দেশে শিক্ষা ও শিক্ষকের মান দুটোই নিম্নমুখী

দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মান ক্রমেই নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক সংস্কার না হওয়া, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বিদ্যমান পাঠ্যক্রম—সব মিলিয়ে শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা।

দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মান ক্রমেই নিম্নমুখী হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ধারাবাহিক সংস্কার না হওয়া, শিক্ষক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, বিদ্যমান পাঠ্যক্রম—সব মিলিয়ে শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদরা। পরীক্ষাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা মুখস্থনির্ভর পড়াশোনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা বাস্তব জীবনের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক নয়। আবার অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, শ্রেণীকক্ষে অনিয়মিত পাঠদান এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার অভাবও মান অবনতির বড় কারণ বলে মনে করেন তারা।

বিদ্যালয়ে পাঠদানের মানও প্রশ্নবিদ্ধ। অনেক শিক্ষক আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না রাখায় শ্রেণীকক্ষে শেখার পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। অবকাঠামোগত ঘাটতি, শিক্ষক সংকট ও প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতাও শিক্ষার মানকে প্রভাবিত করছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েরই শেখার আগ্রহ ও সৃজনশীল চিন্তার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকই আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে এসব সমস্যা আরো প্রকট।

শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞান ও দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা। তারা শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার এবং পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করার আহ্বান জানিয়েছেন।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে দেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কারিগরি, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মোট শিক্ষক রয়েছেন ১৩ লাখ ৫৪ হাজার ৮৫৯ জন। এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে বেশির ভাগই দাবি করছেন, বেতন-ভাতা, পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধায় বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। তাই শিক্ষকদের বড় অংশেরই এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। ফলস্বরূপ বছরের একটি বড় সময়ই তারা বিভিন্ন আন্দোলনে মাঠে থাকছেন, অনেকে আবার পেশাও পরিবর্তন করছেন। এছাড়া শিক্ষকদের একটি অংশ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতেও জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিক্ষক কর্মরত প্রাথমিক স্তরে। বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান (এপিএসসি) ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষক সংখ্যা ৭ লাখ ৭ হাজার ২১৬। তাদের মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬২৪ জন আর বেসরকারিতে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৫৯২ জন।

‘শিক্ষক হয়েছি দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু এখন মনে হয় নিজের সংসারই গড়তে পারব না’—বলছিলেন নেত্রকোনার এক স্কুল শিক্ষক সারোয়ার আলম। বেতন কাঠামো নিয়ে ক্ষোভ চেপে রাখেননি তিনি। তার মতো অনেক শিক্ষকই এখন পেশাটির প্রতি অনীহা প্রকাশ করছেন।

বর্তমানে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক চাকরিতে যোগদান করেন ১৩তম গ্রেডে। এ গ্রেডে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে স্থানভেদে একজন সহকারী শিক্ষকের বেতন দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৯৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৫০০ টাকা, যা ডলারের হিসাবে ১৪৭ দশমিক ৪৬ থেকে ১৬০ দশমিক ২০ ডলার। দেশের মাথাপিছু গড় মাসিক আয় ২৩৫ ডলারের তুলনায় যা অন্তত ৭৫ ডলার কম। এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান এ মহাদেশের ৪৯টি দেশের মধ্যে ৪৫তম। বাংলাদেশের চেয়ে যে চারটি দেশ পিছিয়ে সেগুলোর সবই যুদ্ধবিধ্বস্ত।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষকদের গড় বেতন ৪ হাজার ২০৩ ডলার ২৫ সেন্ট। দেশটির ন্যাশনাল সেন্টার অন এডুকেশন অ্যান্ড দি ইকোনমির তথ্য অনুযায়ী শিক্ষকদের পাঁচ ধরনের বেতন কাঠামো রয়েছে, যেখানে মাসে ন্যূনতম বেতন ২ হাজার ৩৫৩ ডলার।

এ বেতন কাঠামো নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। সহকারী শিক্ষকদের ১১তম বেতন গ্রেডের দাবিতে এরই মধ্যে তারা কয়েক দফায় আন্দোলনও করেছেন। সর্বশেষ গত ৩০ আগস্ট সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেডে বেতনসহ তিন দফা দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মহাসমাবেশ করেছে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ। দাবি না মানলে ওই সমাবেশ থেকে সর্বাত্মক আন্দোলনেরও ঘোষণা দেয়া হয়।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় শিক্ষকতায় সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান নিশ্চিত করা হয়, কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র বিপরীত। মেধাবীরা শিক্ষকতায় এলেও সুযোগ-সুবিধার অভাবে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। যদি শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন করতে হয় তবে অবশ্যই শিক্ষকদের বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।’

এদিকে শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মান নির্ধারণ প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় অনেক অনুপযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রবেশ করছেন। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা ও তদারকির ঘাটতিও পরিস্থিতি আরো জটিল করছে। আবার অনেক শিক্ষক পেশাটিকে শুধু জীবিকা হিসেবে দেখছেন। ফলে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতা ও শিক্ষাদানের মান কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এ সমস্যা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার স্তর নির্ণয়ে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গাণিতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করে দুই বছর পরপর জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এ প্রতিবেদন তৈরি করে। সর্বশেষ ২০২২ সালে হওয়া প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ।

অথচ ২০১১ সালের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সেবার তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ বাংলায় ও ৫০ শতাংশ গণিতে শ্রেণী অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দক্ষতা অর্জন করেছিল। আর পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ছিল ২৫ আর গণিতে ৩৩ শতাংশ। সে অনুযায়ী প্রায় এক যুগে শ্রেণী বিবেচনায় কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জনের দিক থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলায় এ হার কমেছে ১৬ শতাংশীয় পয়েন্ট। গণিতের ক্ষেত্রে পারফরম্যান্সে অবনতির মাত্রা ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। পঞ্চম শ্রেণীর ক্ষেত্রে বাংলায় পারফরম্যান্সে উন্নতি হলেও গণিতে অবনতির মাত্রা ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণ আর শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে গুরুত্ব দেয়া হলেও শিক্ষার্থীরা কতটা শিখতে পারছে, সে বিষয়ে ততটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। এ কারণেই শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে উন্নতি দেখা যাচ্ছে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘অবকাঠামো নির্মাণ, ক্লাসরুম ডিজিটালাইজ করার মতো বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হলেও শিখন-শেখানোর গুণগত মানের উন্নয়নে তা দেয়া হয়নি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের নামে অর্থ আত্মসাৎ হয়। এসব কারণে আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি।’

দেশে শিক্ষার মান বাড়াতে মেধাবী ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে উল্লেখ করে এ শিক্ষাবিদ বলেন, ‘মেধাবী শিক্ষকদের রাখতে হলে এ পেশার সামাজিক মর্যাদা, বেতনসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। যেমন আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেয়া হয় তারা ক্যাডার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত নন এবং অধিদপ্তরের দায়িত্বে যাওয়ার সুযোগ নেই। এমনটি হওয়া উচিত নয়। মালদ্বীপের দিকে তাকালে দেখা যাবে মন্ত্রিপর্যায় থেকে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব পদেই রয়েছেন শিক্ষক। আমাদের দেশেও এমন সুযোগ থাকা উচিত। এছাড়া আমরা অনেকদিন ধরেই শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা বলছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি করা হয়নি। শিক্ষকদের সময়োপযোগী বেতন-ভাতা নির্ধারণে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো দ্রুত নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।’

প্রাথমিকের মতো একই অবস্থা মাধ্যমিকেও। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষকরাই সবচেয়ে কম বেতন পান। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী দেশে সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে শিক্ষক সংখ্যা ৪ লাখ ৮১ হাজার ১৬৭। তাদের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৮ হাজার ৪০৫ জন, যা মোট শিক্ষকের মাত্র ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই এমপিওভুক্ত এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বেতন সরকারি কোষাগার থেকে দেয়া হয়। এমপিওভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ১১তম গ্রেডে যোগদান করেন। তাদের প্রবেশন পর্যায়ের ন্যূনতম বেতন হয় সব মিলিয়ে ১৪ হাজার টাকা (গতকালের বিনিময় হার অনুযায়ী ১১৫ ডলার ১ সেন্টের সমপরিমাণ)। পেনশনের জন্য ১০ শতাংশ হারে মূল বেতনের ১ হাজার ২৫০ টাকা কেটে নেয়ার পর দাঁড়ায় ১২ হাজার ৭৫০ টাকা। অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যোগদান করেন দশম গ্রেডে। তাদের সাকল্যে বেতন হয় ২৭ হাজার ১০০ টাকা। তবে অভিযোগ আছে, এ স্তরের শিক্ষকদের একটি বড় অংশ কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, যা বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মানের অবনমন ঘটাচ্ছে।

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক ও ৩৫তম বিসিএস নন-ক্যাডার সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক পরিষদের সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান বলেন, ‘শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক সচ্ছলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই বললেই চলে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় তিন-চার বছর ধরে নতুন নিয়োগ নেই। একই শিক্ষকের কর্মঘণ্টা দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পাঠদান ও শিক্ষার মানে। আর শিক্ষকদের মর্যাদা শুধু আর্থিক বিষয়ের সঙ্গেই জড়িত নয়, আরো অনেক কিছুই এর সঙ্গে জড়িত। যেমন নতুন পে-স্কেল কমিশনের ২১ সদস্যের মধ্যে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১৯ হাজার সদস্যের পক্ষে একজন প্রতিনিধিও নেই। এভাবে অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষকদের একধরনের উপেক্ষা করা হয়। শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত বেতন, নিয়মিত পদোন্নতি, উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সুযোগ না দিলে শিক্ষকরা জাতি গঠনে কতটুকু সহায়তা করতে পারবেন?’

দেশের সরকারি কলেজগুলোয় শিক্ষক নিয়োগ হয় বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মাধ্যমে। উত্তীর্ণ প্রার্থীরা প্রভাষক হিসেবে নবম গ্রেডে যোগদান করেন। তবে পদোন্নতি জটিলতা, সামাজিক মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন কারণে এসব শিক্ষকের মধ্যেও পেশা পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের ২১ আগস্টের এক প্রজ্ঞাপনের তথ্য অনুযায়ী কর ক্যাডার, পুলিশ, খাদ্য ও প্রশাসন ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগদানের জন্য চাকরি ছেড়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের ছয় কর্মকর্তা। এর আগে ২০২৪-এর শুধু চার মাসে শিক্ষা ক্যাডারের ১৫ কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে অন্যত্র যোগদান করেন।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস বলেন, ‘শিক্ষকতায় তরুণদের আগ্রহী করে তুলতে সবচেয়ে বেশি জরুরি সামাজিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। যিনি শিক্ষা ক্যাডার ছেড়ে অন্য পেশায় যাচ্ছেন, সেখানে কিন্তু তার বেতন একই, কিন্তু পার্থক্য হলো সেখানে তিনি সামাজিক গুরুত্ব বেশি পাচ্ছেন, আবার শিক্ষকতায় তার পদোন্নতি না হওয়ায় বছরের পর বছর আটকে থাকারও সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেখানে এ ধরনের জটিলতা নেই। সরকারের উচিত এ বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দেয়া। এছাড়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সময় আরো একটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন, সেটি হলো যাকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তিনি আসলেই শিক্ষক হতে চান কিনা, শিক্ষকতা পেশাকে তিনি ধারণ করেন কিনা, শিক্ষকতায় তার প্যাশন আছে কিনা। যার মধ্যে এ বিষয়গুলো থাকবে তিনিই প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠবেন এবং এমন শিক্ষকের সংখ্যা বাড়লেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ‍উন্নয়ন ঘটবে।’

অন্যান্য দেশের তুলনায় কম সুযোগ-সুবিধার অভিযোগ আছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরও। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৩৪ হাজার ৫২১। এসব শিক্ষকের অভিযোগ, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় তারা বেতন-ভাতা ও গবেষণার সুযোগ কম পেয়ে থাকেন।

এদিকে দেশের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতিতেও জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। বিশেষত ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে শিক্ষা ক্যাডার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ। বর্তমানে দুদকের মামলায় কারাগারে রয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুস সাত্তার, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ। এছাড়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান।

এ দেড় দশকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবুল বারকাত, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম ও ড. এম খায়রুল হোসেন, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. খন্দকার বজলুল হক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিব উদ্দিন আহমেদ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ড. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ড. মো. কামাল উদ্দিন, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ড. সেলিম মাহমুদ প্রমুখ।

এ বিষয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দক্ষ ও মেধাবী শিক্ষক নিশ্চিত করতে হলে আমাদের অবশ্যই স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিগত দেড় দশকে শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি ঘটেছে, যা এ খাতকে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমন ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হতে দেয়া যাবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অধিক সময় ব্যয় করা এবং নানা দুর্নীতিতে জড়ানোর অন্যতম কারণ ছিল দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ। যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয় এবং উপাচার্য নৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকেন তবে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে।’

আরও