টাঙ্গাইল থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়কটিতে চার লেনের উন্নয়নকাজ শেষের পথে। এ কাজে ব্যয় হচ্ছে ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। এ দুই প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও ঈদযাত্রায় যানজট পিছু ছাড়ছে না ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে। ঈদুল ফিতরের মতো এবার ঈদুল আজহার যাতায়াতেও যানজটের ভোগান্তিতে পড়ছেন উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীরা। গতকাল দুপুরের পর থেকে মহাসড়কটির কড্ডা-চন্দ্রা এবং চন্দ্রা-নবীনগর অংশে ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে যানজট দেখা দেয়। আজ গাজীপুর অঞ্চলের শিল্প-কারখানা ছুটি হলে ঘরমুখী মানুষের চাপে এ যানজট তীব্র আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু যানজট নয়, ঈদযাত্রায় মহাসড়কটি হয়ে ওঠে দুর্ঘটনাপ্রবণও। গতকাল ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রড বোঝাই ট্রাক উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ১৫ জনের মধ্যে নয় জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভাঁরশো ইউনিয়নের বাসিন্দা। এ দুর্ঘটনার জন্য ট্রাকচালককে দায়ী করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। গতকাল ঢাকার ফার্মগেটে মেট্রোরেলের স্টেশনে সিনিয়র সিটিজেন, প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। তবে রাস্তার অবকাঠামো বা ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল না।’
টাঙ্গাইলের দুর্ঘটনায় নিহত সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা খরচ বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকের ছাদে বাড়ি ফিরছিলেন। এ মহাসড়কে প্রতিবারই ঈদযাত্রায় ট্রাক, পিকআপের মতো পণ্যবাহী যান, বাসের ছাদসহ বিভিন্ন বাহনে মানুষকে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে দেখা যায়। গতকাল সরেজমিন মহাসড়কটি ঘুরেও এমন চিত্রের দেখা মিলেছে।
এবারের ঈদযাত্রায় গতকাল পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ছাড়া দেশের অন্য কোনো মহাসড়কে বড় ধরনের যানজটের খবর পাওয়া যায়নি, যদিও সব মহাসড়কে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান উন্নয়নকাজ ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে যানজটের অন্যতম কারণ। মহাসড়কটির আশপাশে গড়ে ওঠা হাটবাজার এবং নানামুখী বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনাও যানজট তৈরি করছে। এছাড়া বিদ্যমান যমুনা সেতুকে মহাসড়কটির যানজটের অন্যতম উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোর যে চরিত্র, সেটি আমরা পাচ্ছি না। কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলায় কোথাও দুই লেন থেকে চার লেন হচ্ছে, আবার কোথাও চার লেনের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফ্লাইওভারের কাজও আংশিক হয়েছে। ফলে এত বিশাল বিনিয়োগের পরও পুরো চার লেনের সুবিধা বা গতি আমরা তৈরি করতে পারিনি, অনেক জায়গায় বটলনেক (সংকুচিত পথ) রয়ে গেছে।’
ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
অধ্যাপক হাদিউজ্জামান হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বিশাল বিনিয়োগ হলেও আমরা ল্যান্ডইউজ প্ল্যান বা ভূমি ব্যবস্থাপনা করতে পারিনি। এটি আমাদের বড় ব্যর্থতা। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, অবকাঠামোর সঙ্গে ভূমি ব্যবস্থাপনার ইন্টিগ্রেটেড বা সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি। তা না হলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত গতি যেমন আসবে না, তেমনি সড়ক দুর্ঘটনা কমানো বা সেফ মবিলিটি (নিরাপদ চলাচল) নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে না। আর এর বড় মাশুল আমাদের দিতে হবে।’
এদিকে এবারের ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ২৫টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এসব জায়গায় অতিরিক্ত গাড়ি, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং পশুবাহী ট্রাকের কারণে তীব্র যানজট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে চন্দ্রা ফ্লাইওভারের পশ্চিম প্রান্ত, কালিয়াকৈর, এলেঙ্গা, যমুনা সেতু টোল প্লাজা, হাটিকুমরুল আন্ডারপাসসহ বিভিন্ন মোড়, বাজার ও হোটেলের সামনে গাড়ির গতি ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশ বেশকিছু ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করলেও সরকারের সেতু বিভাগ বলছে, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত অংশে বর্তমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং গৃহীত সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের ফলে ঈদের সময়ে যানবাহন চলাচলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা বা যানজটের আশঙ্কা নেই।
এ প্রসঙ্গে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত অংশটি ঈদযাত্রায় বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এবার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নির্মিত দুই লেনের সার্ভিস সড়ক ও মূল সড়কের সমন্বয়ে পুরো অংশে কার্যত চার লেনের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে, যার ফলে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারবে। এছাড়া যমুনা সেতুর পূর্ব গোলচত্বর থেকে ইব্রাহিমাবাদ রেল স্টেশন পর্যন্ত ৭০০ মিটার নতুন সড়কও যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’
এবার রেলপথে আনুষ্ঠানিকভাবে ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে গত শনিবার। প্রথম দুইদিন রেলপথে স্বস্তি নিয়ে মানুষ যাতায়াত করলেও গতকাল ঢাকা ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে মানুষের অতিরিক্ত চাপ চোখে পড়েছে। একাধিক আন্তঃনগর ট্রেনের ছাদে যাত্রীদের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের দৃশ্যও দেখা গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ট্রেনের এসি বগিতে দাঁড়ানো যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করলেও গতকাল একাধিক ট্রেন পরিদর্শন করে এসি বগিগুলোতেও দেখা গেছে উপচে পড়া ভিড়।
গতকাল একাধিক ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয়ের খবর পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চলগামী ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ২ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্বে চলাচল করছে বলে অভিযোগ করেন যাত্রীরা।
গতকাল বিকাল থেকে ঢাকার সদরঘাটেও বাড়তে শুরু করে ঘরমুখো যাত্রীর চাপ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এবারের ঈদে নদীপথে প্রায় ১০-১২ লাখ মানুষ যাতায়াত করতে পারে। এ বিপুলসংখ্যক যাত্রীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রায় ১৭৫টি লঞ্চ।