নাগরিক প্লাটফর্মের সংলাপে বক্তারা

বৈষম্য দূর না হলে সুষ্ঠু বিচার নির্বাচন ও সংস্কার সম্ভব নয়

দেশে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা, নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শিশু, প্রবীণ, বহু ভাষা ও ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে একটি সর্বজনীন বৈষম্যবিরোধী আইন প্রবর্তন করার তাগিদা দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

দেশে লিঙ্গবৈষম্য দূর করা, নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, শিশু, প্রবীণ, বহু ভাষা ও ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে একটি সর্বজনীন বৈষম্যবিরোধী আইন প্রবর্তন করার তাগিদা দিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে এবং কার্যকরী সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার আহ্বান তাদের।

গতকাল রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম, বাংলাদেশ আয়োজিত ‘‌একটি কার্যকর বৈষম্যবিরোধী আইন প্রবর্তন’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে সহযোগিতা করেছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও নাগরিক উদ্যোগ।

সংলাপে সভাপতিত্ব করেন নাগরিক প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘‌বাংলাদেশে বৈষম্য মোকাবেলায় একটি আইনি কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। বিগত সরকারের আমলেও আমরা সর্বজনীন বৈষম্যবিরোধী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলাম, খসড়াও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তখন তারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা সাহস দেখাতে পারেনি। গত বছরের আগস্টে ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বৈষম্যবিরোধী চেতনা উন্মোচিত হয়েছে, সেটি আমাদের উৎসাহিত করেছে। এটি শুধু কোটা বা মেধার আন্দোলন নয় বরং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন।’

তিনি বলেন, ‘‌আমি এখানে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চাই। বিচার, নির্বাচন ও সংস্কার। আপনি যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চান তাহলে সব নাগরিককে সুরক্ষা দিতে হবে। তার মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। বিচার পাব, ন্যায্য বিচার চাইব কিন্তু নাগরিকের সুরক্ষা থাকবে না, এটা হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন—আগামীর নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে সেখানে সব নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বশেষ সংস্কার। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা না গেলে সেখানে সংস্কার কার্যকর হবে না। এসব ক্ষেত্রে নাগরিকের সর্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করাটা জরুরি।’

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর আমাদের আশা ছিল বৈষম্যবিরোধী আইনটি কার্যকর করা হবে, কিন্তু হতাশ হয়েছি। এখনো কৌশলগত জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। চাইলে তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে খসড়া তৈরি করা যাবে। এ সরকার যদি এ আইনের খসড়া দিয়ে যেতে না পারে তাহলে সেটি হতাশাজনক হবে। আমরা বলব আইনের খসড়া করে একটি প্রকৃত আইন হিসেবে চূড়ান্ত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যেন এটি থাকে। এখানে নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলের নেতারা একসঙ্গে কাজ করতে পারে।’

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘‌বাংলাদেশে বৈষম্যটা শুরু হয়েছে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান বিভাজনের মধ্য দিয়ে। এরপর এল রাজনৈতিক বৈষম্য। কে কোন রাজনৈতিক দল করে সেটা অনুসারে ভাগ করা শুরু হলো। গ্রামে-গঞ্জেও রাজনৈতিক বিভাজন ও বিবাদের কারণে সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়েছে। এখন সমাজের বৈষম্য দূর করতে হলে এ আইনটি দরকার।’ এ সময় তিনি বৈষম্যবিরোধী আইনের কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মত দেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ‘‌অনগ্রসর জাতিকে এগিয়ে নিতে ও তাদের অধিকার আদায়ে আইনটি গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্য নিরসনের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, বরং এটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরও। বাংলাদেশের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক যত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে সেখানে বলেছে বৈষম্যহীন সমাজের কথা। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনো সে বৈষম্য দূর হয়নি। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর লিঙ্গীয়, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, ভাষার, ধর্মের বৈষম্যগুলো বেশি। ভারতে যেমন নারীদের আলাদা কমিশন রয়েছে, পাকিস্তানে প্রতিবন্ধীদের জন্য ভিন্ন আইন রয়েছে, সেটি বাংলাদেশে নেই। এখন আমাদের বৈষম্যবিরোধী আইনটা নিয়ে কাজ করতে হবে। আগামী নির্বাচনে যারা ক্ষমতায় যাবে তাদেরও এটা প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে ক্ষমতায় এলে আইন কার্যকর করবে।’

আরো বক্তব্য রাখেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, এমসিসিআই সভাপতি কামরান ত. রহমান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রমুখ। সংলাপে উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী মানবাধিকার কর্মী রানী ইয়ান ইয়ান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ড্রাগান পোপোভিচ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ, অধ্যাপক এসআর ওসমানীসহ আদিবাসী, শ্রমিক, প্রতিবন্ধী, উর্দুভাষীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।

আরও