এতে প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হলেও কৃষকদের আগাম বন্যার আতঙ্ক কাটেনি। স্থানীয়দের দুর্ভোগ কাটাতে ও টেকসই সমাধানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং পরিবেশ রক্ষার বিবেচনায় ১ হাজার ২৫০ মিটারের একটি ডুবোবাঁধ (সাবমার্সিবল বাঁধ) নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে স্থায়ী এ সমাধানের উদ্যোগ এখনো সমীক্ষা ও নকশা অনুমোদনের প্রক্রিয়াতেই আটকে আছে। চলতি বছর পাউবো থেকে নকশা ও সমীক্ষার কাগজপত্র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে সেটি এখনো ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদন পায়নি।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনা করে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি সাবমার্সিবল বাঁধ নির্মাণের সমীক্ষা পরিচালনা করে। প্রায় ৫৫ কোটি টাকা খরচে এ ডুবোবাঁধের দুটি স্থানে ১৫ মিটারের খোলা রাখা অংশ থাকবে। পানি বাড়লে খোলা স্থান সাময়িকভাবে বন্ধ করা হবে এবং বন্যায় বাঁধটি ডুবে যাবে। আবার পানি কমে গেলে খোলা অংশ দিয়ে নৌকা ও মৎস্যজীবীরা স্বাভাবিক চলাচল করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (এসআইআরডিপি) আওতায় সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বাঘাবাড়ী থেকে উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, তাড়াশ, রায়গঞ্জ এবং চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর উপজেলা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের প্রায় ৬২ হাজার ৭৫৬ হেক্টর জমির বোরো ধান আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করা এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
১৯৭৭-৭৮ সালে ৪৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এ বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৯৯০ সালে। একই সঙ্গে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্মাণ করা হয় রাউতারা স্লুইসগেট। তবে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় নির্মিত বাঁধের শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী অংশের রাউতারা স্লুইসগেটের পশ্চিম পাশে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার এলাকা ভেঙে যায়। একই সঙ্গে স্লুইসগেটটিও প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর পর থেকে প্রতি বছর ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে এ ভাঙন স্থানে বাঁশ, খুঁটি পাইলিং করে, বালির বস্তা দিয়ে অস্থায়ী রিং বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে এর কাজ শুরু হয়ে এপ্রিলে শেষ হয়। তবে মে মাসে ধান কাটা শেষ হলে জুনের শেষে মাছ ধরা ও নৌকা চলাচলের সুবিধার্থে এ বাঁধ কেটে দেন মৎস্য শিকারি ও নৌযান শ্রমিকরা। চলতি বছর এ অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
প্রতি বছর এ অস্থায়ী ব্যবস্থার কারণে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক তৈরি হয়। আগাম বন্যায় এ অঞ্চলের প্রায় ১ হাজার ৫০ হেক্টর কৃষি ও গোচারণভূমি তলিয়ে যায়। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গবাদিপশু নিয়ে চরম সংকটে পড়েন খামারিরা।
বাঘাবাড়ী এলাকার কৃষক রহমত আলী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনছি এখানে একটি ডুবোবাঁধ নির্মাণ করা হবে। কিন্তু তা বাস্তাবায়ন না হওয়ায় এখনো আমাদের আগাম বন্যার আশঙ্কায় দিন কাটাতে হচ্ছে।’
পোতাজিয়া গ্রামের হযরত আলী বলেন, ‘আমরা বর্ষায় এখানে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করি। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে এ জলপথে হাজার হাজার মানুষ চলাচল করে, পণ্য পরিবহনও করে। আমরা জানতে পেরেছি এখানে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করে কৃষক, মৎস্যজীবী ও মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য ডুবোবাঁধ নির্মাণ করা হবে। তবে তা দীর্ঘদিনেও না হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে অস্থায়ী রিং বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, যা সরকারি টাকার অপচয়।’ তিনি দ্রুত ডুবোবাঁধ নির্মানের দাবি জানান।
সিরাজগঞ্জ পাউবো-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহীনুর আলম বণিক বার্তাকে জানান, বাঁধটির ওপর পাকা সড়ক ও সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এলাকাটি চলনবিল অধ্যুষিত হওয়ায় স্থায়ী বাঁধ দিলে পানির প্রবাহ ও নাব্য ব্যাহত হতো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবটি আটকে যায় এবং স্থায়ী বাঁধের প্রস্তাব আর এগোয়নি।
তিনি আরো জানান, স্থানীয়দের টেকসই সমাধানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে ১ হাজার ২৫০ মিটার দৈর্ঘের একটি ডুবোবাঁধ নির্মাণের জন্য একটি সমীক্ষা শেষ করে আইডব্লিউএম। চলতি বছর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সমীক্ষার কাগজপত্র ও ডিজাইন পাঠানো হয়েছে। সেটি পাস হয়ে এলে ডিপিপি পাঠানো হবে।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বণিক বার্তাকে জানান, এখানে একদম শক্ত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ জটিল বিষয়। সাবমার্সিবল বাঁধ নির্মাণের জন্য সমীক্ষার কাজ প্রায় শেষের দিকে। এটি শেষ হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ প্রস্তাবটি পরিকল্পনা কমিশন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে যাবে। সরকার ও পরিবেশ বিভাগের অনুমোদনের ওপর ভিত্তি করে এবং বাজেট পাস হলে এর নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে।