রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা পৃথক‌্করণ

রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কতটা সহায়ক হবে

দেশে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে থাকা রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম পৃথক করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

দেশে দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে থাকা রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রম পৃথক করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। শেষ পর্যন্ত সোমবার মধ্যরাতে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে বহুল কাঙ্ক্ষিত এ পৃথক্‌করণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে সরকার। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সংস্কারের নামে বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পৃথক্‌করণের উদ্যোগ সেভাবে কাজে আসেনি। তাছাড়া দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়নের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। পাশাপাশি এ পৃথক্‌করণের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে এনবিআরের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের এ উদ্যোগ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কতটুকু সহায়ক হবে সেটি এখনই নিশ্চিত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এনবিআরের নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায় কার্যক্রমকে পৃথক করার লক্ষ্যে সোমবার রাতে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করে সরকার। অধ্যাদেশ অনুসারে সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নামে দুটি আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করবে। এ দুই বিভাগ প্রতিষ্ঠার পর এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দুটি বিভাগই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে। সরকার দুই বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করবে। দুই বিভাগ প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞাপন জারির পর এনবিআরের বিদ্যমান জনবল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে ও আইআরডির বিদ্যমান জনবল রাজস্ব নীতি বিভাগে ন্যস্ত করা হবে।

রাজস্ব নীতি বিভাগের কাজের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব জোগানের লক্ষ্যে সম্প্রসারণমূলক কর ভিত্তি, যৌক্তিক করহার, সীমিত কর অব্যাহতির নীতি অনুসরণ করে উত্তম কর ব্যবস্থা প্রবর্তন; তফসিলে বর্ণিত আইনসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইন নতুন করে প্রণয়ন কিংবা এর সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ; রাজস্ব নীতিসংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান, প্রজ্ঞাপন, এসআরও প্রণয়ন, সংশোধন এবং এর ব্যাখ্যা প্রদান করা। এছাড়া স্ট্যাম্প ডিউটি, আয়কর, ভ্রমণ কর, দান কর, সম্পদ কর, কাস্টমস-শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক), সম্পূরক শুল্ক, আবগারি শুল্ক, সারচার্জ এবং অন্যান্য শুল্ক-করাদি, ফি আরোপ, হ্রাস-বৃদ্ধি ও অব্যাহতি প্রদান-সংক্রান্ত কার্যক্রম; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত অটোমেশন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করবে রাজস্ব নীতি বিভাগ। একই সঙ্গে কর আইন প্রয়োগ এবং কর আহরণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন; রাজস্ব নীতি বাস্তবায়ন বিষয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করা; কাস্টমস-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদন ও মতামত প্রদান; আন্তর্জাতিক দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি-সংক্রান্ত কার্যক্রম; রাজস্ব নীতি-সংক্রান্ত কার্যক্রমের দক্ষতা, কার্যকারিতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং সরকার কর্তৃক সময় সময় প্রদত্ত অন্য যেকোনো দায়িত্ব পালন করা প্রভৃতি।

কর আপিল ট্রাইব্যুনাল, কাস্টমস, এক্সাইজ এবং মূল্য সংযোজন কর আপিল ট্রাইব্যুনাল রাজস্ব নীতি বিভাগের সংযুক্ত দপ্তর হিসেবে গণ্য হবে। সরকার উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে রাজস্ব নীতি বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ প্রদান করবে বলে অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব নীতি বিভাগের বিভিন্ন পদে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর, কাস্টমস, অর্থনীতি, ব্যবসা প্রশাসন, গবেষণা ও পরিসংখ্যান, প্রশাসন, নিরীক্ষা ও হিসাব এবং আইন-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে।

রাজস্ব নীতি প্রণয়নে সরকারকে সহায়তা করতে অধ্যাদেশে একটি পরামর্শক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। রাজস্ব নীতি বিভাগকে নিয়মিত পরামর্শ প্রদানের জন্য অর্থনীতিবিদ, রাজস্ব বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ, হিসাব ও নিরীক্ষা বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী সংগঠন ও পেশাজীবী প্রতিনিধি ও ট্যারিফ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ এর প্রতিনিধিত্বে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করবে সরকার।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক দশক ধরেই এনবিআরের নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম পৃথক করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। যে নীতি প্রণয়ন করবে সেই আবার রাজস্ব আহরণ করবে এটি তো সাংঘর্ষিক। সেই বিবেচনায় রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা পৃথক করাটা প্রয়োজন ছিল। দুই বিভাগের শীর্ষ পদগুলোতে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ করা হলে এ পৃথক্‌করণে সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুই বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে বিবিএসের পরিসংখ্যান ও তথ্য বিভাগ আলাদা করা হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল, পরিসংখ্যানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, এখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। দক্ষ, অভিজ্ঞ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের এখানে পদায়ন করা হবে। কিন্তু পরে দেখা গেল যে এখানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরই শীর্ষ পদগুলোতে পদায়ন করা হচ্ছে, বিপরীতে বিভিন্ন উইংয়ের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তারা সেভাবে সুযোগ পাচ্ছেন না।’

একটা নতুন বিভাগ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়—জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এ অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক্‌করণ করা হয়েছে। এরপর কর নীতির সংস্কার করতে হবে। করফাঁকি রোধ করা গেলে বর্তমানে যে হারে রাজস্ব আহরণ হচ্ছে, সেটি বজায় রেখেও রাজস্ব আহরণ বাড়ানো সম্ভব। তবে এ পৃথক্‌করণ নিয়ে এনবিআরের কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমানে যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, সেটি প্রশমন করা না গেলে রাজস্ব আহরণে প্রভাব পড়তে পারে।’

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের কার্যপরিধির বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, তফসিলে বর্ণিত আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধির প্রয়োগ, কাস্টমস-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন; আন্তর্জাতিক দ্বৈত কর পরিহার-সংক্রান্ত চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন; বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শুল্ক ও আবগারি) এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কর) ক্যাডারের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও এর অধীন দপ্তরগুলোর ক্যাডার-বহির্ভূত মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা করা। এছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের কার্যপরিধিতে আরো রয়েছে করভিত্তি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কর সেবা, উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি জোরদার করা, সবাইকে করজালের মধ্যে আনতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের বাজেট প্রণয়ন, বাজেট বাস্তবায়ন এবং লজিস্টিকস-সংক্রান্ত কার্যক্রম; রাজস্ব ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কার্যক্রমের দক্ষতা, কার্যকারিতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করা ইত্যাদি।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সরকার রাজস্ব আহরণ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন যোগ্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করবে। তাছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের আয়কর, মূল্য সংযোজন কর এবং কাস্টমস আইন বাস্তবায়ন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগগুলোর বিভিন্ন পদে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শুল্ক ও আবগারি) এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কর) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ করা হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপের (ইআরজি) নির্বাহী পরিচালক ড. সাজ্জাদ জহির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নীতিগতভাবে এ বিভাজনটা প্রয়োজন ছিল। তবে রাজস্বনীতি প্রণয়নের বিষয়টি যদি আগের মতোই আমলাতন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখা সম্ভব হবে এমন একটি পদ্ধতি গড়ে তোলাটা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিকভাবে যেকোনো পরিবর্তন এলে প্রথমদিকে রাজস্ব আহরণ কমবে। যদি এ রূপান্তরকে ঠিকমতো সম্পন্ন করা যায় তারপর রাজস্ব আহরণ বাড়বে। বর্তমানে যে পৃথক্‌করণ করা হয়েছে এর ফলে রাজস্ব আহরণ বাড়ার সম্ভাবনা আরো কম। কারণ এখানে এরই মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি অনিয়ম তো রয়েছেই। তাছাড়া নীতির বিষয়টি যদি পরামর্শকনির্ভর ব্যবস্থা হয়ে পড়ে, তাহলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। সরকারি ও বেসরকারি অংশগ্রহণ মিলিয়ে জবাবদিহি থাকবে এমন একটি স্বশাসিত ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।’

এনবিআরের কার্যক্রম পৃথক্‌করণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এটি একটি বড় কাঠামোগত সংস্কার। যার লক্ষ্য হলো রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনা থেকে রাজস্বনীতি প্রণয়ন কার্যক্রমকে পৃথক করার মাধ্যমে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব হ্রাস এবং রাজস্ব আহরণের আওতাকে সম্প্রসারিত করা। এ পুনর্গঠন কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক রদবদল নয়, এটি একটি ন্যায্য, উন্নত এবং সক্ষম কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বাংলাদেশের সব নাগরিকের চাহিদা পূরণ এবং তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য রাজস্বনীতি নির্ধারণ পদ্ধতিকে আরো শক্তিশালী করা এবং স্বচ্ছ কর প্রশাসন গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে সরকারের এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে গতকাল এনবিআর বিলুপ্ত করে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল ও এনবিআর সংস্কারের জন্য গঠন করা পরামর্শক কমিটির সুপারিশ প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে এনবিআরের আওতাধীন সব দপ্তরে তিনদিনের কলম বিরতিও ঘোষণা করা হয়েছে।

দেশের কর ব্যবস্থার জটিলতা ও এনবিআরের পদ্ধতিগত দীর্ঘসূত্রতার পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে দেশের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন। তাদের মতে, এনবিআরের নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা পৃথক করাই যথেষ্ট নয়, বরং সামগ্রিকভাবে জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধের উদ্যোগ নিতে হবে।

ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, এনবিআর যখন একসঙ্গে ছিল তখনই সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। এনবিআর সবসময়ই একটি নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থা হিসেবে কাজ করেছে। কখনই রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাদের অধীনে ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার থাকে। কিন্তু এনবিআর ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের কাছ থেকে কর আদায় করতে না পেরে করপোরেটদের ওপর বাড়তি কর চাপিয়ে দেয়। প্রান্তিক পর্যায়ে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো দেশের জিডিপির ১০ শতাংশের মতো। কিন্তু এখান থেকে এনবিআর কোনো কর আদায় করতে পারছে না। মানুষ যদি উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে না পারে কিংবা সেটি যদি তাদের কাছে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে কীভাবে কর দিতে উৎসাহিত হবে। জনগণের করের টাকা কোথায় ব্যয় করা হবে সেটাও নির্ধারণ করতে হবে। একদিকে প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অর্থ বরাদ্দ থাকলেও সরকার তা ব্যয় করতে পারছে না। অন্যদিকে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ করছে। অথচ অর্থনীতি সচল রাখতে প্রতি মাসেই এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এজন্য কোন খাতে অর্থ ব্যয় করা বেশি প্রয়োজন, সেটি সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

কর ফাঁকির কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে উল্লেখ করে আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘বহুজাতিক কোম্পানিগুলো দেশে থাকতে চাচ্ছে না। এর কারণ তারা অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক স্থানীয় কোম্পানি অর্থের বিনিময়ে এনবিআরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এ কারণে বিদেশী কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। পুরোপুরি অটোমেশন করা গেলে এমনিতেই কর আদায় বেড়ে যাবে। পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে একদিকে যেমন অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়, পাশাপাশি এটি দুর্নীতিকেও উৎসাহিত করছে। গত ১০ বছর ধরে বলা হচ্ছে কর জাল বাড়াতে হবে। কিন্তু সেটি কি সম্ভব হয়েছে? নীতি ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করে কী হবে, আপনি যদি আসল জায়গাতে হাত না দেন। তাই শুধু এটি আলাদা করাই যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে দক্ষ করার পাশাপাশি নীতিগুলোকে জনবান্ধব ও ব্যবসাবান্ধব করা প্রয়োজন।’

আরও