অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ছিলেন। ওই সময়ে দেশে রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ আইন প্রণয়ন করে কুইক রেন্টাল ও ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারের (আইপিপি) মাধ্যমে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দেশে চাহিদার বিপরীতে সামঞ্জস্যহীনভাবে বাড়ানো হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে চার গুণ, বিপরীতে ব্যয় বেড়েছে ১১ গুণ। এতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) আর্থিকভাবে চূড়ান্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে অনেকগুলো অস্বচ্ছ চুক্তিও হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি বিদ্যুৎ খাতকে বিগত সরকারের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে মূল্যায়ন করে। যদিও গত এক বছরের বেশি সময়ে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিপিডিবির লোকসান কমেনি। সিস্টেম লস আরো কিছুটা বেড়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের থ্রি জিরো তত্ত্বের প্রতিশ্রুত শূন্য কার্বন নিঃসরণে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের পরিকল্পনা ও অগ্রগতির চিত্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার সামনে উপস্থাপন করা হবে।
বছরের পর বছর অব্যাহতভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে বিপিডিবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে সংস্থাটির ওপর থেকে চাপ কমিয়ে এটিকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করা প্রয়োজন। কিন্তু দেখা গেছে, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও বিপিডিবিকে লোকসান থেকে বের করা যায়নি। বরং বিগত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়ার পরও প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কোটি (প্রাক্কলন) টাকার মতো লোকসান করেছে সংস্থাটি। যার নীরিক্ষা এখন চলছে। এ লোকসানের কারণে বিপিডিবি একদিকে যেমন বিদেশী অর্থ পরিশোধ নিয়ে টানাপড়নে রয়েছে, তেমনি স্থানীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ দেনায় জর্জরিত হয়েছে। অর্থাৎ এ খাতে পুরনো বন্দোবস্তের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে গত ১৬ মাসে দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়েছে এমনটি দেখছি না। পরিবর্তন বলতে পিডিবির আর্থিক চাপ ও ভর্তুকি কমবে, বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমবে। কিন্তু তা তো হয়নি। যদি আগামীর কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে হবে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় সাশ্রয়ে বিপিডিবি কী করছে, তাদের পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। নতুন কোনো কেন্দ্র হচ্ছে কিনা, পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কবে আসছে কিছুই জানা যাচ্ছে না। একটা জিনিস হয়েছে, তা হলো বিদেশীদের বকেয়া পরিশোধ। এটিতে অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু দেশীয় কোম্পানিগুলোর বকেয়া অনেক রয়ে গেছে। বিশেষ আইনের অধীনে বিগত সরকারের অনেকগুলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ড) বাতিল হয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের অনেকগুলোতে বিনিয়োগ হয়ে গেছে। পিপিএ পদ্ধতি বাদ দিয়ে মার্চেন্ট বিদ্যুতের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এ বাজার কাঠামোতে সেটা কতটুকু সফল হবে তা দেখার বিষয়। বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, চাহিদা নিরূপণ ইত্যাদির কাঠামোগত বা প্রক্রিয়ার কোনো পরিবর্তন হয়নি, যা আমার মতে ভালোভাবে পর্যালোচনার দরকার ছিল।’
দেশের বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের সময়ে বিপুল পরিমাণ সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। এ সক্ষমতার বড় অংশ যেমন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, তেমনি উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনে দিতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কেননা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন সক্ষমতায় মনোযোগ দিতে গিয়ে বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কোনো আধুনিকায়ন হয়নি। যে কারণে মফস্বলে বছরের পর বছর লোডশেডিং হচ্ছে। এ লোডশেডিং কাটাতে বিতরণ ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। কিন্তু বিষয়টি অবহেলিত থাকায় বিদ্যুৎ খাতে বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো আধুনিকায়ন না হওয়া মফস্বলে লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ। বিদ্যুৎ বিভাগের উচিত ছিল এ খাতে নজর দিয়ে বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যান ড. এম রেজওয়ান খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের সঞ্চালন খাতে সিস্টেম লস কমিয়ে আনতে পিজিসিবি চেষ্টা করে যাচ্ছে। সামনে আরো ডেভেলপমেন্ট হবে। এখানে সিস্টেমকে আরো আপগ্রেড করার সুযোগ রয়েছে। তবে বিতরণ খাতের সিস্টেম লসের বিষয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো ভালো বলতে পারবে।’ শেষোক্ত বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তবে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে পিজিসিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণে সিস্টেম লস ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, যা সর্বশেষ অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। সঞ্চালন খাতে সিস্টেম লস তুলনামূলক কমানো গেলেও বিদ্যুতের বিতরণ ব্যবস্থায় বড় আকারে সিস্টেম লস রয়েছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর সিস্টেম লস এখনো ১০ শতাংশের ওপরে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে ২ শতাংশকে বিদ্যুতের সিস্টেম লস আদর্শ হিসেবে ধরা হয়।
বছরের পর বছর সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ের বড় অভিযোগ ছিল বিগত সরকারের বিরুদ্ধে। এভাবে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার ফলে বিপিডিবি যেমন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, তেমনি বেসরকারি অনেক কোম্পানি ফুলেফেঁপে বড় হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র না চালিয়ে অনেকে বিপিডিবির কাছ থেকে কেন্দ্র ভাড়া তুলে নিয়েছেন।
বিপিডিবির হিসাব বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি ও আমদানি মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে এক লাখ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টার বেশি। যার মধ্যে বেসরকারি খাত উৎপাদন করে বিক্রি করেছে ৩৫ হাজার ৫০১ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ। সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হয়েছে ৩৪ হাজার ৭২৮ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টায়। যৌথ মালিকানাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়েছে বিপিডিবি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিডিবির যৌথ মালিকানাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৬৮০ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৫ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার থ্রি জিরো তত্ত্বের অন্যতম একটি শূন্য কার্বন নিঃসরণ। ধারণাটি বিশ্বব্যাপী আলোচিত। এ শূন্যের লক্ষ্য বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা করা। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। কিন্তু দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে পিছিয়ে থাকা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশেষ আইনের আওতায় নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সব প্রকল্পের এলওআই বাতিল করে দেয়া হয়েছে। যেখানে বিদেশী বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে কথা বলে জানা গেছে। বরং এসব প্রকল্প বাতিল না করে সরকার আলোচনার মাধ্যমে দর নির্ধারণ করে নবায়নযোগ্য প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার সুযোগ ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ) বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল এ খাতের পলিসিগুলো প্রণয়ন করা। অনেক দেরিতে হলেও সেগুলো প্রণয়ন হয়েছে। তবে এ খাতের যেসব প্রকল্প সরকার ঢালাওভাবে বাতিল করেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করার সুযোগ ছিল। প্রকল্প বাতিল হওয়ার কারণে বাস্তবায়নাধীন খুব বেশি প্রকল্প হাতে নেই। নতুন করে অনুমোদন, চুক্তিসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্নের পর প্রকল্প বাস্তবায়ন করে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যেন বিলম্ব না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিনিয়োগকারীদের মাঝে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে তা দূর করতে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।’
তবে নবায়নয্যোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে সরকার নানাভাবে কাজ করছে বলে জানান সরকারের শীর্ষ নির্বাহীরা। তারা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। নীতিমালাও অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে সরকার কতটুকু এগিয়েছে এমন প্রশ্ন এক বছর কার্যক্রম পরিচালনা করা একটি সরকারের কাছে রাখা খুব বেশি বাস্তবসম্মত বলে আমার মনে হয় না। তার পরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমি বলব, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকার যথেষ্ট দৃঢ় এবং সংকল্পবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে। সরকার ৩০ শতাংশের একটি টার্গেট দিয়েছে। অন্যান্য বারের টার্গেটের চেয়ে এটার সুবিধা হলো এ টার্গেট দিয়ে সরকার বসে থাকেনি। বরং প্রতিটি সরকারি দপ্তরের ছাদে যেন একটি করে সোলার প্যানেল বসানো হয় তার যাত্রাটিও শুরু করে দিয়ে যাচ্ছে।’
সরকারের উদ্যোগ ব্যাখ্যা করে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান আরো বলেন, ‘তবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ থেকে এই এক বছরের মধ্যেই কি সৌরভিত্তিক বিদ্যুতে চলে যাওয়া সম্ভব? কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তো সত্যিকার অর্থে আর হচ্ছে না। কিন্তু গ্যাস আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ হওয়ায় যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার পুরো পরিকল্পনা এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করতে না পারি; যা কিনা ১২ মাসে কোনোভাবেই সম্ভব না ততক্ষণ পর্যন্ত জনগণকে তো বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। সুতরাং সেই জায়গা থেকে প্রয়োজন সাপেক্ষে সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য সরকার আলাদা নীতিই করেছে। সেই নীতি সরকারের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়েছে। সেই অনুসারে কাজও শুরু করে দিয়েছে। এটি আগের নীতির সঙ্গে বর্তমান নীতির বড় একটি পার্থক্য।’
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের অফগ্রিড-অনগ্রিড মিলিয়ে সক্ষমতা ১ হাজার ৬৮৯ মেগাওয়াট। যার মধ্যে ১ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট সরাসরি গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ। যেখানে গ্রিডের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৩৫৯ মেগাওয়াট।
সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে বিগত সরকারের সময়ে যেসব দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছে সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে বিশেষ আইনকে কাজে লাগিয়ে যারা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে সুবিধা নিয়েছে, সেসব অযাচিত চুক্তি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা দরকার ছিল। সেটি এ সরকার করতে পারেনি। জনগণ যেহেতু অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ কিনছে ফলে জনগণের আসলে জানা দরকার এসব চুক্তিতে কাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগীরা এ খাতে এখনো কাজ করছে। তারাই জ্বালানি ও বিদ্যুতের বিভিন্ন প্রকল্পে এখনো নিয়োজিত। এদের বিষয়ে তদন্ত হওয়া দরকার ছিল। সেটি করতে পারেনি এ সরকার। বিপুল পরিমাণ বিল বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। বিদেশীদের বকেয়া পরিশোধ হচ্ছে। অযাচিত চুক্তির আওতায় যেহেতু বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করা হচ্ছে ফলে দেখা দরকার কতটুকু অর্থ তাদের প্রাপ্য। প্রিপেইড মিটারে (গ্যাস-বিদ্যুৎ) ভুতুড়ে বিল কাটা হচ্ছে। কী কারণে কাটা হচ্ছে, এগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার ছিল। বিভিন্ন খাতের সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, কোথায় হচ্ছে সেই সংস্কার? কী সুফল পাচ্ছে জনগণ? তার দৃশ্যমান কিছুই নেই।’
তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে গত এক বছরে বড় আকারের আর্থিক সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা এবং ব্যয় সাশ্রয়ের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে সরকার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা, তা কমিয়ে চলতি অর্থবছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়েছে। বিপিডিবির ১০ শতাংশ ব্যয় হ্রাসের পরিকল্পনা নিয়ে নানামুখী সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে, যা এরই মধ্যে বাস্তবায়নে দেড় হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। তরল জ্বালানি আমদানির সার্ভিস চার্জ ৯ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ৪৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে চলতি অর্থবছরে। এছাড়া মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ কম নির্ধারণ এবং ১০টি মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরনো আইপিপি বা রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে। এতে যথাক্রমে সাশ্রয় হয়েছে আড়াই হাজার কোটি ও ৫২৫ কোটি টাকা। সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর বিদ্যুতের ট্যারিফ কমানোর মাধ্যমে সাশ্রয় করা হয়েছে ২ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। বিশেষ আইনের অধীনে করা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা নিয়ে তদন্ত করছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। এ কমিটি সামনে জানুয়ারির মাঝামাঝিতে প্রতিবেদন জমা দেবে মন্ত্রণালয়ে।
সামগ্রিক বিষয় নিয়ে মতামত জানতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে তার মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও সেখানেও কোনো উত্তর মেলেনি।
তবে গত ২৯ নভেম্বর বণিক বার্তায় প্রকাশিত ‘অর্থনীতির বড় চাপ ভুল জ্বালানি ও বিদ্যুৎনীতি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছিলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিগত সরকার যেসব পরিকল্পনা নিয়েছিল তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। যে কারণে এ খাতে বিপুল পরিমাণ দায়দেনা তৈরি হয়েছে। আমরা যখন এসেছিলাম তখন এ খাতে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের বকেয়া দায় ছিল। যা এখন ৫০০-৬০০ মিলিয়নে নেমে এসেছে। এখন এ খাত সংস্কারের জন্য আমরা সমন্বিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মহাপরিকল্পনা করছি এবং এ পরিকল্পনা আমরা নিজেরাই করছি। যেখানে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হবে। ১৫ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সামনে এ পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে। আমরা দেখাতে চাই কী অবস্থায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাত পেয়েছিলাম। এখন কী অবস্থায় আছে এবং আগামীতে কোনদিকে যাবে। সুনির্দিষ্ট একটা পথরেখা আমরা তৈরি করে যেতে চাই। যাতে আগামী সরকার সেই পথরেখা অনুযায়ী কাজ করতে পারে। অনেকগুলো জায়গা (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে) সংস্কার এরই মধ্যে করা হয়েছে। সবগুলো যেহেতু করতে পারব না। তবে কোথায় কোথায় করা দরকার তার একটা রূপরেখা থাকবে।’