অর্থনীতিকে আমূল বদলে দেয়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ও পরিকল্পনা থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এক সম্পদশালী গোষ্ঠী গড়ে তুলেছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে রফতানিমুখী শিল্পভিত্তিক উন্নত অর্থনীতিতে রূপান্তরের জন্য স্থানীয় বৃহৎ পুঁজিপতিদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন দেশটির সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পার্ক চুং-হি। এজন্য ব্যক্তি খাতের পরিবারভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া হয় ভর্তুকি, প্রণোদনা, করছাড়, সহজ অর্থায়নসহ সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা। আবার এগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে পণ্য, সেবা, ব্যবস্থাপনাসহ ব্যবসার প্রতিটি অনুষঙ্গ নিয়ে নিয়মিতভাবে গবেষণা-উন্নয়ন চালিয়ে যায়, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়। জোর দেয়া হয় ব্যবসার সামাজিক ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর। রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে বৃহৎ আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণে উৎসাহ দেয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় হয়ে ওঠা নিশ্চিত করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ ও জনকল্যাণমূলক ভিত্তি গড়ে তোলার বিষয়টি নিশ্চিত করে সরকারের নীতিমালা ও নজরদারি।
ষাটের দশকে গৃহীত এ উদ্যোগের সুফলও মিলেছিল অল্প সময়ের মধ্যে। ব্যবসার গণ্ডি বড় হয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো রূপ নেয় বৈশ্বিক জায়ান্টে। পারিবারিক এসব ব্যবসা দক্ষিণ কোরিয়ায় পরিচিতি পায় চেবল (চে=সম্পদ, বল=গোষ্ঠী) হিসেবে। স্যামসাং, হুন্দাই, এলজি, লোটের মতো দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক বৈশ্বিক জায়ান্ট ব্র্যান্ডগুলোর প্রায় সবক’টিই সফল চেবলের উদাহরণ। দেশটির রফতানি আয় ও বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে এ প্রতিষ্ঠানগুলোই। আজকের দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর অন্যতম করে তোলার পেছনে এসব প্রতিষ্ঠানকেই কৃতিত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি।
এক যুগেরও বেশি সময় আগে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণ কোরীয় মডেলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে আনার ওপর জোর দেন নীতিনির্ধারকরা। সরকারি সুযোগ-সুবিধায় অগ্রাধিকার পেতে থাকে কিছু ব্যবসায়িক গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান, যার অন্যতম ছিল সামিট গ্রুপ। নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা ছিল, দেশের অর্থনীতিতে চেবলের মতোই বড় ভূমিকা রাখবে প্রতিষ্ঠানগুলো।
ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র (আইপিপি), এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ক্ষেত্রে সামিটের প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে বেশি। নানা মাত্রায় দেয়া হয়েছে কর ও শুল্ক সুবিধা। এর ধারাবাহিকতায় খাতটিতে তৈরি হয়েছে সামিট গ্রুপের একক আধিপত্য। যদিও এখন পর্যন্ত দেশের অর্থনীতিতে দক্ষিণ কোরীয় চেবলগুলোর মতো ভূমিকা নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে এখনো বড় মাপের কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম দাঁড় করাতে পারেনি সামিট গ্রুপ। বরং আইনি ইনডেমনিটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনুকূল চুক্তির সুবাদে ক্যাপাসিটি চার্জ ও বিক্রয় মূল্যসহ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে পাওয়া আয়ই হয়ে উঠেছে তাদের ব্যবসার বড় ভিত্তি।
বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচ্ছে সামিট গ্রুপ। গত বছরের জুলাইয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগের উপস্থাপিত তথ্যে উঠে আসে, পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জয়েন্ট ভেঞ্চারটিকে হিসাবে না নিলে দেশে আইপিপিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ নিচ্ছে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত সামিট গ্রুপকে ৪ হাজার ৪০৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে, যা এ সময়ের মধ্যে পরিশোধিত মোট ক্যাপাসিটি চার্জের প্রায় ১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
সামিট গ্রুপের ব্যবসায়িক মডেলকেই প্রতিষ্ঠানটির চেবল হয়ে ওঠার পথে বড় অন্তরায় হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে তাদের কয়েকজন বণিক বার্তাকে বলেন, সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা করছে সরকারের সঙ্গে চুক্তি বা অনুমোদনের ভিত্তিতে। ফলে চেবলের বৈচিত্র্যপূর্ণ বিনিয়োগ সামিট গ্রুপের ক্ষেত্রে তেমন একটা দেখা যায় না।
আবার চেবলগুলো নিজ দেশের বাইরে বিস্তৃত পরিসরে ব্যবসা চালালেও তা নিয়ন্ত্রিত হয় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান কার্যালয় থেকে। অন্যদিকে সামিট গ্রুপের ব্যবসা মূলত বাংলাদেশকেন্দ্রিক হলেও গ্রুপটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর হোল্ডিং কোম্পানি সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল নিবন্ধিত হয়েছে সিঙ্গাপুরে।
প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের বাজারসংক্রান্ত যেসব ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হয়, সেগুলো সামিটের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। আবার সামিটের বিদ্যমান ব্যবসাগুলোয় নতুন পণ্য উদ্ভাবনের সুযোগও নেই বললেই চলে। যদিও গবেষণার মাধ্যমে নিত্যনতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বাজার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি দক্ষিণ কোরিয়ার চেবলগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য।
তুলনামূলক কম ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনের প্রয়োজনীয়তার অভাব প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক মডেলে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে (আরঅ্যান্ডডি) বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টিকে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, বিস্তৃত ব্যবসার পরিধিও সামিট গ্রুপকে চেবলের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। গ্রুপটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল ক্রেতা প্রধানত সরকার। ভোক্তা পর্যায়ে গ্রুপটির অধীন কোম্পানিগুলোর তেমন কোনো উপস্থিতি নেই বললেই চলে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের একক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বিপিডিবি এখন আর্থিক সংকটে আইপিপিগুলোর পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন বজায় থাকলে সামিটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোসহ সব আইপিপিই বড় ধরনের বিপাকে পড়ে যেতে পারে। আবার সরকারের নীতিগত যেকোনো সিদ্ধান্তও সামিটসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
সামিট পাওয়ার লিমিটেডের (এসপিএল) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১-২২ হিসাব বছরে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে ২০ শতাংশেরও বেশি। এজন্য প্রধানত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্রয় চুক্তির (পিপিএ) মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া, সরকারের নতুন গৃহীত ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা, যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি ও পাওনা অর্থ আদায়ে বিলম্বকে দায়ী করা হয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ও এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে সামিটের। এর এলএনজি স্টোরেজ সক্ষমতা ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এবং রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট। মহেশখালীতে আরো একটি এফএসআরইউ ও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সামিট। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানিনির্ভর এ বিনিয়োগকে নাজুক করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা খাতসংশ্লিষ্টদের।
সামিটের হাত ধরেই দেশে প্রথম আইপিপি স্থাপন হয় ১৯৯৭ সালে। বর্তমানে এ খাতের সবচেয়ে বড় নাম হয়ে উঠেছে সামিট। এ গ্রুপই এখন বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের দেয়া সরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও প্রধান সুবিধাভোগী। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশী আইপিপিগুলোর মোট স্থাপিত সক্ষমতার প্রায় ২১ শতাংশই সামিটের। গ্রুপসংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ২০। এগুলোর মোট স্থাপিত ও প্রক্রিয়াধীন উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে আইটি, বন্দর ও রিয়েল এস্টেট খাতেও। আঞ্চলিক ফাইবার অপটিকস কেবলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতকে যুক্ত করেছে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড। এছাড়া বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের বিষয়টিও এখন প্রক্রিয়াধীন। কোম্পানিটির সাবসিডিয়ারি সামিট টাওয়ার্স লিমিটেডের মাধ্যমে দেশের টেলিকম খাতের টাওয়ার শেয়ারিং ব্যবসায়ও নাম লিখিয়েছে সামিট গ্রুপ।
সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেডের (এসএপিএল) মাধ্যমে বন্দর ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে সামিট গ্রুপ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি হয়ে উঠেছে দেশের সবচেয়ে বড় অফ-ডক (অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল) ফ্যাসিলিটিগুলোর অন্যতম। তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি দেশের রফতানি পণ্যের কনটেইনারের ২০ শতাংশ এবং আমদানি পণ্যের কনটেইনারের ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। মুন্সিগঞ্জে এসএপিএলের গড়ে তোলা মুক্তারপুর টার্মিনাল দেশে বেসরকারি খাতের প্রথম অভ্যন্তরীণ নৌ টার্মিনাল ফ্যাসিলিটি। কোম্পানিটির একটি সাবসিডিয়ারি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট ইস্ট গেটওয়ে (আই) প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে ভারতের কলকাতা বন্দরের জেটি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটির সিঙ্গাপুরভিত্তিক সাবসিডিয়ারি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট পিটিই লিমিটেড আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করে। চট্টগ্রাম, মুক্তারপুর ও কলকাতার বন্দর ব্যবসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করে এ সাবসিডিয়ারি। ভারতের পাটনায়ও একটি বন্দর উন্নয়নের কাজ পেয়েছে সামিট, যা এখন নির্মাণাধীন।
আবাসন খাতের ব্যবসার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট রয়েছে সামিট গ্রুপ। ঢাকায় ৩২ লাখ বর্গফুট স্পেস নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গ্রুপটি। পাঁচ তারকা ও চার তারকা হোটেল নির্মাণের কাজও করেছে তারা। এছাড়া বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাই-টেক পার্ক স্থাপনের কাজ করেছে সামিট টেকনোপলিস লিমিটেড।
বাংলাদেশের বাইরে ভারতের ত্রিপুরায় প্রথমবারের মতো একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শেয়ার কিনেছে সামিট। ওএনজিসি ত্রিপুরা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ কিনেছে সামিট ইন্ডিয়া (ত্রিপুরা)। তবে এ শেয়ার অধিগ্রহণের বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি এখনো বাকি আছে।
২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এবং অন্যান্য বিনিয়োগকারীকে নিয়ে সিঙ্গাপুরভিত্তিক সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করে। পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বিদ্যুৎ প্রকল্প উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) চুক্তি করে সামিট। এছাড়া ফিনল্যান্ডভিত্তিক ওয়ার্টসিলার সঙ্গে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে সামিট। বর্তমানে জেরা, জিই, মিত্সুবিশি ও তাইয়ো ইন্স্যুরেন্স সামিটের ইকুইটি হোল্ডার্স হিসেবে রয়েছে।
বেশ কয়েক বছর ধরেই ফোর্বসের তালিকায় সিঙ্গাপুরের অন্যতম শীর্ষ ধনী হিসেবে নাম আসছে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খানের। তবে গত বছর প্রথমবারের মতো সম্পদের পরিমাণের দিক দিয়ে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারের ক্লাবে প্রবেশ করেছেন তিনি। ফোর্বসের ২০২২ সালের তালিকায় সিঙ্গাপুরের ধনীদের মধ্যে ৪২তম অবস্থানে রয়েছেন মুহাম্মদ আজিজ খান। ফোর্বসের তথ্য বলছে, সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এলএনজি অবকাঠামোর ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ট্রেডিং ব্যবসা হিসেবে যাত্রা করা সামিট পরবর্তী সময়ে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস ও আবাসন খাতের ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়। তবে বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসা থেকেই সামিট সবচেয়ে বেশি আয় করে। ২০১৯ সালে সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের ২২ শতাংশ শেয়ার ৩৩ কোটি ডলারে কিনে নেয় জাপানস এনার্জি ফর নিউ এরা (জেরা)। এতে কোম্পানিটির ভ্যালুয়েশন দাঁড়ায় দেড় বিলিয়ন ডলারে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খানের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করার পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত প্রশ্নপত্রও পাঠানো হয়। যদিও এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তার দুই ভাই মো. ফরিদ খান ও লতিফ খানও এখন তার সঙ্গে গ্রুপটির ব্যবসা দেখভাল করছেন।
গ্রুপটির ভাইস চেয়ারম্যান মো. ফরিদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতের ব্যবসায় বেশকিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেজন্য তো ব্যবসা ছেড়ে চলে যাওয়া যায় না। আমরা চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা কীভাবে মোকাবেলা করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করছি। সাবমেরিন কেবল স্থাপনের জন্য আমরা কাজ করছি। বর্তমানে মহেশখালীতে আমাদের একটি এফএসআরইউ টার্মিনাল রয়েছে। আমরা আরেকটি এফএসআরইউ পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছি। ভারতের ত্রিপুরায় একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অংশীদারত্ব কেনার উদ্যোগ চলছে। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার এলএনজি ব্যবসায় বিশেষ করে শ্রীলংকা, ভারত ও পাকিস্তানে এলএনজি ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার বিষয়েও আমাদের আগ্রহ রয়েছে। এক্ষেত্রে জেরার সঙ্গে সামিটের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব সহায়ক হবে। যদিও এক্ষেত্রে বলার মতো অগ্রগতি এখনো হয়নি।’
সিঙ্গাপুরে সামিটের কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুরের ক্রেডিট রেটিং বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। সেজন্য আমরা সেখানে কোম্পানি খুলেছি, যাতে কম সুদে ঋণ পেতে সুবিধা হয়।’
সরকারের অনুকূল নীতিসহায়তা নিয়ে সামিটের ব্যবসার পরিধি প্রত্যাশামাফিক বেড়েছে কিনা জানতে চাইলে মো. ফরিদ খান বলেন, ‘সরকার এ পর্যন্ত আমাদের যেসব প্রকল্প দিয়েছে আমরা সেগুলো সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পেরেছি। সরকার আমাদের আরো প্রকল্প দিলে আমরা সেগুলোও করতে পারতাম। কিন্তু সবকিছু শুধু আমাদেরই দেবে, তা তো নয়। অন্যরাও তো রয়েছে।’
বর্তমানে সামিট গ্রুপের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যরাও। এর মধ্যে আজিজ খানের তিন মেয়ে আয়েশা আজিজ খান, ড. আদিবা আজিজ খান ও আজিজা আজিজ খান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের পর্ষদে রয়েছেন। তারাও বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বসবাস করছেন। মো. ফরিদ খানের ছেলে ফয়সাল করিম খানও সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত কোম্পানিটির পর্ষদে পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে রয়েছেন।
সামিট গ্রুপের ব্যবসা সম্পর্কে ফয়সাল করিম খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি এফএসআরইউ, জ্বালানি, বন্দর, কমিউনিকেশনস এবং আবাসন খাতে সামিটের ব্যবসা রয়েছে। আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে প্রবেশের মাধ্যমে আমরা আশা করছি এসব খাতের ব্যবসায় আরো প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারব এবং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে দক্ষ ও কার্যকর সমাধান সরবরাহ করতে সক্ষম হব। বিদ্যমান যেসব খাতে আমাদের ব্যবসা রয়েছে সেগুলোই আমরা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। বিশেষ করে আমাদের জাপানি অংশীদার জেরাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ অন্বেষণ করছি।’