অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভেঙে পড়েছে রাজধানীর অনেক এলাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ভারি বৃষ্টি হলেই রাস্তায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা, রাস্তায় উঠে আসে নালা-নর্দমার বর্জ্য। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে। ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার বেহাল দশাই এ দুর্ভোগের কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার এমন বেহাল দশা উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনেও। সংস্থাটির সম্প্রতি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপলাইনে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। দেশে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে পয়োনিষ্কাশন সুবিধা পাচ্ছে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মালদ্বীপ। দেশটির ৬০ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে পয়োনিষ্কাশন সুবিধার আওতায় আছে। এছাড়া পাকিস্তানে ২৫ ও নেপালে ১০ শতাংশের বেশি মানুষ এ সুবিধার আওতায় রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহাসচিব ড. আবদুল মতিন এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, নগরীর কোথাও পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। সারফেস ড্রেনেজ সিস্টেমের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড ও স্যুয়ারেজ লাইনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। কিন্তু উভয় প্রতিষ্ঠানই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। তিনি এজন্য সরকারকে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির তাগিদ দেন।
নগরবাসীর অভিযোগ, বহু বছর ধরে এ সমস্যা চলতে থাকলেও ব্যাপারটি আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার এ বেহাল অবস্থার জন্য সিটি করপোরেশন এবং ওয়াসা একে অন্যকে দায়ী করে নিজেদের ব্যর্থতা বরাবরই আড়াল করে আসছে। এমনকি রাজধানী ঢাকাকে শতভাগ পয়োনিষ্কাশনের আওতায় আনার জন্য ২০১২ সালে ওয়াসা মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নগরবাসীর চোখে পড়েনি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এখন অনেক উন্নত। বিশ্বব্যাংক যেভাবে বর্ণনা দিয়েছে এটা ঠিক নয়। বর্ষা মৌসুমে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা একটু হয়তো অস্বাভাবিক হতে পারে। তবে এত খারাপ নয়। এছাড়া সরকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ প্রকল্পগুলোর কাজও চলমান।
দেশে স্বাস্থ্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিচ্ছন্নতার ঘাটতির কারণে বছরে ৪২০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। সুষ্ঠু পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগে ভুগছে নগরবাসী। স্বাস্থ্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকারের নানা উদ্যোগ থাকলেও দৃশ্যমান চিত্রের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।
জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি ২০৩০-এর ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে ৬ নম্বর ‘সকলের জন্য নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ’—এ লক্ষ্যে নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশনের পথে চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে এবং তা মোকাবেলায় ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশের ৩০টি পৌরসভায় উন্নত পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার সুযোগ বাড়াতে ১০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এ অর্থের মাধ্যমে ৩০ পৌরসভাগুলোর পয়োনিষ্কাশন ও নালা ব্যবস্থাকে উন্নত করবে। মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশন, গণশৌচাগার ও গুরুতর পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো তৈরিতে এ প্রকল্প বিনিয়োগ করবে। এর আওতায় মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের (মেথর) প্রশিক্ষণ দেয়া ও সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে।
নগরীর নালা-নর্দমা ও ড্রেন পরিষ্কারে অনিয়মের ক্ষেত্রে জনবলস্বল্পতাকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিটি করপোরেশন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাঈদ আনোয়ারুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্ব ওয়াসার। তবুও আমরা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সুষ্ঠুভাবে কাজ করার চেষ্টা করছি। রাজধানীতে এখন যেসব রাস্তায় নতুন করে তৈরি হচ্ছে, সেগুলোতে সিটি করপোরেশন ও ওয়াসা মিলে স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিতে কাজ করছে।