ঢাকার পরিকল্পনা প্রণয়ন-বাস্তবায়নসহ যেকোনো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জনঘনত্ব। বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ শহবের মধ্যে ঢাকার অবস্থান বরাবরই শীর্ষে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর ‘ন্যাশনাল রিপোর্ট’ অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশন নিয়ে গঠিত ঢাকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। কিন্তু দুই সিটির তথ্য বলছে, এ জনসংখ্যা ১ কোটি ৭৫ লাখ। রাজধানীর সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নগর পরিচালনায় জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান জরুরি উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি সংস্থাগুলো এমন অসামঞ্জস্য তথ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ ৯৫ হাজার ৭৮৬। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) জনসংখ্যা ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৩২ লাখ ৭০ হাজার ১৩৫ এবং নারী ২৭ লাখ ৭২ হাজার ৩৭৯ জন। আর তৃতীয় লিঙ্গের ২০৯ জন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মোট জনসংখ্যা ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৪৩৪, নারী ১৯ লাখ ৬৫ হজার ৪৫৯ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১৭০ জন।
তবে ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে দুই সিটি করপোরেশনের নিজস্ব হিসাবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ সিটিতে জনসংখ্যা রয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ। আর ঢাকা উত্তর সিটির সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এ সিটিতে লোকসংখ্যা ৫৫ লাখ। সে হিসাবে দুই সিটির মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ। এদিকে ডিএনসিসির ২০১৯-২০ অর্থবছরের বর্জ্যের রিপোর্টে সংস্থাটির জনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৬১ লাখ। একই বছরের ডিএসসিসির বর্জ্যের রিপোর্ট অনুযায়ী এ সিটির জনসংখ্যা ৬৩ লাখ। সে হিসাবে দুই সিটির জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২৪ লাখ।
বিবিএস ও দুই সিটির জনসংখ্যার হিসাবে অসামঞ্জস্যের পাশাপাশি মিলছে না জনঘনত্বের হিসাবও। বিবিএসের জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩০ হাজার ৫৩১ জন মানুষ বাস করে। আর ঢাকা দক্ষিণে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাস করে ৩৯ হাজার ৪০৬ জন। কিন্তু দুই সিটির ২০১৯-২০ বছরের বর্জ্যের রিপোর্ট বলছে, ডিএনসিসিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩১ হাজার ৪৮৮ এবং ডিএসসিসির প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৫৭ হাজার ৭৯৮ জন মানুষ বাস করে।
ঢাকার জনসংখ্যার সঠিক তথ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দুই সিটির একাধিক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেছেন, জনশুমারির কাজ সিটি করপোরেশন করে না। এটি পুরোটাই বিবিএসের কাজ। তবে দুই সিটি করপোরেশন ধারণা করে একটা সংখ্যা বলে। যেমন উত্তর সিটি করপোরেশন যেকোনো কাগজে বা বক্তৃতার ক্ষেত্রে সেখানকার জনসংখ্যা ৫৫ লাখ উল্লেখ করে। আর দক্ষিণ সিটি এ সংখ্যা এক-দেড় কোটি বলে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ডিএসসিসির চেয়ে ডিএনসিসির জনসংখ্যা বেশি। এর কারণ হিসেবে পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির আয়তন ১০৯ বর্গকিলোমিটার। আর উত্তর সিটি ১৯৬ বর্গকিলোমিটারের, যা ডিএসসিসির প্রায় দ্বিগুণ। তাছাড়া ঢাকা উত্তরে বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যাও বেশি। এসব বিবেচনায়ও ঢাকা উত্তরে জনসংখ্যা বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে ভিন্নমতও রয়েছে কারো কারো। তারা বলছেন, ঢাকা উত্তরের আয়তন বেশি হলেও জনঘনত্ব বেশি ঢাকা দক্ষিণে। ওয়ার্ড সংখ্যার দিক থেকেও ঢাকা দক্ষিণ এগিয়ে। ঢাকা উত্তরে ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৪ এবং জনঘনত্ব ৩০ হাজারের বেশি। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণের ওয়ার্ড সংখ্যা ৭৫ এবং জনঘনত্ব প্রায় ৬০ হাজার। সে হিসাবে ঢাকা দক্ষিণের জনসংখ্যা বেশি হওয়ার কথা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নিয়ে কাজ করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময় ঢাকার জনসংখ্যা নিয়ে কাজ করেছি। বিবিএস যা বলে তার চেয়ে ঢাকার প্রকৃত জনসংখ্যা আরো বেশি হওয়ার কথা। তাই আমরা বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার জন্য বিবিএসের চেয়ে আরো ২০ শতাংশ বেশি জনসংখ্যা ধরে পরিকল্পনা করি। আমাদের হিসাবে ঢাকার জনসংখ্যা দেড় কোটির কাছাকাছি।’
ঢাকার জনসংখ্যার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ঢাকায় বস্তিবাসীর সংখ্যাই ৩০-৪০ লাখ। তাহলে মূল ঢাকার মানুষ কি মাত্র ৬০ লাখ? এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। বস্তিবাসীর সংখ্যা থেকেই অনুমান করা যায় ঢাকার জনসংখ্যার ওপর বিবিএসের প্রতিবেদন নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন করার সুযোগ রয়েছে। ঢাকার মতো মেগাসিটির জনসংখ্যা কত এ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
তবে জনসংখ্যা গণনার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার মতো বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ। তারা বলছেন, গণনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অনভিজ্ঞতা ও সাধারণ মানুষের সচেতনতার অভাবের কারণে সঠিক জনসংখ্যার তথ্য উঠে আসেনি।
ঢাকার জনসংখ্যার প্রশ্নে বিবিএসের তথ্যই গ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘বিবিএসের কাজের সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম। সংস্থাটি একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এ ডাটা তৈরি করেছে। সাড়ে চার লাখ লোক এ জরিপের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। সব কাজ অনলাইনে মনিটরিং করা হয়েছে। তাই অন্য যেকোনোবারের চেয়ে এবারের তথ্য বেশি নির্ভুল। ঢাকায় প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ রয়েছে—এটা শুমারি অনুযায়ীই হয়েছে। যেসব এলাকায় যেদিন শুমারি হয়েছে ওই দিনের প্রাপ্ত তথ্য থেকেই বিবিএস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।’
বিবিএসের তথ্যের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের তথ্যের গরমিলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন কোন প্রক্রিয়ায় শুমারি করে ঢাকার জনসংখ্যা ১ কোটি ৭৫ লাখ বলছে, সেটা তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে। নয়তো বিবিএসের বাইরে আর কোনো তথ্যই গ্রহণযোগ্য হবে না।’