বাংলাদেশে অর্থ, ধর্ম ও পেশিশক্তিই মৌলিক রাজনৈতিক পুঁজি: টিআইবি

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। দুদকের সংস্কারের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা ভবিষ্যতের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারেনি।

বাংলাদেশে অর্থ, ধর্ম, পেশিশক্তি, পুরুষতন্ত্র ও গরিষ্ঠতন্ত্রই এখন মৌলিক রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, নারী প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা হতাশাজনক। একজন নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যদিও দলটি নারী মনোনয়ন দেবে—এমন প্রত্যাশা ছিল না। তবে যেসব দলের কাছ থেকে আশা করা হয়েছিল, তারাও ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় দলের প্রার্থীদের মধ্যে নারী মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ—এর কারণ কী, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

রোববার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রাক-নির্বাচনী সার্বিক পরিস্থিতি ও গণভোটের প্রচারণা নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক। টিআইবির পর্যবেক্ষণে প্রাক-নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে সাতটি এবং গণভোটের প্রচারণা সম্পর্কে ১১টি দিক তুলে ধরা হয়।

এ সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি অব্যাহত রয়েছে। দুদকের সংস্কারের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ না করা ভবিষ্যতের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার পরিচয় দিতে পারেনি।

টিআইবির প্রাক-নির্বাচনী সার্বিক পর্যবেক্ষণে সাতটি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলো হলো—

১. শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২. নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে।

৩. আগের রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশি, পুরুষতান্ত্রিক ও গরিষ্ঠতান্ত্রিক শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং বিশেষ করে অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

৪. অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন ও অন্য অংশীজনের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংঘাত এবং নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রতিরোধে কমিশনের ওপর আরোপিত ক্ষমতার কার্যকর প্রয়োগ দৃশ্যমান নয়।

৫. অনলাইন–অফলাইন প্রচারণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল ও প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও কমিশন তার অনেকটা অপারগতার কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে বা অগ্রাহ্য করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি নির্বাচনে সব দল ও প্রার্থীর প্রতিযোগিতার সমান ক্ষেত্র এবং সব শ্রেণীর ভোটারদের জন্য অপরিহার্য সুস্থ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যাপক ঘাটতির ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

৬. নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে, বিশেষ করে প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের একাংশের মধ্যে সুস্থ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে ব্যর্থতা, অনিয়ম ও নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়।

৭. নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নির্বাচন কমিশনকে অসহযোগিতার মনোভাবও প্রকাশ পেয়েছে। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিতের মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণ ক্রমাগত দৃশ্যমান হচ্ছে।

গণভোটের প্রচারণা নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণে ১১টি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো হলো,

১. প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমানতা ও উভয় পক্ষের সন্তুষ্টিপ্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা শুরুতেই গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

২. একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট এবং সংসদে উচ্চকক্ষবিষয়ক বাধ্যবাধকতার সিদ্ধান্ত যদি ওই সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় বিবেচনা করা হয়েও থাকে, তবু বিষয়টি আরো জটিল হয়েছে৷

৩. অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো ধরনের গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেয়া হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।

৪. সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা (হ্যাঁ-এর পক্ষে প্রচারকে আইনসম্মত নয় বলা) নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল, তা কতটুকু সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক, এসব প্রশ্নের কারণে আরো অধিকতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

৫. নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় নির্বাচন ও গণভোট সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যা প্রশ্নবিদ্ধ। কোনোভাবেই গণভোটকে নির্বাচনের সমার্থক বিবেচনার সুযোগ নেই, গণভোটে ভোটার কোনো আসনে বা কোনো সদস্যের পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন না।

৬. প্রজ্ঞাপন জারির আগে গণভোট অধ্যাদেশ–প্রণেতা হিসেবে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন আলোচনার সুযোগ নিলে তার স্বাধীন ভূমিকার চর্চা প্রশ্নবিদ্ধ হতো না, বরং অযাচিত বিভ্রান্তি পরিহার করা সম্ভব হতো।

৭. সর্বোপরি সরকার ও নির্বাচন কমিশন—উভয়েরই অপরিণামদর্শী পদক্ষেপের ফলে গণভোটে সরকারের সরাসরি ভূমিকাকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

৮. জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের মূল অনুঘটক জুলাই সনদের ওপর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন সরকারের দায়িত্ব। এ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশন একমত না হওয়ার কোনো আইনগত বা যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না।

৯. তবে এ দায়িত্ব পালনে শুরু থেকেই সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি এনজিও, ব্যাংকসহ বিভিন্ন অংশীজনের ওপর অযাচিতভাবে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সরকার নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গণভোট পরিচালনার অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন।

১০. বিশেষ করে তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেহেতু সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বাধীন, সরকার তার কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও নির্দেশনা দেয়ার আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি না নিয়ে নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে অহেতুক হস্তক্ষেপ করেছে।

১১. এ হস্তক্ষেপের কারণে বা অন্য যে বিবেচনায় হোক, নির্বাচন কমিশন এ ক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নিষ্প্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন গণভোটকে বিতর্কিত করে ঐতিহাসিক গণভোট আয়োজনে নিজেদের প্রত্যাশিত ভূমিকা সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন সঞ্চালনা করেন। সংস্থার উপদেষ্টা (নির্বাহী ব্যবস্থাপনা) সুমাইয়া খায়ের, জ্যেষ্ঠ গবেষণা কর্মকর্তা মো. মাহফুজুল হক ও গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

আরও