এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অসম-অপ্রতিযোগিতামূলক চুক্তির ভিত্তিতে উৎপাদনে আসছে একের পর এক আইপিপি। এসব চুক্তির নানা দিক নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন পর্ব-২
দেশের স্বতন্ত্র উৎপাদকদের (আইপিপি) কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সময় টাকায় এর দাম পরিশোধ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। যদিও পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ) অনুসারে, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ হয় মার্কিন সেন্টে (ডলারের ক্ষুদ্রতম একক)। এক্ষেত্রে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিপিডিবিকে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। জ্বালানি কেনা ও বিদেশী ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে আইপিপিগুলোকেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। সব মিলিয়ে মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিরতা দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পিপিএ মেনে আইপিপিগুলোর কাছ থেকে বিপিডিবির কেনা বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করা হয় মার্কিন সেন্টে, প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা হিসেবে। পরে তা টাকায় পরিশোধ করা হয়। বিদ্যুতের ক্রয়মূল্যকে এভাবে ডলারের বিনিময় হারের সঙ্গে বেঁধে দেয়ার বিষয়টিকে ডলার ইনডেক্সেশন হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ অনুযায়ী ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বিদ্যুৎ কেনায় বিপিডিবির ব্যয়ও বেড়ে যায়। অবশ্য দেশী উদ্যোগে গড়ে ওঠা ৩০ মেগাওয়াটের কম সক্ষমতার আইপিপির ক্ষেত্রে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয় না।
ডলার ইনডেক্সেশনের নিয়ম অনুযায়ী, ডলারের বিনিময় হার যখন ৮৫ টাকা ছিল, সে সময় প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ১০ সেন্টে বিক্রির চুক্তিবদ্ধ আইপিপিকে প্রতি ইউনিটের জন্য বিপিডিবিকে পরিশোধ করতে হয়েছে সাড়ে ৮ টাকা। ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে পরিশোধ করতে হচ্ছে ১০ টাকারও বেশি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্থানীয় মুদ্রায় আইপিপিগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিদ্যুতের নানা আইন ও নীতিমালার জালে সে প্রক্রিয়াগুলোয় জটিলতা তৈরি করা হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোক্তা এবং এ খাতের ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বৈদেশিক মুদ্রায় ক্রয়চুক্তি করা হয়েছে। এতে আইপিপি খাত বড় হবে, বিপিডিবির আর্থিক ঘাটতি তৈরি হবে। সে ঘাটতি পূরণে সরকারের কাছ থেকে টাকা নেয়া হবে। সেই টাকা তুলতে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়া হবে, যা গিয়ে পড়বে গ্রাহকের ঘাড়ে। এগুলো একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হচ্ছে। এখানে এক ধরনের কৌশল তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে বাণিজ্যিক ঋণ, জয়েন্ট ভেঞ্চার এবং এ খাতের ক্রয়সংক্রান্ত ডলারের বিষয়গুলো শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া এ প্রক্রিয়ারই অংশ।’
টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বর্তমানে বিপিডিবিকে বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২১-২২ অর্থবছরে এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান হয়েছে ৬১১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরে লোকসান হয়েছিল ৭৫ লাখ টাকার মতো। ফলে সর্বশেষ অর্থবছরে বিপিডিবির পুঞ্জীভূত লোকসান বেড়ে ৬৫ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিপিডিবিকে একটি অলাভজনক সংস্থা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির সদস্য (অর্থ) সেখ আকতার হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আর্থিক ঘাটতি তো তৈরি হচ্ছেই। বিদ্যুৎ কেনায় ঘাটতির অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরকার বিপিডিবিকে দিচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিপিডিবির দিক থেকে কিছু করার নেই।’
আইপিপি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যবসায় লাভ-লোকসান থাকতেই পারে, এটি ব্যবসার অংশ। কিন্তু মুদ্রার বিনিময় হারের ঝুঁকির বিষয়টি তো আইপিপিগুলো নিজের ওপর কখনই নেবে না। টাকায় দাম পরিশোধ করা হলেও ডলারের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি থাকার কারণেই কিন্তু বিদেশী ঋণ পাওয়া সম্ভব হয়েছে। কারণ ডলারে বিদ্যুতের দাম পরিশোধ করা না হলে বিদেশী কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডলারে ঋণ দেবে না। চুক্তির সময়সীমা থাকা পর্যন্ত এ শর্ত পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই বলেও মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ফয়সাল করিম খান এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিপিডিবি ও আইপিপিকে বাড়তি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। খুচরা যন্ত্রাংশ, জ্বালানি ও ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে আইপিপিগুলোকে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। কারণ এইচএফও আমদানির তারিখে প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ধরে বিপিডিবি বিল পরিশোধ করেছে। কিন্তু তারা যখন বিল পরিশোধ করেছে তখন ডলারের দাম বেড়ে ১০৬ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতি ডলারে ২০ টাকা করে লোকসান গুনেছে আইপিপিগুলো।’
দীর্ঘদিন ধরেই দেশে প্রতি ডলারের দাম ছিল ৮৫-৮৬ টাকা। গত বছরের এপ্রিলেও ৮৬ টাকার ঘরে ছিল। এরপর থেকেই অস্থিরতা শুরু হয় ডলারের বাজারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে সর্বশেষ ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতি ডলার সর্বোচ্চ ১০৭ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ডলারের এ ঊর্ধ্বমুখিতার কারণে বিদেশী ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২২ সালের জুন শেষে দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বর শেষে তা ২৪ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত বছরের শেষ ছয় মাসে ব্যবসায়ীদের বিদেশী ঋণ কমেছে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ৮১ কোটি ডলার কমেছে। আর দীর্ঘমেয়াদি ঋণ কমেছে ৩০ কোটি ডলার। মূলত বিদেশী উৎস থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের ডেফার্ড পেমেন্ট, ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও বায়ার্স ক্রেডিটের পরিমাণ কমেছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের কিছু ঋণের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। যেসব ক্ষেত্রে বিদেশী ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান ঋণের মেয়াদ বাড়াতে রাজি হয়নি, সেগুলো পরিশোধ করা হয়েছে। দেশের মোট বিদেশী ঋণের এক-তৃতীয়াংশই বিদ্যুৎ খাতের।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্বাহী বোর্ডের সভায় এ বছরের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এক্ষেত্রে বেশকিছু শর্ত ও সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে বাংলাদেশকে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আনুষ্ঠানিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ। এ বছরের জুন শেষে এটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা হলে ডলারের বিপরীতে টাকার আরো অবমূল্যায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
আইএমএফের তথ্যানুসারে, গত পাঁচ অর্থবছর ধরে বাংলাদেশের প্রকৃত বিনিময় হার গড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। উচ্চমূল্যস্ফীতির মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের গড় প্রকৃত বিনিময় হার বেড়েছে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। গত বছরের জুন-অক্টোবর সময়ে এটি বেড়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন অনুসারে, বাংলাদেশের প্রকৃত বিনিময় হারের ব্যবধান ২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে থাকবে। এক্ষেত্রে মধ্যমান ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রকৃত বিনিময় হার বাড়ার মানে হচ্ছে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের চাপ আরো বাড়বে। ২০২১-২২ অর্থবছরের ডলারের বিপরীতে টাকার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। গত বছরের জুন-নভেম্বর সময়ে টাকার অবমূল্যায়নের হার ছিল ১১ দশমিক ৮ শতাংশ।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে। এটি এখন বড় উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ক্রয়চুক্তি দায়বদ্ধতা যেহেতু ডলারে, ফলে মুদ্রার অসামঞ্জস্যতা তৈরিতে এ খাতে একটা অস্থিরতা হবেই। স্থিতিশীলতা না থাকলে এটি বিদ্যুৎ খাতকে আরো ভোগাবে।’
ডলার ব্যতিরেকে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি স্থানীয় মুদ্রায় শর্তসাপেক্ষে করা যায় কিনা এমন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আর এটি করার সুযোগ নেই। কিংবা এখান থেকে বের হওয়ার কোনো বিকল্প পথ নেই। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিকল্প পথগুলো তৈরি করার দরকার ছিল।’