মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরী

কারখানার বর্জ্যে শতাধিক বিঘা জমিতে ফসল ফলছে না

মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ও রাসায়নিকমিশ্রিত দূষিত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করার কারণে স্থানীয় খাঞ্জার হাওরে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফসল উৎপাদন না হওয়ায় শতাধিক বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে আছে।

মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীর বর্জ্য ও রাসায়নিকমিশ্রিত দূষিত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করার কারণে স্থানীয় খাঞ্জার হাওরে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফসল উৎপাদন না হওয়ায় শতাধিক বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে আছে। তাছাড়া স্থানীয় পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দূষিত পানির কারণে একজিমাসহ বিভিন্ন চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয়রা। বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় কৃষিজীবী পরিবারের সদস্যদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

বিসিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার গিয়াসনগর ইউনিয়নের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কলাগোয়া গুমরা মৌজার ১৫ একর ভূমি অধিগ্রহণ করে ১৯৮৭ সালে গড়ে ওঠে বিসিক শিল্পনগরী। এ শিল্পনগরীর ১০১টি প্লটে ৬১টি ইউনিট বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বরাদ্দ নিয়েছে। এর মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র ৩৭টি ইউনিটে প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। বাকিগুলো আছে নামসর্বস্ব। এতে বিসিক শিল্পনগরী গড়ার উদ্দেশ্য পড়ছে মুখ থুবড়ে। বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানায়, মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীতে অ্যামিন্যান্স কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, স্টার এগ্রো, বেঙ্গল ফুড, লক্ষ্মী এডিবয়েল, আগর-আতর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন কোম্পানি উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেরই নেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে কারখানার বর্জ্য ও রাসায়নিকমিশ্রিত পানি খাল-নর্দমা দিয়ে কাছের খাঞ্জার হাওরে নির্গত হচ্ছে। এ কারণে এই হাওরে কমেছে ফসল উৎপাদন। দূষিত বর্জ্যের কারণে স্থানীয় গুমরা মৌজার শতাধিক বিঘা জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন হচ্ছে না।  অনাবাদি পড়ে আছে এসব জমি।

সরেজমিনে দেখা যায়, নর্দমা দিয়ে অবাধে নিকটবর্তী খাঞ্জার হাওরের জমিতে নির্গত হচ্ছে বিসিকের রাসায়নিকমিশ্রিত পানি। শিল্পনগরীর লাগোয়া খাঞ্জার হাওরের জমিগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে। চারদিকে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। হাওরের বিসিকের কাছের অধিকাংশ জমি অনাবাদি পড়ে আছে।

স্থানীয় চাষীরা জানান, কারখানার বর্জ্য ও বিষাক্ত পানির কারণে কৃষিজমির উর্বরা শক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এ কারণে আউশ, আমন কিংবা কোনো ধরনের সবজি উৎপাদন হচ্ছে না। বিসিকের কাছের জমিতে একেবারেই ফসল ফলে না। বিসিক শিল্পনগরীর সীমানা থেকে একটু দূরের জমিতে চাষাবাদ করলে অল্প ফসল ফলে। কিন্তু তাতে উৎপাদন খরচ না আসায় কেউ ফসল ফলাতে চায় না।

স্থানীয় নিতেশ্বর গ্রামের মুজিব মিয়া জানান, বিসিক কৃষকদের শেষ করে দিয়েছে। ফসল না ফলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শতাধিক কৃষক পরিবার। ক্ষতির প্রভাব পড়ছে অন্যদের ওপরও। বিসিক শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

গুমড়া গ্রামের মোতালিব মিয়া জানান, কারখানার ময়লা-আবর্জনা নালা দিয়ে হাওরে যাচ্ছে। রাসায়নিকের প্রভাবে হাওরে এখন মাছ নেই। দূষিত পানি ত্বকে লাগলেই চুলকায়। অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন চর্মরোগে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) মৌলভীবাজার জেলার সমন্বয়ক আসম সালেহ সুহেল বলেন, এখানকার কারখানাগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বিসিক কর্তৃপক্ষ এবং কারখানা মালিকরা অন্যের ক্ষতি করতে পারেন না। খাঞ্জার হাওরকে বাঁচাতে দ্রুত বিসিকের সব কারখানার ইটিপি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান তিনি।

মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরীর উপব্যবস্থাপক মো. বিল্লাল হোসেন ভূঁইয়া জানান, সাময়িকভাবে স্থানীয় কৃষক কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এটা ঠিক। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য (ইটিপি) পানি শোধন যন্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি, শিগগিরই তা বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। আর এটি বাস্তবায়িত হলে দূষণ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আরও