বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি সংকট

কয়েক বছর ধরেই দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। চার বছর আগে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রধান এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ১৪ শতাংশের ঘরে।

ধারাবাহিকভাবে কমে সে প্রবৃদ্ধি এখন ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে প্রণোদনা, নীতি সহায়তাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা বলছেন, ঋণের সুদহার কমানো কিংবা নীতি ছাড়ের কোনোটিই পুরোপুরি কাজে আসবে না, যদি শিল্পোদ্যোগে চাহিদা অনুসারে গ্যাসসহ জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়।

পেট্রোবাংলার তথ্য এবং ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে গ্যাসের সংকট এখন আর সাময়িক সমস্যার মতো কোনো ঘটনা নয়। বরং এটি উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রফতানি প্রতিযোগিতায় সক্ষমতার জন্য প্রধান ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রতিদিন এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাসের ঘাটতির কারণে শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ (প্রেশার) পাওয়া যাচ্ছে না। এতে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না, কোথাও কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আর নতুন কারখানায় গ্যাসের সংযোগ একেবারেই বন্ধ।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এ তথ্য পেট্রোবাংলার। বিপরীতে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্র থেকে উত্তোলন ও আমদানীকৃত এলএনজি মিলিয়ে ২ হাজার ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতিদিন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি। অর্থাৎ চাহিদার ৩০ শতাংশেরও বেশি গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলে শিল্প খাতের বরাদ্দকৃত গ্যাসের একটি অংশ আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানায় সরিয়ে নেয়া হয়। এতে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ আরো কমে যায়।

দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অন্তর্বর্তীকালীন) মো. এনামুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে মন্থর। এটিকে কেবল উচ্চ সুদহার, কঠোর মুদ্রানীতি বা উদ্যোক্তাদের অনীহার ফল হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নিলেও শিল্প খাত যদি জ্বালানি সংকটে উৎপাদন বাড়াতে না পারে, তাহলে শুধু মুদ্রানীতিনির্ভর এসব পদক্ষেপ ঋণের প্রবৃদ্ধিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আনতে পারবে না।’

বিরাজমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জ্বালানি খাতকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে বলে মনে করেন এ শীর্ষ নির্বাহী। এনামুল হক বলেন, ‘উচ্চ উৎপাদনক্ষম শিল্পে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেয়া, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং জ্বালানি আমদানির সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ শিল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প নেই। প্রণোদনা বা উদ্দীপনামূলক নীতিমালা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু টেকসই ও মানসম্মত ঋণ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে জ্বালানি স্থিতিশীলতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।’

দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্প। তৈরি পোশাক, স্পিনিং, উইভিং, ডাইং, নিটিং, সিরামিক, কাচ, ইস্পাত, সিমেন্ট, কাগজ, রাসায়নিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না। শিল্প মালিকদের সংগঠনগুলোর দাবি, প্রায় ৪০০ গ্যাসনির্ভর কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৩০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে। এর বিরূপ প্রভাব আবার গিয়ে পড়েছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বিতরণ করা ঋণ নিয়ে ব্যাংকগুলোর বিপদ বাড়ছে।

নতুন গ্যাস সংযোগ না পেয়ে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির শিকার হওয়ার বড় উদাহরণ ‘সিটি গ্রুপ’। দেশের শীর্ষ এ কনগ্লোমারেটের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ এখন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপি হওয়া পরিহার করতে গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। সিটি গ্রুপের সংকটের সূত্রপাত মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তোলা ছয়টি বৃহৎ শিল্প-কারখানায় গ্যাস সংযোগ না পাওয়া। ২০২০ সাল-পরবর্তী সময়ে এসব কারখানা গড়ে তুলতে গ্রুপটি প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল। কারখানা তৈরি হলেও সেগুলোতে এখনো গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত হয়নি।

দেশ যে গ্যাসের অভাবসহ বড় আকারের জ্বালানি সংকটে পড়তে যাচ্ছে, সে লক্ষণ দৃশ্যমান হয়েছিল প্রায় এক দশক আগেই। দেশে উত্তোলিত গ্যাসে শিল্প-কারখানা সচল রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বর্তমানে দৈনিক জাতীয় গ্রিডে সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে ১ হাজার ৬৪০ মিলিয়ন ঘনফুট দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলিত হচ্ছে। বাকি ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে। গ্যাস সংকটের বিরূপ প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপরও পড়েছে। দেশের মোট ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৪২ শতাংশ গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের সংকটের কারণে এখন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এ কারণে লোডশেডিংও করতে হচ্ছে।

বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে জানান শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে ১৪ হাজারের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না। সরকার বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে যে বিদ্যুৎ কিনছে, সেগুলোর বিল বকেয়া পড়েছে। এর প্রভাবে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোকে ঋণ দেয়া ব্যাংকগুলোও বিপদে আছে। আর গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন। জ্বালানি সংকটের সমাধান না হলে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির আশা করা ভুল হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে কভিড মহামারীর আগে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশেরও বেশি ছিল। কিন্তু এর পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পরও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশে নেমে আসে। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার নেমে যায় ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর দেশের ব্যাংক খাতে বিভিন্ন সংস্কার হয়। অনেক অলিগার্ক ও মাফিয়া দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়ে। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশেরও নিচে নেমে যায় বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।

অবশ্য একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা বণিক বার্তাকে জানান, গণ-অভ্যুত্থানের আগে দেশের অন্তত দুই ডজন ব্যাংক অলিগার্ক ও মাফিয়া শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই ব্যাংকগুলো বাছবিচার ছাড়াই ঋণ বিতরণ করেছে। এসব ঋণের বড় অংশ ছিল বেনামি কোম্পানিতে দেয়া, যেসব অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে। গত দুই বছরে বেসরকারি খাতে যে ঋণ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তারও বড় অংশ অনাদায়ী সুদ যুক্ত হয়ে সৃষ্ট। এ সময়ে নতুন কোনো শিল্প উদ্যোগ বা কারখানা স্থাপনের জন্য বিতরণ করা ঋণ একেবারেই সামান্য।

বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যদিও গ্যাসসহ জ্বালানি সংকটের প্রভাবে স্বল্প সুদের এ ঋণের বিতরণ নিয়েও সংশয় রয়েছে। ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে সব সংকটের দায়দায়িত্ব এসে ব্যাংকের ঘাড়ে পড়ে। ব্যাংকার হিসেবে আমরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছি। পুঁজিবাজার প্রাণবন্ত থাকলে এ ঝুঁকি ও সংকট কিছুটা কমে আসত।’

আহসান জামান চৌধুরী আরো বলেন, ‘দেশের শিল্প খাতে স্থবিরতার পেছনে জ্বালানি সংকটের দায় সবচেয়ে বেশি। আমাদের বিনিয়োগ করা অনেক টেক্সটাইল গ্যাসের সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে না। ভারী শিল্পের পরিস্থিতিও একই। ঋণের সুদহার কমলেও গ্যাস না থাকলে কেউ শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরি করবে না। আর তৈরি হলেও সেটি যদি চালু করা না যায়, তাহলে কোনো লাভ নেই। উল্টো সে কারখানা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে সবার আগে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

অনেক উদ্যোক্তার অভিযোগ, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা নতুন শিল্প স্থাপনের আত্মবিশ্বাস পাচ্ছেন না। বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে শিল্পায়ন ও প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য সরকারের রয়েছে, গ্যাস সংকট তা অর্জনের পথে বড় বাধা বলে মনে করছেন তারা।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, ‘গ্যাসসহ জ্বালানি সংকট শিল্প খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে শুধু উচ্চ সুদহার কমালেই হবে না, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা রফতানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই জ্বালানি খাতে কর-শুল্ক যৌক্তিক করা, প্রয়োজনে বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন এবং আগাম ও সমন্বিত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি। একই সঙ্গে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যও নিশ্চিত করতে হবে।’

আরও