ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেই আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা। ফলে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেতে হয় পাশের জেলাসহ ঢাকা-খুলনার হাসপাতালে। এমনকি হাসপাতালে নেই কিডনি রোগসংশ্লিষ্ট কোনো চিকিৎসক। ফলে জেলার বিশালসংখ্যক মানুষ সরকারি এ হাসপাতাল থেকে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, হাসপাতালে ডায়ালাইসিস, আইসিইউ ও সিসিইউ ব্যবস্থা স্থাপনের দাবি তাদের দীর্ঘদিনের। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংকট নিরসনে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসকসহ জনবল সংকট রয়েছে। এগুলোর সমাধান হলে চিকিৎসাসেবা আরো উন্নত হবে।
জানা গেছে, জেলার ছয় উপজেলার মানুষের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকার রোগীরাও চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে আসে। প্রতি মাসে বহির্বিভাগে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ চিকিৎসা নেয়। বর্তমানে হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। তবে বড় সমস্যা কিডনি রোগীদের। ঝিনাইদহে সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেন্টার নেই। এমনকি জেলায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও নেই এ ব্যবস্থা। ফলে ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হলে বাধ্য হয়ে তাদের অন্য জেলার হাসপাতালে যেতে হয়।
সরজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে কাঁথা-পাটি বিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। ঘন ঘন লোডশেডিং হওয়ায় রোগীদের দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। স্বজনদের ভর্তি রোগীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা গেছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে আইসিসিইউ ও সিসিইউ সুবিধা নেই। একটু গুরুতর রোগী এলেই তাকে রেফার করা হয় যশোর অথবা ফরিদপুরের হাসপাতালে। আর কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের কোনো ব্যবস্থাই নেই। এছাড়া হাসপাতালে কিডনি-সংশ্লিষ্ট কোনো চিকিৎসক নেই। তাদের দাবি, হাসপাতালটিতে আইসিইউ, সিসিইউ ও ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনা করা হোক। একই সঙ্গে কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল নিয়োগের দাবি জানান তারা।
শহরের সিটি কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় ২০ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। এ হাসপাতালই চিকিৎসার জন্য আমাদের ভরসা। কিন্তু এখানে সাধারণ রোগ ছাড়া অন্য রোগের চিকিৎসা তেমন পাওয়া যায় না। হাসপাতালে কিডনি ডায়ালইসিসের ব্যবস্থা নেই। আইসিইউ-সিসিইউও নেই। এসব জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীদের ঢাকা-খুলনায় যাওয়া লাগে। এতে আমাদের আর্থিক চাপে পড়তে হয়। ভোগান্তি তো আছেই।’
সদর উপজেলার পোড়াহাটি ইউনিয়নের বারইখালী গ্রামের বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘ভর্তি হওয়ার পর অনেক সময় বেড পাওয়া যায় না। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় মেঝেতেই থাকতে হচ্ছে। এর ওপর বিদ্যুৎ চলে গেলে দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়।’
ওমর আলী নামের এক রোগী অভিযোগ করেন, চিকিৎসকরা বিনামূল্যের ওষুধের নাম লিখলেও তা হাসপাতাল থেকে পাওয়া যায় না।
জানা গেছে, হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক ও নার্সসহ বিভিন্ন পদে ২৬৮ জনবলের চাহিদা দেয়া হলেও কর্মরত ১৯১ জন। অর্থাৎ ৭৭ পদে কোনো জনবল নেই। বর্তমানে ৩৭ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে পুরো চিকিৎসাসেবা। এ পদই শূন্য রয়েছে ২৩টি। এর বাইরে তৃতীয় শ্রেণীর সহায়ক কর্মচারী ২৯টি পদও শূন্য রয়েছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের দাবি, অপ্রতুল জনবল দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালের অর্থোপেডিকস সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালে ৯০টির বেশি চিকিৎসক পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র ৩৭ জন। নার্সেরও সংকট রয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ডায়ালাইসিস সেন্টার না থাকায় কিডনি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া যাচ্ছে না। একইভাবে সিসিইউ ও আইসিইউ সুবিধা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হৃদরোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র রেফার করতে হচ্ছে।’
কিডনি-সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান। তিনি জানান, ডায়ালাইসিস সেন্টার না থাকায় কিডনি রোগীদের খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, মাগুরা ও ঢাকায় পাঠানো হয়। আইসিইউ ও সিসিইউ ব্যবস্থাও নেই। এগুলোর অভাবে রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হয় না। এসব চাহিদা আমাদের আছে। এগুলো স্থাপনে দীর্ঘদিনের দাবি ঝিনাইদহবাসীরও।
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শেষ করা হয়েছে। ওষুধ ক্রয় ও বিতরণে আগে যেসব অনিয়ম বা গতানুগতিক পদ্ধতি ছিল, সেগুলো অনেকটাই কমে এসেছে। সীমিত চিকিৎসক ও নার্স দিয়েই সাধ্যমতো রোগীদের সেবা দেয়ার চেষ্টা চলছে। জনবল সংকট কমানো গেলে সেবার পরিধি আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।’
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘২৫০ শয্যার হাসপাতালের চিকিৎসক পদে শূন্যতা সেবার মান উন্নয়নে বড় বাধা। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিষয়টি দেখার পর নতুন করে দুজন চিকিৎসককে ডেপুটেশনে দেয়া হয়েছে। হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়নে কাজ চলমান রয়েছে। জনবল সংকট নিরসন করা গেলে চিকিৎসাসেবা আরো সহজ ও উন্নত হবে।’