গ্যাস অনুসন্ধানের আওতা বাড়াতে শেভরনের দেয়া বিনিয়োগ প্রস্তাব নতুন করে পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। প্রস্তাবটি মূল্যায়নে গত ১২ নভেম্বর তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসীনকে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন বাপেক্সের চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহমদ ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। এ কমিটি শেভরনের দেয়া বিনিয়োগ প্রস্তাব এবং এ প্রস্তাবের ওপর পেট্রোবাংলার গঠিত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে জ্বালানি বিভাগে প্রতিবেদন জমা দেবে।
জ্বালানি বিভাগের উপসচিব আহমেদ জিয়াউর রহমান স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, এ কমিটি সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিবিধান এবং শেভরন বাংলাদেশ লিমিটেডের বিনিয়োগ প্রস্তাবের ওপর পেট্রোবাংলা গঠিত আগের কমিটির প্রতিবেদনসহ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দেবে। তবে কবে নাগাদ এ প্রতিবেদন জমা দিতে হবে সে বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের কার্যপত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ নেই।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে কমিটির একজন সদস্য নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা শেভরনের প্রস্তাব যাচাই করছি। দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট করে এ প্রস্তাব যাচাইয়ের কোনো সময় দেয়া হয়নি। তবে দ্রুতই এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।’
অনশোর ব্লক-১১ ও ১২ এলাকার মোট ৬ হাজার ২২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এককভাবে কাজ পেতে চায় শেভরন বাংলাদেশ। এসব এলাকায় তারা মূলত নতুন করে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাবে। তাদের এ প্রস্তাব কোনো দরপত্রের আওতাধীন নয়। বাতিল হওয়া বিশেষ আইনের আওতায় এ কাজ পেতে আগ্রহী বহুজাতিক সংস্থাটি। এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গত বছরের ৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে জ্বালানি বিভাগে জমা দেয় শেভরন। সেই সময় প্রস্তাবটি গ্রহণ করে অনশোর পিএসসির আওতায় দরপত্র আহ্বান করা হলে তাতে শেভরনকে অংশ নেয়ার আমন্ত্রণ জানায় পেট্রোবাংলা। যদিও এ দরপত্র আর আহ্বান করা হয়নি। এর পর থেকে বিভিন্ন সময় এ প্রস্তাবের ওপর পেট্রোবাংলার মূল্যায়নসহ শেভরনের পক্ষ থেকে দেনদরবার চলতে থাকে। তবে নতুন করে শেভরনের প্রস্তাব কেন পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হলো সে বিষয়ে স্পষ্ট করে বণিক বার্তাকে কিছু জানাতে পারেননি পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শেভরনের প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এ কমিটি কাজ করছে।’
হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেটের জালালাবাদ গ্যাস ক্ষেত্রের অধীন এলাকাগুলো তিনটি গ্যাস অনুসন্ধান ব্লকে (ব্লক নম্বর ১২, ১৩ ও ১৪) বিভক্ত। ব্লক তিনটিতে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম চালাচ্ছে শেভরন। এর মধ্যে ১২ নম্বর ব্লকের কিছু অংশের অনুসন্ধান কার্যক্রম ছেড়ে দিয়েছিল শেভরন। বর্তমানে এ ছেড়ে দেয়া অংশ এবং ১১ নম্বর ব্লকের আওতাভুক্ত এলাকায় (সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও ময়মনসিংহ) অনুসন্ধান এরপর কার্যক্রম চালাতে চায় কোম্পানিটি।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, শেভরনের দেয়া প্রস্তাবটি পুরনো। এ প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের শীর্ষ মহলে ঘুরেফিরে আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে আবারো এ প্রস্তাবের বিষয়ে জোরালো তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কিন্তু বিশেষ আইন বাতিল হয়ে যাওয়ায় এককভাবে শেভরনের কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বিনা দরপত্রের বিষয়টি নয়, এখানে গ্যাসের দামের বিষয়ে তাদের প্রস্তাব রয়েছে। শেভরন অনশোর গ্যাস ক্ষেত্রের জন্য অফশোর মডেলের মূল্য কাঠামো পেতে আগ্রহী। যা কোম্পানিটির জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ ও তুলনামূলক দামে সাশ্রয়ী। শেভরনের প্রস্তাবটি অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৩ কাঠামোর। যেখানে গ্যাসের দাম ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ। অর্থাৎ ব্রেন্ট ১০০ ডলার হলে গ্যাসের দাম দাঁড়াবে ১০ ডলার (প্রতি এমসিএফ)। বর্তমানে বিবিয়ানা থেকে শেভরন গ্যাস বিক্রি করছে মাত্র ২ দশমিক ৭৬ ডলার প্রতি এমসিএফ দরে।
শেভরন এখন বাংলাদেশে বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ গ্যাস ফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে। এর মধ্যে বিবিয়ানা ও জালালাবাদের সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদ ২০৩৪ সাল পর্যন্ত। আর মৌলভীবাজারের মেয়াদ ২০৩৮ সাল। এ তিন গ্যাসফিল্ড থেকে বর্তমানে দৈনিক ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করছে কোম্পানিটি, যা দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৮ শতাংশের বেশি। দেশের গ্যাস খাতের সম্প্রসারণে কোম্পানিটি নতুন করে গ্যাসের অনুসন্ধান এলাকা বাড়াতে চায়।
দেশের গ্যাসের চাহিদা বিবেচনায় প্রতিনিয়ত সরবরাহ কমছে। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা আর সরবরাহে ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে কয়েক বছর ধরে চেষ্টা চালালেও প্রত্যাশা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না পেট্রোবাংলা।
দেশের অফশোরে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তাতে কোনো কোম্পানি অংশ নেয়নি। এক্ষেত্রে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারছে না পেট্রোবাংলা। এমন পরিস্থিতিতে দেশে গ্যাসের সরবরাহের বড় জোগান দিচ্ছে শেভরন বাংলাদেশ। দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু না থাকলে গ্যাস সংকট মোকাবেলায় দেশে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশী কোম্পানি শেভরনের প্রস্তাবকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
ভূতত্ত্ববিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধানে বড় কোনো কোম্পানি কাজ করতে আগ্রহী হলে সরকারের উচিত তাদের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো। বিশেষ করে দক্ষতা ও বৈশ্বিকভাবে কোনো কোম্পানির কার্যক্রমে নেতিবাচক কিছু না থাকলে সে প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত। কারণ আমাদের এখন গ্যাস দরকার। দ্রুততম সময়ে গ্যাস পেলে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি কমানো যেতে পারে। তাতে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।’
বিনা দরপত্রে শেভরনের কাজ পাওয়ার প্রস্তাবটি পুনরায় কেন আলোচনায় এল এবং তাদের কাজ দেয়া হবে কিনা সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি পেট্রোবাংলার শীর্ষ নির্বাহীদের কাছ থেকে। তবে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটি কমিটি কাজ করছে। তাদের প্রতিবেদন আসার পর বলা যাবে।’