রাজধানীর রামচন্দ্রপুর খালটি শুরু হয়েছে মোহাম্মদপুর বসিলা এলাকার লাউতলা খাল থেকে। সেখান থেকে মোহাম্মদিয়া হাউজিং হয়ে শেখেরটেকের পেছন দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তুরাগ নদে গিয়ে পড়েছে খালটি। একসময়ের প্রশস্ত খালটি এখন দখল-দূষণে প্রায় ভরাট হয়ে পড়েছে। ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস খতিয়ান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খালটির প্রায় অর্ধেকই এখন দখলদারের কবলে।
সরজমিনে দেখা গেছে, খালের ওপর সরকারি রাস্তা, প্রস্তাবিত খেলার মাঠ, ট্রাক স্ট্যান্ড, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন বাসাবাড়িসহ ছোট-বড় অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে। এরই মধ্যে নির্মাণাধীন কয়েকটি ভবন ভেঙে দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এর পরও খালটির ওপরে রয়ে গেছে প্রভাবশালীসহ বিভিন্নজনের গড়ে তোলা অনেক স্থাপনা।
নথিপত্র ঘেঁটে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খালটির মোট দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৪২ দশমিক ৪৪ শতাংশ এলাকা ২০২২ সালের মধ্যেই দখল হয়ে যায়, যার পরিমাণ ৫ দশমিক ৯৫১ হেক্টর। গত এক বছরে এখানে খালপাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে আরো অনেক স্থাপনা, যেগুলো খালটিকে আরো সংকুচিত করে তুলেছে।
খাল দখল করে গড়ে ওঠা সব ধরনের স্থাপনা অপসারণের দাবি তুলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থাকলে প্রায় অর্ধেক বেদখল খাল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অতীতে রাজধানীর জলাশয়গুলো দখলমুক্ত করার নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও তা অল্প দিনের মাথায় আবার থেমেও গেছে। বর্তমানে ডিএনসিসি খালটি আবার দখলমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে এটিও যাতে থেমে না যায়, সে বিষয় নিশ্চিত করাও জরুরি।
খালটির বর্তমান অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে নদী ও জলাভূমি গবেষক এবং রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালটি নিয়ে আমাদের একটি গবেষণা চলমান রয়েছে। সর্বশেষ গত মাসে আমরা খালটি সরজমিনে পরির্দশন করি। গত বছরের পুরো সময়ে আমরা খালটি নিয়ে জরিপ চালিয়েছি। সিএস ম্যাপ অনুযায়ী দৈর্ঘ্যের হিসাবে খালটি প্রায় অর্ধেক হারিয়ে গেছে বা বেদখল হয়ে পড়েছে। মোহাম্মদিয়া হাউজিং, মোহাম্মদিয়া সোসাইটি লিমিটেড, বসিলা হাউজিংয়ের পাশ দিয়ে খালটি ১০০ ফুটের বেশি প্রশস্ত ছিল। মোহাম্মদিয়া হাউজিং ও সোসাইটির মধ্য দিয়ে যে রাস্তাটি বেড়িবাঁধ পর্যন্ত গেছে, এ রাস্তার কিছু অংশ খালের ওপর করা। আগে এ রাস্তা ছিল না। খাল দখল করেই এ রাস্তা করা হয়েছে। আমরা খালপাড়ের এমন কোনো জায়গা পাইনি যেখানে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী স্থাপনা নেই। পুরো খালেই অল্পবিস্তর দখল রয়েছে।’
রামচন্দ্রপুর খালের দখলদারদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তালিকা এখনো তৈরি করেননি সরকারের সংশ্লিষ্টরা কর্মকর্তারা। তবে বেসরকারি একটি সূত্র বলছে, নদীর পাশে হওয়ায় খালটি এখনো পুরোপুরি বেদখল হয়ে যায়নি। বরং খালের পাড়ে প্রতিটি অংশেই দখল রয়েছে। খালটি দখল করে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাসাবাড়ি, খেলার মাঠ, অফিস, বিশ্ববিদ্যালায় নির্মাণ হয়েছে। দখলের ৫৬ শতাংশই ব্যক্তি বাসাবাড়ি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনা। ৩৬ শতাংশ সরকারি ও বেসরকারি রাস্তা। ২ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে কৃষিকাজের জন্য। ৩ শতাংশ খোলা জায়গা ও আরো ৩ শতাংশ জলাভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ডিএনসিসির পক্ষ থেকে খালটির পুরনো অবস্থা ফিরিয়ে আনতে নতুন কার্যক্রম শুরু করা হয় গত শুক্রবার। ওইদিন খাল পরিষ্কারের পাশাপাশি খালের সীমানায় অবৈধ দখলও উচ্ছেদ শুরু হয়। সংস্থাটি বলছে, খালটিকে সিএস খতিয়ান অনুযায়ী পুনরুদ্ধার করা হবে। এর সীমানায় যেকোনো দখল উচ্ছেদে ডিএনসিসির কঠোর অবস্থান বজায় থাকবে।
রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও নগর উষ্ণতা মোকাবেলায় রামচন্দ্রপুর খালসহ অন্যান্য খাল-জলাশয় দ্রুত পুনরুদ্ধার প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের (ইএসআরএম) বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা দুঃখজনক যে গত এক দশকেই ঢাকার খালগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ হারিয়ে যায়। ডিএনসিসি রামচন্দ্রপুর খাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। আমরা আগেও দেখেছি এ ধরনের উদ্যোগ বেশি দূর এগোতে পারেনি। আমাদের প্রত্যাশ্যা থাকবে, এবার যেন রামচন্দ্রপুর খাল আগের রূপে ফিরে আসে, সেভাবে ডিএনসিসি তাদের কর্মযজ্ঞ সমপন্ন করে।’
রামচন্দ্রপুর খালের দখল নিয়ে ২০১৯ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এতে বলা হয়, ‘রামচন্দ্রপুর খালের প্রবাহ গাবতলী হয়ে দক্ষিণ দিকে বেড়িবাঁধের কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একসময় খালটির একাংশ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্ট বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হতো। ইউল্যাব রামচন্দ্রপুর খালের ওপর সড়ক নির্মাণ করেছে এবং স্থায়ী দেয়াল দিয়ে খালটিকে দুই অংশে বিভক্ত করে ফেলেছে। জাকের পোলট্রি ফার্ম পয়েন্টে এসে একটি স্লুইস গেটের মাধ্যমে খালের পানি তুরাগ নদে পড়ছে। আবার ঢাকা ওয়াসাও খালটি দিয়ে তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলছে। এভাবে পয়োবর্জ্যসহ তরল বর্জ্য নদীতে ফেলা বেআইনি।’
সরজমিনে দেখা গেছে, ছোট-বড়, স্থায়ী-অস্থায়ী অসংখ্য অবকাঠামোয় প্রায় ঠাসা রামচন্দ্রপুর খাল। খালটির একাংশের প্রবাহ বন্ধ করে অবকাঠামো বানিয়েছে ইউল্যাব। নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লিখিত খাল দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউল্যাবের রেজিস্ট্রার ফয়জুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই খালের প্রবাহ বন্ধ করিনি। বরং আমরা এটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করছি। এ খালের প্রবাহ অনেক আগে থেকেই নেই।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা আজও এ খালের বিষয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা বলে দিয়েছে, সিএস ম্যাপ ধরেই আমরা খাল উদ্ধার করব। এজন্য আমরা কাউকে কোনো নোটিস দেব না। আমরা খাল পরিষ্কারের পাশাপাশি সীমানা নির্ধারণও করে দিচ্ছি। ওই সীমানার ভেতর যে স্থাপনাই থাকবে সেটিকেই আমরা অপসারণ করব।’