চলতি বছরের ৩০ জুন এক প্রজ্ঞাপনে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। ঘোষণা আসার পরও অতিরিক্ত দুই দিন চালু ছিল দেশের সব মিল। শিল্প-কারখানা অবসায়নের নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন পাওনা পরিশোধের কার্যক্রম শুরু হলেও অতিরিক্ত দুই দিনের কার্যদিবস নিয়ে আপত্তি রয়েছে শ্রমিকদের। কোরবানির ঈদের প্রায় এক মাস আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া পাটকলে ঈদ বোনাস ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বিষয়টিও অমীমাংসিত থাকায় শ্রমিকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।
সর্বশেষ ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের হাফিজ জুট মিলের শ্রমিকরা বকেয়া বেতন ও কোরবানির ঈদের বোনাস প্রদানসহ একাধিক দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। দেশের অন্য মিলগুলোতেও শ্রমিকরা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় বন্ধ সত্ত্বেও ন্যায্য পাওনার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী পাওনা বঞ্চিত হওয়ায় কর্মজীবনের শেষদিকে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশাও বাড়ছে।
পাটকল শ্রমিকদের দাবি, সরকার ১ জুলাই থেকে মিল বন্ধ ঘোষণা করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের সুবিধায় পরবর্তী দুই মাস অর্থাৎ জুলাই ও আগস্টের মূল বেতন পরিশোধ করবে। কিন্তু ৩০ জুনের প্রজ্ঞাপন হলেও ১ ও ২ জুলাই কারখানা চালু থাকায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সুবিধাও যুক্ত হবে প্রাপ্ত পাওনাদিতে। পাশাপাশি ৬০ দিনের মজুরি, গ্র্যাচুইটি, পিএফ সুবিধা, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সুবিধায় বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হলে শ্রমিকদের প্রাপ্যতা আরো বাড়বে।
চট্টগ্রামের নয়টি পাটকলের স্থায়ী, অস্থায়ী ও বদলি শ্রমিক এবং মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী ৩০ জুন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু ঘোষণা এলেও নথি পৌঁছাতে বিলম্বের কারণে জুলাইয়ের প্রথম দুই দিন অতিরিক্ত কাজ করেন শ্রমিকরা। সরকারের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ঘোষণায় শ্রমিকদের অতিরিক্ত দুই মাসের মূল বেতন দেয়া হবে। এক্ষেত্রে পাটকলগুলো জুলাই ও আগস্ট দুই মাসের কর্মহীন মূল বেতন প্রদানের হিসাব বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) কাছে পাঠিয়েছে। এ কারণে অতিরিক্ত দুই দিনের বেতন-ভাতা ও বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় বিজেএমসির সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন শ্রমিকরা। এরই মধ্যে ২৬ জুলাই খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির চেষ্টা করেন শ্রমিকরা। পরে পুলিশের চাপের মুখে বিক্ষোভ চালাতে না পারলেও ক্রিসেন্ট জুট মিল ও ইস্টার্ন জুট মিলে কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিকরা। চট্টগ্রাম ও ঢাকার একাধিক পাটকলেও গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের সুবিধাদির অস্পষ্টতা নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে যাচ্ছেন শ্রমিকরা।
২০১৫ সালের সরকারি বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ১ জুলাই একযোগে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়ে আসছেন। এর আগে চাকরিতে যোগদানের দিনই বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি কার্যকর ছিল। এর ফলে পাটকলের স্থায়ী শ্রমিকরা জুলাইয়ের ১ ও ২ তারিখ কর্মরত থাকায় সরকার ঘোষিত বাড়তি দুই মাসের বেতন ইনক্রিমেন্টসহ পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশের অপরাপর পাটকলগুলোতেও দাবি আদায়ে একাধিক আন্দোলন কর্মসূচি দিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের প্রথম সারির কয়েকটি পাটকলের প্রকল্প প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার ৩০ জুন থেকে পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণা করলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্ধ হয়েছে আরো দুই দিন পর। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ঘোষণা অনুযায়ী শ্রমিকরা কোরবানি ঈদের বোনাস পাবেন না। তবে বাড়তি দু্ই দিন কাজ করলেও সরকারি কর্মচারী হিসাবে জুলাইয়ের ইনক্রিমেন্টসহ জুলাই ও আগস্টের মূল বেতন পাওয়ার কথা। কিন্তু বিজেএমসি থেকে বর্ধিত বেতনের হিসাব চাওয়া হয়নি। তবে চূড়ান্ত হিসাবের সময় বাড়তি দু্ই দিনের বেতন পরিশোধের বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। এসব কারণে বোনাসসহ বাড়তি বেতন ও ইনক্রিমেন্টের দাবিতে পাটকলগুলোতে নতুন করে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি পাটকলের শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ঘোষণা দেয়ার পরও চিঠি না আসায় জুলাইয়ের প্রথম দুই দিন শ্রমিকরা মিলে কাজ করেছেন। জুলাইয়ে সরকারি কর্মচারীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে সরকার বাড়তি দুই মাস (জুলাই ও আগস্ট) কাজ না করিয়েও মূল বেতন প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু জুলাইয়ের অতিরিক্ত কাজ করানোর ফলে বর্ধিত বেতনের বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে লিখিত কোনো নির্দেশনা না থাকায় মিল কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না শ্রমিকদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের একটি পাটকলের শ্রমিক নেতা বণিক বার্তাকে বলেন, সরকার ৩০ জুন মিল বন্ধ করলেও জুলাইয়ের দুই দিন কাজ করেছেন শ্রমিকরা। সরকার ৬০ দিনের কাজহীন বাড়তি মজুরি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত দুই দিন কাজ করায় সেপ্টেম্বর মাসের অতিরিক্ত দুই দিনের মজুরি প্রদান করতে হবে।
বিজেএমসির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা মো. মঈনুদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী পাটকল শ্রমিকরা সব সুবিধা পাবেন। মিলগুলো অতিরিক্ত দুই দিন বাড়তি কাজ করলেও বিজেএমসি থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সরকার গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের কারণে শ্রমিকদের কোনোভাবেই বঞ্চিত করবে না বলে মনে করছেন তিনি।