনিধি দলে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ রাশেদ খান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা প্রমুখ।
গত ২২ জুন রাতে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীন যায়। সফরে দলটির মহাসচিবের সঙ্গে ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, সুকোমল বড়ুয়া, জহির উদ্দিন স্বপন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল ও চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার।
সর্বশেষ চীন সফরে বিএনপির প্রতিনিধি হিসেবে গিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান। এ সফর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এবারের সফরে নানা বিষয়ে আলাপ হয়েছে। এক্ষেত্রে ঋণ বা বিনিয়োগের চিত্রটি এখনো কেন আগের থেকে ঊর্ধ্বমুখী হয়নি কিংবা নির্বাচিত সরকারের জন্য তারা অপেক্ষা করছে কিনা সেটি বলতে পারছি না। তবে সব দেশই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ কিংবা ঋণের ক্ষেত্রে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।’
সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যারা পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনায় আসবে বা আসার সম্ভাবনা রয়েছে তাদেরই চীন আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এখন মূলত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হৃদ্যতার জন্য এ সফরগুলো হচ্ছে। ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারকে প্রাধান্য দেবে দেশটি। এর কারণ হলো নির্বাচিত সরকার থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে।’
এ প্রসঙ্গে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চীনের সঙ্গে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সব দিক দিয়ে সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে। সম্প্রতি চীন-বাংলাদেশ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচন হয়েছে বলে মনে করছে সরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বাস্তব ফল হিসেবে নতুন কোনো বিনিয়োগ বা ঋণ না পাওয়ার বিষয়টি কিছুটা সংশয় তৈরি করছে। হতে পারে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে বিলম্ব হচ্ছে অথবা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা সম্ভাব্য নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়েও চীন ধীরে সুস্থে অগ্রসর হতে চাচ্ছে।’
ঋণ প্রতিশ্রুতি না দেয়ার কারণ জানতে ঢাকার চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।