জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নে সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন করা হয়। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তথ্য অনুযায়ী, এবারের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। এর মধ্যে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন। সে অনুযায়ী, এবারের গণভোটে সংস্কার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে ভোট দিয়েছেন মোট ভোটারের প্রায় ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বাতিল হয়েছে ৭৪ লাখ ২২ হাজার ৬৩৭ ভোট।
এবারের গণভোটে ‘না’র পক্ষে ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭২৬ জন, যা মোট ভোটারের ১৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে গণভোটে অংশ নেয়া মোট ভোটারের সংখ্যা ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩। ভোট দেননি ৫ কোটি ১৬০ ভোটার, যা মোট ভোটারের ৩৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।
জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ স্থাপন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে না থাকা ও একজন ব্যক্তির যেকোনো মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রিত্বের সুযোগ না রাখাসহ বেশকিছু সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে প্রণীত জুলাই সনদে এরই মধ্যে সই করেছে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্টের’ মাধ্যমে কিছু বিষয়ে আপত্তি তুলে সনদে সই করা হয়। বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কেবল এনসিপি এ সনদে সই করেনি। এ সনদ বাস্তবায়নে জনসম্মতি আদায়ের লক্ষ্যেই গত বৃহস্পতিবার জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন করা হয়।
স্বাধীনতার পর থেকে এবারের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত দেশে গণভোট হয়েছে তিনবার—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। এর মধ্যে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কিনা, তা জানার জন্য এ গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। পরের গণভোটের আয়োজন করেছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নিজ নীতি ও কর্মপন্থায় জনগণের সম্মতি যাচাই করতে এবং স্থগিত সংবিধানের অধীনে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে থাকার বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে এ গণভোটের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এ গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ।
দেশের শাসন ব্যবস্থা রাষ্ট্রপতি শাসিত নাকি সংসদীয় মডেলে হবে তা নির্ধারণের জন্য সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। সে সময় ফ্রিডম পার্টি ছাড়া দেশের আর সব রাজনৈতিক দল এ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়। এ গণভোট পরিচালনার জন্য প্রণয়ন করা হয় গণভোট আইন, ১৯৯১ এবং গণভোট বিধিমালা, ১৯৯১। এবারের গণভোটটিও এ আইন ও বিধিমালার অধীনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গণভোট নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখানে অনেকেই ভোট দেননি, এটা ঠিক। বিশেষ করে একটি দলের সমর্থকদের বড় অংশ হয়তো ভোটে অংশ নেয়নি। তবে সে অংশ বাদ দিয়ে দেখলেও সাত কোটির মতো মানুষ ভোট দিয়েছে। এ অনুযায়ী সংখ্যাটা খুব খারাপ বলা যাবে না। বরং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার অংশ নিয়েছেন বলেই আমি মনে করি।’
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ভোটারদের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আর ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলা, চট্টগ্রাম বিভাগ, ময়মনসিংহ বিভাগ ও সিলেট বিভাগে ‘না’ ভোটের কিছুটা আধিক্য ছিল।
সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণভোটে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোট দিয়েছে, সেটিই মূল বিবেচ্য। যারা ভোট দিতে আসেননি, তারা কার্যত অংশ নেননি। অতীতে গণভোটে অংশগ্রহণের হার অনেক কম থাকলেও সেটির ফলাফল বাস্তবায়ন হয়েছে। বিষয়টিকে অনেকটা পরীক্ষার মতো করে দেখা যায়। যে পরীক্ষার্থী হলেই আসে না তার জন্য কর্তৃপক্ষের আলাদা করে কিছু করার থাকে না। এখানে যারা ভোট কেন্দ্রে এসেছেন, তারাই নিজেদের মতামত দিয়েছেন। যারা আসেননি, তাদের সিদ্ধান্তকে সক্রিয় মতামত হিসেবে ধরা যায় না।’
(গেজেট প্রকাশের আগ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের তথ্যে বারবার পরিবর্তন আসায় প্রতিবেদনে উপস্থাপিত পরিসংখ্যানেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে।)