সম্প্রতি আপনাকে জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত করা হয়েছে। এ দায়িত্ব আপনার কাছে কী অর্থ বহন করে?
আমাকে এমন এক সময়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছে যখন আমার বয়স ৮১। সেই অর্থে একটু বিলম্বেই নিয়োগ হয়েছে। যদি সুস্থ থাকি ও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারি তাহলে জ্ঞানসাধনাকে কেন্দ্র করে যে গবেষণা করতে হয় সেগুলো অব্যাহত রাখব। এ মুহূর্তে আমার হাতে একটি বড় কাজ রয়েছে। সেটি হলো ধ্রুপদি অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডোর ‘প্রিন্সিপলস অব পলিটিক্যাল ইকোনমি অ্যান্ড ট্যাক্সেশন’ বইয়ের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করা। বাংলা একাডেমি বইটি প্রকাশ করবে। এছাড়া বাংলা একাডেমি আমাকে তাদের অর্থনীতিবিষয়ক ফেলো নির্বাচিত করেছে। অনুবাদের প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছি। অনুবাদ শেষ হলে সেটাকে আবার রিভিশন দিতে হবে। এরপর সেটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। এছাড়া পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখে যাচ্ছি। আগামী মাসে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) উদ্যোগে ব্যাংকিং ও নৈতিকতার ওপর একটি পাবলিক লেকচার দিতে হবে।
আপনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা ও লেখালেখিতে যুক্ত। আপনার জীবনে কোন শিক্ষক বা লেখকের প্রভাব সবচেয়ে বেশি মনে করেন?
শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে আর প্রতিটি পর্যায়ে অনেক শিক্ষক আমাকে প্রভাবিত করেছেন। তাদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে মজিদ পণ্ডিতের কথা বলতে হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ে কুমিল্লা জিলা স্কুলের কয়েকজন নামকরা শিক্ষকের কথাও বলতে পারি। আমার জীবনে তাদের চিন্তার ছাপ পড়েছে। তাদের মধ্যে নূর আহমেদ খানের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ হেডমাস্টার হিসেবে স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। ইতিহাসের শিক্ষক ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান আর আবদুল্লাহ স্যার—এমন অনেক শিক্ষক মাধ্যমিক পর্যায়ে আমার জীবনে প্রভাব ফেলেছেন।
কলেজ পর্যায়ে ছিলেন আবু রুশদ মতিনউদ্দিন, অধ্যাপক নোমান, অধ্যাপক জালালউদ্দিন, ভূগোলের এমআই চৌধুরী, যুক্তিবিদ্যার ওহাব সাহেব, অর্থনীতির আওলাদ হোসেন বিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের ক’জন শিক্ষকও আমাকে প্রভাবিত করেছেন, যার মধ্যে অনেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে অধ্যাপক নূরুল ইসলাম ছিলেন। তাকে আমরা বেশি পাইনি। ভর্তি হওয়ার তিন-চার মাস পর তিনি করাচিতে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান হয়ে চলে গেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের আবু মাহমুদ, মুজাফফর আহমেদ ও আনিসুর রহমান—তারা আমাদের চিন্তার ক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছেন। কীভাবে অর্থনীতি পড়ব তার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের ‘প্যাটার্নস অব ডেভেলপমেন্ট’ নামের একটি বিষয় ছিল। ওখানে যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নের ইতিহাস পড়ানো হতো। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি রেহমান সোবহান চমৎকারভাবে পড়াতেন। নিয়মিত টিউটোরিয়াল ক্লাস নিতেন। তখন বিভিন্ন সময়ে আমাদের অর্থনীতি বিষয়ে পেপার উপস্থাপন করতে হতো। তার শিক্ষাদানের পদ্ধতিটা চমৎকার ছিল। অধ্যাপক আবু মাহমুদ আমাদের শিখিয়েছেন, অভ্যাসের দাস হয়ে যেসব চিন্তা আমাদের মাথায় ঢুকিয়েছি তা যেন ঝেড়ে ফেলি। এটাও চিন্তার জগতে একটা বিপ্লব নিয়ে আসা।
শ্রেণীকক্ষের ভেতরে ও বাইরে একজন শিক্ষকের কী কী গুণ থাকা জরুরি?
আমাদের সময় শিক্ষকরা সিলেবাসের অন্ধ অনুসরণ করতেন না। তারা মোটামুটি মানসম্পন্ন একটি কাঠামো অনুসরণ করতেন। পড়ানোর সময় অন্যান্য প্রসঙ্গ, যেমন অর্থনীতির সঙ্গে দর্শনের যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে, তা বাস্তবেই দেখানোর চেষ্টা করতেন। একটা উদাহরণ দেয়া যায়। অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ মুনাফা ও ব্যয় সাশ্রয়বিষয়ক একটি ধারণা রয়েছে। ইউটিলিটারিয়ান বা হেডোনিস্টরা বলতেন, মানবজীবনের লক্ষ্য সর্বোচ্চ আরাম-আয়েশ করা আর কষ্ট যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা। এ ধরনের দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিক বিবর্তনের সম্পর্কও আছে। যুগে যুগে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা চ্যালেঞ্জ আকারে এসেছে।
এগুলো কীভাবে মোকাবেলা করা যায় সেজন্য অর্থনীতিবিদদের অবদান রয়েছে। এক্ষেত্রে জন মেনার্ড কেইনস উল্লেখযোগ্য। ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দার সময় তার রচিত ‘জেনারেল থিওরি অব এমপ্লয়মেন্ট, ইন্টারেস্ট অ্যান্ড মানি’ বইটা মন্দা মোকাবেলার হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।
একইভাবে মার্কিন পুঁজিবাদের অঢেল প্রাচুর্য, তার সঙ্গে বিলাসিতা, অপচয় ও অপব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে থর্সটেইন ভেবলেন লিখেছিলেন ‘থিওরি অব লেইজার ক্লাস’। এটিও ধ্রুপদি গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত। এভাবে আমাদের চিন্তাজগতের ব্যাপক বিস্তৃতি হয়েছে। শিক্ষকদের ছাড়া আমি আমার বাবার প্রতিও কৃতজ্ঞ। তিনি নিজে ছিলেন শিক্ষাবিদ। সচরাচর ওই বয়সে গল্প-উপন্যাসকে খারাপ বই বলে পড়তে নিষেধ করা হতো। অধিকাংশ অভিভাবক তা-ই করতেন। কিন্তু আমার বাবা বলতেন, ‘না পড়ে কীভাবে বুঝবে কোনটা ভালো আর কোনটা মন্দ?’ এভাবে তিনি আমাকে গল্প-উপন্যাস পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আবার পড়ালেখার বাইরে এক্সট্রা কারিকুলার অনেক কিছুর সঙ্গেও জড়িত ছিলাম। সেখান থেকে সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জন করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও বাংলায় রচনা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও উপস্থিত বক্তৃতায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছি। সমসাময়িক ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে সুনাম অর্জনের সুযোগ হয়েছিল।
সাবসিডিয়ারি কোর্স হিসেবে সমাজতত্ত্ব পড়তে গিয়ে অধ্যাপক নাজমুল করিম, অধ্যাপক আফসারউদ্দিন ও অধ্যাপক এফ আর খানসহ আরো অনেকের সাহচর্য পেয়েছি। এ সাবজেক্ট আমার চিন্তার জগৎ খুলে দিয়েছে। এমনিতে সাবসিডিয়ারি বিষয়কে কেউ গুরুত্ব দিয়ে পড়ে না। পাস মার্ক অর্থাৎ ৩৩ নম্বর ওঠাতে পারলেই সবাই সন্তুষ্ট থাকত। আমার অবশ্য বিষয়টি এত ভালো লেগেছিল যে আমি ওই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নম্বর তুলেছিলাম। আমি এখন মনে করি, অর্থনীতিবিদ হতে হলে সমাজতত্ত্বের সহযোগিতা আমাদের নিতেই হবে। ম্যাক্স ভেবার, টয়েনবি ও কার্ল মার্ক্সের কথা না জানলে অর্থনীতির জ্ঞান পূর্ণাঙ্গ হয় না।
বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন থেকে আপনার রাজনৈতিক সক্রিয়তা শুরু। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিলেন, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত ২২ মাস জেলে ছিলেন। শিক্ষা আন্দোলনের ছয় দশক পেরিয়ে আপনি কী দেখছেন, শিক্ষা ব্যবস্থা কতটুকু এগোল?
শিক্ষা আন্দোলন সম্পর্কে আমার মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। এ আন্দোলন কেন হয়েছিল? দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হতো, অধ্যাপক শরীফের নেতৃত্বে সরকার যে কমিশন গঠন করেছিল তার তাত্ত্বিক বক্তব্য ছিল, শিক্ষা একটি পণ্য। পণ্য তো বাজার থেকে কিনতে হয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও তাই এটি কিনতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি বাজার হয়ে উঠছিল। শিক্ষার এ পণ্য চরিত্র অস্বীকার করে কোনো শিক্ষানীতি হতে পারে না, এটিই ছিল কমিশনের বক্তব্য। শিক্ষা সম্পর্কে ব্যক্তি পুঁজিবাদী দর্শনের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল ওই শিক্ষানীতিতে। এটি ক্ষোভের একটি বড় কারণ ছিল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে যাদের পক্ষে খরচ বহন সম্ভব হবে তারাই শিক্ষা পাবে। বাকিরা পাবে না। এমন একটা ব্যবস্থা চালুর কথা চলছিল। তখন বিএ, বিকম ও বিএসসি পাস কোর্সকে দুই বছরের বদলে তিন বছর করা হলো। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অনেক ইংরেজি বই পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হলো। এসব বই শিক্ষার্থীদের জন্য দুর্বহ বোঝা হয়ে উঠল। এর আগে এত বইয়ের বোঝা শিক্ষার্থীদের সামলাতে হতো না। তাই এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। শুরু হয় ঢাকা কলেজ থেকে। পরে এ বিক্ষোভ জগন্নাথ কলেজ ও নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজেও ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা কলেজের বিক্ষোভে একজন সংগঠক হিসেবে আমি নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তেই লক্ষ করলাম, এটি চালিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা আমাদের ছিল না। আমরা তো সবে শিক্ষার্থী। আন্দোলন করার ক্ষেত্রে সংগতই অনেকগুলো সীমাবদ্ধতা মোকাবেলা করতে হচ্ছিল। আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য একটি সাংগঠনিক কাঠামো যুক্ত করা প্রয়োজন ছিল। এজন্য আমরা মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রনেতাদের আড্ডায় গেলাম। তাদের এ আন্দোলনের দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দিলাম। ছাত্রসংগঠনগুলোও সাড়া দিল। তারপর ঘটনা অনেক দূর এগিয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে গোলাগুলি হয়েছে। সরকারকে বাধ্য হয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়। আমার আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য মিলবে। এখানে বিস্তারিত বলার সুযোগ কম। তবে এখন মনে হয়, ওই সময়ে কিছু বিষয়ে আমরা ভুল ভেবেছিলাম। এই যেমন দুই বছরের ডিগ্রি কোর্স এখন তিন বছরেই চলছে। কারো এ বিষয়ে তেমন আপত্তি নেই।
আবার এখন ইংরেজি ভাষাটা ভালোভাবে আয়ত্ত করার তাগিদ বেড়েছে। আগে পাঠ্যক্রমে অনেকগুলো ইংরেজি বই যুক্ত করায় যে চাপ ছিল সেটা অনেক বেশি ছিল। সেটা মাঝামাঝি একটা পর্যায়ে আসা প্রয়োজন ছিল। পরে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা কমালেও সব বই বাদ দেয়নি। তবে একটি বিষয় ঠিকই মনোযোগের দাবি রাখে। বিজ্ঞানের ছাত্রদের ডিগ্রি কোর্সে ‘সভ্যতার ইতিহাস’ পড়তে হতো। বইটির নাম ছিল ‘হিস্ট্রি অব সিভিলাইজেশন’। আর মানবিকের শিক্ষার্থীদের পড়তে হতো ‘বিজ্ঞানের ইতিহাস’ (হিস্ট্রি অব সায়েন্স)। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের সুকুমার বৃত্তি ও সভ্যতার বিকাশে মানুষের অবদান সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। তারা জ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ইতিহাস জানতে পারতেন। আবার সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্পকলা সম্পর্কে জানার সুযোগ পেতেন না। এভাবে সভ্যতার ইতিহাস পাঠ করে তাদের মানবিক ও নান্দনিক ভাবনার বিকাশ ঘটত। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে হলে এগুলো জরুরি। মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই প্রসঙ্গ। বিজ্ঞানের উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ও গুরুত্বপূর্ণ মনীষীদের সম্পর্কে জানতে পারলে তারা উদ্ভাবনকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে। ভালো মানুষ হওয়ার জন্য এগুলোর বিকল্প ছিল না।
এখন সরকার শিক্ষা নিয়ে নানা নীতির কথা বলছে। আমি মনে করি, দেশে যদি ভারসাম্যমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখতে পারবে। এর সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও কম্পিউটার ব্যবহারের দক্ষতাও অনেক প্রয়োজনীয়। এগুলোতে আমাদের অ্যাকসেস থাকলে বাড়তি জ্ঞান অর্জন সম্ভব। সেজন্য আগ্রহ থাকতে হবে।
দেশে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বহুধাবিভক্ত। মাধ্যমিকের বড় একটি অংশ আধাসরকারি ও বেসরকারি। উচ্চ শিক্ষা বর্তমান কর্মসংস্থান বাজারের চাহিদা মেটাতে সক্ষম নয়। শিক্ষার সার্বিক এ সংকট মোকাবেলায় নতুন সরকারের পদক্ষেপ কী হতে পারে?
মানসম্মত শিক্ষার জন্য ভালো শিক্ষক পূর্বশর্ত। শিক্ষক কেবল বিদ্বান হলেই চলবে না। শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠের বিষয় হৃদয়গ্রাহী করে তোলার ক্ষমতা রাখতে হবে। এটি থাকলে বেশি কিছু লাগে না। একটা ব্ল্যাকবোর্ড, ভালো চক আর ডাস্টার দিয়েই মানসম্মত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। এখন অনেক খরচ করে হোয়াইটবোর্ড আর মার্কার ব্যবহার করা হয়। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দেখেছি, শিক্ষকরা চক আর ডাস্টার ব্যবহার করছেন। এটা সত্তর দশকের কথা। কয়েকজনের চকের গুঁড়োয় অ্যালার্জি থাকায় তারা স্লাইড প্রজেক্টর ব্যবহার করে পড়াতেন। ওটাই ব্ল্যাকবোর্ডের বিকল্প হিসেবে কাজ করত। ওই সময় কম্পিউটার বা ডিজিটাল প্রযুক্তি ছিল না। তখন কি আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীর জন্ম হয়নি? ক্যালকুলাসের আবিষ্কার বা ল্যাভয়সিয়ের মতো রসায়নবিদ কি জন্ম নেননি? আমি যা বলতে চাচ্ছি, বড় আয়োজন করলেই শিক্ষা ব্যবস্থা রাতারাতি ভালো হয়ে যাবে—এমনটি মনে করার কারণ নেই। দুর্ভাগ্যের বিষয়, দেশে ভালো শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না।
আমি সাদামাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েছি। সেখানে ‘পণ্ডিত’ বলতে যা বোঝায় অর্থাৎ মজিদ পণ্ডিত তেমনই ছিলেন। কীভাবে ভালো করে উচ্চারণ করতে হয়, পড়তে হয়, আবৃত্তি করতে হয়, সঠিক বানানে লিখতে হয়—সবই শিখেছি। তৃতীয় শ্রেণীতেই আমরা ইংরেজি পড়া শুরু করেছিলাম। ষষ্ঠ শ্রেণীতে থাকার সময় ইংরেজিতে ভালো দখল চলে এসেছিল। অন্তত আমার ক্ষেত্রে এমনটিই হয়েছিল। এখন আমি গর্ব করেই বলতে পারি, ব্যাকরণগত সমস্যা বা শব্দগুচ্ছ নিয়ে যে জটিলতা সেটা ষষ্ঠ শ্রেণীতেই সামাল দিতে পেরেছিলাম। পরবর্তী সময়ে ম্যাট্রিকুলেশন আর কলেজ পর্যায়ে এটি আমার পুঁজি হিসেবে কাজ করেছে। যা বলতে চাচ্ছি, প্রথাগত এ শিক্ষা যদি ষষ্ঠ শ্রেণীর মধ্যেই শেষ করা যায় তাহলে নবম-দশম শ্রেণীতে কেন সম্ভব হচ্ছে না? এখানে ভুলটা কোথায়? এখানে যে ঘাটতি আছে সেগুলো নিয়ে আমাদের দ্রুত ভাবতে হবে। তবে আমার দৃষ্টিতে মূল সমস্যা ভালো শিক্ষকের ঘাটতি। শিক্ষা অবকাঠামো অনেক হতে পারে। সেই অবকাঠামোতে উপকরণ বা অন্য ইনপুট নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ইনপুট হলো শিক্ষক। অথচ এ ইনপুটই আজ প্রশ্নসূচক হয়ে আছে।
বিগত সরকারের সময় জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেখেছি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে প্রতিটি নির্বাচনী আসনে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আলাপ শুনছি। এ মুহূর্তে আসলে কোনটা বেশি জরুরি? বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ানো নাকি এর মান বাড়ানো?
আমি অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়ানোর পক্ষে। একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মান ছিল তা এখন হারিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধও হয়ে পড়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত কয়েক বছরে অনেক নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। এই যেমন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ। এটি জার্নালিজমের অংশ হতে পারত। আলাদা বিভাগ করার উদ্দেশ্য কী? একইভাবে শান্তি ও সংঘর্ষ তো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হতে পারত। মানে একটি আলাদা সাবজেক্ট হিসেবে এটিকে পড়ানো ব্যয়বহুল ও অপ্রয়োজনীয়। সেটা না করে এভাবে বিভাগের সংখ্যা কেন বাড়ানো হয়েছে? যাতে শিক্ষক নিয়োগ বাড়ানো যায়। শিক্ষক নিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতার মূল কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন নির্বাচনকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ক্যাম্পাসে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের নির্বাচন আয়োজন করা হয়। আর শিক্ষকদের অনেকে রাজনীতিতে পুরোপুরি মগ্ন থাকেন। এসব নির্বাচনের মাধ্যমে প্রচুর কাজ ও পাঠদানের সময়ের অপচয় ঘটে। রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেদাভেদ বাড়ে। এমনকি সংঘর্ষের মতো ঘটনাও ঘটে। এভাবে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ নষ্ট হয়। এমনটি কখনই কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা, নীল, গোলাপি—এমন আলাদা বিভাজন বা দল থাকবে এটাও সুস্থ বিষয় নয়।
শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক ও দার্শনিক মতভিত্তিক আদর্শ থাকবেই। কিন্তু শিক্ষকদের রাজনৈতিক দলের ভিত্তিতে বিভাজিত হলে হবে না। স্কুল অব থট বা মতবাদের প্রবক্তা হিসেবে বিভক্ত হলে সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বেশি স্বাস্থ্যকর। কারণ কোনো মতবাদের পক্ষে সমর্থন তৈরি করতে গেলে নিশ্চয়ই বিষয়টি গভীরভাবে জানতে হবে। একজন ভালো দার্শনিকের দৃষ্টিভঙ্গি রাখতে হবে। সমস্যা হলো আমরা কীভাবে যেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে স্থূল হয়ে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা যেখানে নন্দনকানন হতে পারত, সেটিই হচ্ছে না। এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় প্রতি বছর প্রচুর গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কিন্তু বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাদের শিক্ষার সংযোগ না থাকায় গ্র্যাজুয়েট বেকারই বেড়ে চলেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন মতবাদ কিংবা উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাও হচ্ছে না।
উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গবেষণায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়ানোর জন্য গবেষণাকে কীভাবে উৎসাহিত করা যায়?
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য গবেষণাকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের শুধু বরাদ্দ কম, তাতেই সমস্যা সীমিত নয়। গবেষণার জন্য যে ধরনের সহযোগিতা, উপকরণ এবং কাঠামো দরকার সেগুলোরও অভাব রয়েছে। কিছু গবেষণা প্রত্যক্ষ পরীক্ষালব্ধ (এমপিরিক্যাল)। এগুলোর জন্য সমীক্ষা বা জরিপ করতে হয়। জরিপ বা সমীক্ষায় প্রচুর অর্থ প্রয়োজন। আবার জীববিজ্ঞান বা বায়োলজিক্যাল গবেষণায় বারবার পরীক্ষা চালাতে হয়। এজন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, রাসায়নিক দ্রব্য ও স্যাম্পল সংগ্রহে ব্যয় করতে হয়। এগুলোর জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবেই।
দ্বিতীয়ত, গবেষণাকে গ্রহণযোগ্য ও বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগ রাখা হয়নি বলেই গবেষণায় অনেকের আগ্রহ কম। গবেষণার মান প্রসঙ্গেও দায়বদ্ধতা কম। আমরা গৎবাঁধা একটি নিয়ম চালু করেছি। যেমন কয়টি পাবলিকেশন থাকলে একজন সহকারী অধ্যাপক আবেদনের মাধ্যমে সহযোগী অধ্যাপক হতে পারবেন। এটুকুই; তাদের গবেষণার মান যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব কম পায়। বিষয়টা যে এমন নয় তার একটি উদাহরণ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতালিয়ান অধ্যাপক পিয়ারো স্রাফ্ফা। তিনি জীবদ্দশায় ‘প্রডাকশন কমোডিটিজ বাই মিনস অব কমোডিটিজ’ শীর্ষক একটি মনোগ্রাফ প্রকাশ করেন। সেটাও ৮০ বা ৯০ পৃষ্ঠার বই। তাতে প্রচুর অংক আছে।
সারা জীবনে পিয়ারো স্রাফ্ফা অনেক কিছু লিখেছেন। কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ডে একটি অলিখিত নিয়ম আছে। আপনার অপ্রকাশিত লেখাগুলো ট্রাংক বা স্টিলের বাক্সে সযত্নে রাখতে হবে। পিয়ারো স্রাফ্ফা তা করেছিলেন এবং মৃত্যুর পর তার দুই শিষ্যকে লেখাগুলো সম্পাদনা করে প্রকাশের কপিরাইট দিয়েছিলেন। এ নিয়ে বেশকিছু কাজ হয়েছে। যা-ই হোক, অর্থনীতিতে প্রণিধানযোগ্য তাত্ত্বিক হওয়ার জন্য স্রাফ্ফার শতাধিক প্রকাশনা প্রয়োজন হয়নি, বরং তার গবেষণার প্রভাব কেমন সেটা বিবেচ্য ছিল। গবেষণার কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবও আছে। যেমন কতবার সাইটেড হয়েছে দেখা। আমরা ধরেই নিয়েছি সাইটেড হওয়া মানেই গুরুত্বপূর্ণ লেখা। নানা দিক বিবেচনা করলেও গুণমান বিবেচনায় না নিয়ে প্রকাশনার সংখ্যা একটি ভুল পদক্ষেপ। আসল বিষয় হলো গবেষণার মাধ্যমে চিন্তার নতুন কী যুক্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে নতুন জ্ঞান তৈরি হবে না।
শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের কী কী পদক্ষেপ আপনি প্রত্যাশা করছেন?
একটাই প্রত্যাশা, প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত ভালো শিক্ষক তৈরির প্রকল্প নেয়া। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেব। মাধ্যমিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পুরনো টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর মানের চরম অবনতি ঘটেছে। বেসরকারি খাতে ব্যাঙের ছাতার মতো বহু বিএড কলেজ স্থাপিত হয়েছে। এগুলো শুধু সার্টিফিকেট উৎপাদনের কারখানা।
আমার পরিবারের অনেকেই শিক্ষাবিদ ছিলেন বলে টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কীভাবে পড়ানো হতো সে সম্পর্কে ধারণা আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণার্থীদের কঠোর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে অনেক কিছু শেখানো হতো। এ ধারা এখন আর নেই। টিচার্স ট্রেনিং কলেজে প্রিন্সিপলস অব এডুকেশন, শিশুর বিকাশ, শিক্ষা মনোবিজ্ঞান পড়ানো হতো। এসব ছাড়াও নানা প্রয়োগধর্মী প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। শিক্ষার ওপর বিখ্যাত একটি গ্রন্থ রয়েছে। গ্রন্থটির নাম ‘থ্রি থাউজ্যান্ড ইয়ার্স অব এডুকেশনাল উইজডম’। রবার্ট উলিচের লেখা বইটিতে শিক্ষা নিয়ে চিন্তার যত শাখা-প্রশাখা আছে তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এতে মিলবে। এটি হার্ভার্ডেরও প্রকাশনা; চমৎকার বই। এভাবে জানার ধারাবাহিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার মূল দর্শন নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।