নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি হারাতে বসেছে সুন্দরবনের মুন্ডা জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশে মুন্ডাদের আগমন ও তাদের বসতি বিন্যাসের প্রকৃত তথ্য এখনো পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং উৎখননের ভিত্তিতে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত বিহার ও রাচিতে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে তাদের আদি বসতি বিন্যাসের সময়কাল এবং স্থান নিরূপণ করা যায়।

বাংলাদেশে মুন্ডাদের আগমন ও তাদের বসতি বিন্যাসের প্রকৃত তথ্য এখনো পুরোপুরি উদঘাটিত হয়নি। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং উৎখননের ভিত্তিতে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত বিহার ও রাচিতে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে তাদের আদি বসতি বিন্যাসের সময়কাল এবং স্থান নিরূপণ করা যায়। প্রায় ২৩০ বছর আগে সুন্দরবন অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলেছিল মুন্ডা জনগোষ্ঠী। এরপর ধীরে ধীরে এ অঞ্চলে বাইরের মানুষ বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। মূল ধারার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেকটা অন্তরালে চলে যান মুন্ডারা। বর্তমানে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় এ জনগোষ্ঠীর চার শতাধিক পরিবার রয়েছে। তবে জায়গা-জমি থেকে শুরু করে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধিশালী এ মুন্ডারা একে একে সবই হারাতে বসেছেন। একসময় তাদের জমি থাকলেও এখন বেশির ভাগই ভূমিহীন। চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের নিজস্ব বর্ণমালাও।

সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার (সামস) দেয়া তথ্যমতে, প্রায় ২৩০ বছর আগে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাচি অঞ্চল থেকে মুন্ডাদের এ অঞ্চলে আনা হয়। সুন্দরবন কেটে আবাসভূমি গড়ে তোলার কাজে নিযুক্ত করা হয় তাদের। তবে বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে তাদের স্বীকৃতি দিলেও নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে সুরক্ষা করা হয়নি।

উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন ভেটখালী মুন্ডা পল্লীতে কথা হয় প্রমিলা রানী মুন্ডা, শ্যামলী রানী মুন্ডা, অনিমা রানী মুন্ডা, তারাপদ মুন্ডা ও কমলেশ চন্দ্র মুন্ডাসহ আরো অনেকের সঙ্গে।

তারা জানান, অন্তত দেড় হাজার বছর আগের নিজস্ব মুন্ডারি ভাষা ও সংস্কৃতি এখন বিলুপ্তির পথে। কিছু প্রবীণ ব্যক্তি ছাড়া তাদের ওই ভাষা তেমন কেউ ঠিকমতো বলতে পারেন না। চর্চা না থাকায় নতুন প্রজন্ম মুন্ডারি ভাষা সম্পর্কে জানতে পারছে না।

মুন্ডারি অস্ট্রো-এশীয় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং ভারতীয় আর্যভাষা থেকেও প্রাচীন। এ ভাষা উড়িয়া, অসমীয়া ও বাংলা ভাষার প্রাথমিক ভিত রচনা করেছে। খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল, কোল ইত্যাদি উপজাতীয় ভাষার সঙ্গে মুন্ডা ভাষার সম্পর্ক লক্ষণীয়। বাংলা বাগভঙ্গির ওপর মুন্ডা ভাষার প্রভাব আছে। এ জনগোষ্ঠী সনাতনী হলেও মূলত প্রকৃতি পূজারি। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের একটি নির্ধারিত দিনে কারাম উৎসব করেন তারা। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন অঞ্চলে কারাম বৃক্ষ মরে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে তাদের উৎসবও।

সামসের নির্বাহী পরিচালক কৃঞ্চপদ মুন্ডা জানান, মুন্ডা জনগোষ্ঠী অন্তত ২৩০ বছর আগে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাচি থেকে এসে সাতক্ষীরার সুন্দরবন অঞ্চলে জঙ্গল কেটে বসতি শুরু করে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি অতি প্রাচীন। তারা প্রকৃতি পূজারি। তাদের রয়েছে নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা। গ্রামপ্রধানের পাশাপাশি ও উপজেলা পর্যায়ে থাকে একজন করে রাজা। তারা স্বতন্ত্র বিচার ও আচার ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করে। তবে তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থা হারিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘২০১৫ সাল থেকে সুন্দরবন আদিবাসী মুন্ডা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব শাসন ব্যবস্থার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। এজন্য দক্ষিণাঞ্চলে মুন্ডা ভাষা চর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার। দেশের উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় মুন্ডা ভাষা চর্চা কেন্দ্র সরকারিভাবে স্থাপিত হলেও খুলনা বা সুন্দরবন অঞ্চলে আজও হয়নি। এছাড়া পাঠ্যপুস্তকে মুন্ডা ভাষার বর্ণমালা অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দাবিও জানানো হচ্ছে। মুন্ডা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা হলো মুন্ডারি, যা অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের অন্তর্গত। তবে এখন মুন্ডারা শাদ্রী ভাষা ব্যবহার করছেন।’

নৃতত্ত্ববিদরা বলছেন, বাঙালিদের সঙ্গে উঠবস ও লেখাপড়ার কারণে নিজেদের ‘শাদ্রী’ ভাষা ভুলতে বসেছে বর্তমান প্রজন্ম। প্রাথমিক পাঠ শেষে শিশুরা ঝরে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় মুন্ডারা তাদের দীর্ঘদিনের লালিত সংস্কৃতি চর্চাও করতে পারছে না। জমি ও ভাষার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি বিলীন হওয়ার পথে।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলা বিভাগীয় প্রধান মো. বদরুল মিল্লাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মুন্ডাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে। ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার অভাবে নিজস্ব বর্ণমালাগুলোও হারিয়ে ফেলছেন তারা। দেশে প্রায় ৪৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি আদিবাসী বা নৃগোষ্ঠীর স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বাকিরা স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করে চলেছেন। মুন্ডারা অনেক আগে থেকে সুন্দরবন অঞ্চলে জঙ্গল কেটে বসতি শুরু করেন। তাদের রয়েছে নিজস্ব মুন্ডারি ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার ব্যবস্থা। কিন্তু কালক্রমে পরিবারগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।’

তবে দেশে যেসব আদিবাসী জাতিসত্তার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে তাদের মধ্যে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, মৈতৈ মণিপুরি, সাঁওতাল অন্যতম। গারো, খাসি, বম, খুমি, পাংখোয়া, লুসাই, ককবরক, সাঁওতাল ভাষা লেখা হয় আত্তীকৃত রোমান বর্ণমালায় এবং বিঞ্চুপ্রিয়া, মণিপুরি, কোল, হাজং, সাঁওতাল, মুন্ডা ও শাদ্রীসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভাষা লেখার জন্য ব্যবহার করা হয় বাংলা বর্ণমালা। অন্যান্য এলাকার মতোই সাতক্ষীরা অঞ্চলের মুন্ডা জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা দেয়া সরকারের দায়িত্ব বলেও মনে করেন অধ্যাপক বদরুল মিল্লাত।

সার্বিক বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা ফাইজা হোসেন অন্বেষা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈচিত্র্যই পৃথিবীর সৌন্দর্যের কারণ। বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য লালন করেই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ একই সঙ্গে সংকট ও সম্ভাবনাময় একটি দেশ। দেশের সর্ব দক্ষিণ-পশ্চিমে বসবাসকারী মুন্ডা জনগোষ্ঠী তাদের সংস্কৃতি লালন করে চলেছে নিজ উদ্যোগে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে মুন্ডা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি বাংলাদেশের ঐতিহ্যের স্থায়ী অংশ হয়ে উঠবে।’

আরও