আইটি শিল্প

এটুআই এজেন্সি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগে বেসরকারি খাত

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পটিকে (এটুআই) স্থায়ী কাঠামো দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নাম পরিবর্তন করে এটুআই অথরিটি থেকে এটুআই এজেন্সি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রণয়ন করা হচ্ছে অথরিটি টু ইনোভেশন (এটুআই) আইন, ২০২২। এরই মধ্যে আইনটির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদনও দেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পটিকে (এটুআই) স্থায়ী কাঠামো দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নাম পরিবর্তন করে এটুআই অথরিটি থেকে এটুআই এজেন্সি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রণয়ন করা হচ্ছে অথরিটি টু ইনোভেশন (এটুআই) আইন, ২০২২। এরই মধ্যে আইনটির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদনও দেয়া হয়েছে।

উদ্যোগটি নিয়ে আপত্তি তুলেছে আইসিটি খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের পাঁচ সংগঠন। বিষয়টি নিয়ে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে একটি চিঠিও দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আইনটি দেশীয় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বর্তমান গতিধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি প্রণয়ন হলে এটুআই এজেন্সি নিজেই সেবাদাতা ও পরামর্শক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। একই সঙ্গে তা হয়ে উঠবে স্থানীয় বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কঠিন প্রতিপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে দেশের কয়েক হাজার সফটওয়্যার ও আইটি পরিষেবা কোম্পানির কার্যক্রম টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস), ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কল সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিং (বাক্কো) এবং ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) যৌথভাবে সম্প্রতি এ চিঠি দেয়। চিঠিতে খসড়া আইনের বিভিন্ন ধারা, উপধারা ও অনুচ্ছেদ নিয়ে পর্যালোচনার ভিত্তিতে সেগুলোয় পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়।

তাদের এ আপত্তির জবাবে সরকারের ভাষ্য হলো খসড়া আইনটির সবে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে এটি যৌক্তিকভাবে পরিবর্তনের সুযোগ এখনো রয়েছে।

এর আগে গত ২৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অথরিটি টু ইনোভেশন (এটুআই) আইন ২০২২-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ৫-এর (ট) উপধারাকে স্থানীয় আইটি কোম্পানিগুলোর বিকাশের অন্তরায় বলে মনে করছে পাঁচ সংগঠন। ধারাটিতে বলা হয়েছে, এটুআই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনসংক্রান্ত সেবা ও পরামর্শ দেবে।

বিষয়টি নিয়ে সংগঠনগুলোর বক্তব্য হলো সরকারি ও দাতা সংস্থার সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পের কাজে স্থানীয় আইটি কোম্পানিগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি অনেক দিনের। বিষয়টি তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ ত্বরান্বিত করবে। কিন্তু আইনের প্রস্তাবিত উপধারাটি এটুআইকে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগী হিসেবে দাঁড় করাবে।

খসড়ার ৭ (ঘ) উপধারা নিয়েও আপত্তি তুলেছে সংগঠনগুলো। উপধারাটিতে বলা হয়েছে, আইনের উদ্দেশ্য পূরণে কোম্পানি গঠন বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ বিষয়ে সংগঠনগুলোর বক্তব্য হচ্ছে এজেন্সি নিজেই যদি কোম্পানি গঠন করে, তাহলে তা স্থানীয় আইটি কোম্পানিগুলোর শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো সরকারি সব ক্রয় কার্যক্রমে একচেটিয়া অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে এজেন্সি। এতে স্থানীয় বেসরকারি কোম্পানিগুলোর ব্যবসার সুযোগ অনেকাংশেই বিনষ্ট হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এখন ইতিবাচক। কিন্তু এটুআই একচেটিয়া সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলে তা পাবলিক-পাবলিক পার্টনারশিপে রূপ নেবে। এতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক খারাপ হবে।

খসড়ার ৮-এর (৭)-তে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনে যেকোনো সভায় দেশী বা বিদেশী কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে আমন্ত্রণ জানাতে পারবে। এক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে সংগঠনগুলো।

তাদের বক্তব্য, প্রায় তিন দশক ধরে এ দেশে বেসরকারি খাতে তথ্যপ্রযুক্তির আশানুরূপ ব্যাপ্তি ঘটেছে। এসব কোম্পানিই দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি দেশের বাইরে বিশ্বমানের সফটওয়্যার পরিষেবা রফতানি করে বছরে ১ বিলিয়ন ডলার আয় করছে। সুতরাং অটোমেশন, ডিজিটাইজেশনসহ সরকারের যেকোনো উদ্ভাবনী ও তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতামত বা পরামর্শ প্রদানের জন্য কোনো বিদেশী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই।

আইনে এটুআই এজেন্সিগুলোর আয় ও সম্পত্তি বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়েও আপত্তি রয়েছে বেসরকারি খাতের আইটি উদ্যোক্তাদের পাঁচ সংগঠনের। এসব সংগঠন মনে করছে, এটুআইকে সরাসরি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত হওয়ার ও অর্জিত সম্পদ বিনিয়োগের সুযোগ করে দিলে তা স্থানীয় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি তাদের ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগকেও সংকুচিত করে ফেলবে।

খসড়ার ১০-এর (চ) উপধারায় বলা হয়েছে, এজেন্সির কল্যাণে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির যেকোনো অংশ ইজারা বা ভাড়া দেয়া যাবে। এতে আপত্তি তুলে সংগঠনগুলো বলছে, আইনে এটুআইকে তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির কাছ থেকে বিভিন্নভাবে সেবা দেয়ার মাধ্যমে অর্থ আয়ের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। সরকার একদিকে তথ্যপ্রযুক্তি রফতানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে, অন্যদিকে এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন প্রণয়ন করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সিনিয়র সচিব এনএম জিয়াউল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, খসড়া আইনটি সবেমাত্র মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। এটি চূড়ান্ত করার আগে খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে যৌক্তিক পর্যায়ে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। আগামীতে এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

আইসিটি খাতের উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, খসড়া আইনটির বেশকিছু ধারা, উপধারা ও অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এটি দেশী তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। খসড়ার প্রস্তাবগুলো আইনে রূপান্তরিত হলে দেশের কয়েক হাজার সফটওয়্যার ও আইটি পরিষেবা কোম্পানি, কল সেন্টার, ই-কমার্স কোম্পানিসহ নানা ধরনের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকাংশ কোম্পানির ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের যে ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছে, সেটিও ভেঙে পড়বে। সর্বোপরি তরুণ ও আগ্রহী উদ্যোক্তা এবং দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাবে। এ খাতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত যুবার কর্মসংস্থানের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে বেসিসের সভাপতি রাসেল টি আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রস্তাবিত আইনটির বেশকিছু ধারা-উপধারা আমাদের স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে। সেজন্য আমরা সেগুলো সমাধানের জন্য লিখিত আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। আমরা আলোচনা করে এসব সমস্যার সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছি।

আরও