রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেলগুলোর ব্যবসার পিক সিজন ধরা হয় বছরের প্রথম তিন মাস
জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চকে।
ব্যবসায়িক কারণে এ সময় বাংলাদেশে প্রচুর বিদেশী আসা-যাওয়া করে। এছাড়া বিদেশী
পর্যটকদের আনাগোনাও থাকে তুলনামূলক বেশি। ফলে এ সময় চাহিদা বেশি থাকায় হোটেলে কক্ষ
পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ে। ব্যতিক্রম কেবল ঢাকার সবচেয়ে বিলাসবহুল হোটেল
ইন্টারকন্টিনেন্টাল। ভাড়া বেশি হওয়ায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত অতিথি। উল্টো চার বছর ধরে
চলা সংস্কারকাজের জন্য নেয়া ঋণের বোঝা টানতে গিয়ে পড়েছে আর্থিক সংকটে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের প্রথম পাঁচ তারকা হোটেল
ইন্টারকন্টিনেন্টালের যাত্রা ১৯৬৬ সালে। স্থপতি উইলিয়াম বি ট্যাবলারের চমত্কার
নকশার হোটেলটি আজও চমত্কার স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বহন করে চলেছে। বাংলাদেশের
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী এটি। সত্তরের
নির্বাচনের পর থেকে এতে অনেক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে
হোটেলটিকে নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস। দেশ স্বাধীনের
পরও ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত এটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল নামেই চলে। এরপর স্টারউড কোম্পানির
সঙ্গে চুক্তি হওয়ায় ১৯৮৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলে হোটেল
শেরাটন নামে। শেরাটনের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও
পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ‘রূপসী বাংলা হোটেল’ নামে এটি পরিচালিত হয়।
সরকারি মালিকানাধীন হোটেলটি পরিচালনার জন্য আবারো ফিরে আসে ইন্টারকন্টিনেন্টাল
হোটেলস গ্রুপ (এশিয়া-প্যাসিফিক) প্রাইভেট লিমিটেড (আইএইচজি)। স্বত্বাধিকারী
প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিস লিমিটেডের সঙ্গে ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩০ বছর
মেয়াদি চুক্তি করে। সে অনুযায়ী ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধের পর ২০১৫ সালের
মার্চে হোটেলের সংস্কারকাজ শুরু হয়। রূপসী বাংলা হোটেলে কক্ষ ছিল ছোট-বড় মিলিয়ে
২৭২টি। সংস্কারের পর কক্ষের সংখ্যা কমে ২৩১-তে দাঁড়িয়েছে। আয়তনের দিক থেকে কক্ষের
আকার দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ৪০ বর্গমিটার। বিশ্বমানের অতিথিসেবা নিশ্চিত করতে পরিবর্তন
করা হয়েছে সুইমিং পুল ও ডাইনিং হলের স্থান। এর আগে হোটেলটির বলরুম ছিল একদিকে, উইন্টার গার্ডেন নামে সবচেয়ে বড় হলরুমের
অবস্থান ছিল আরেক দিকে। এখন দুটি এক করে দেয়া হয়েছে। সরিয়ে দেয়া হয়েছে হোটেলটির
মূল ফটকও। ভেতরের সুইমিং পুলটিও স্থানান্তর করে সাজানো হয়েছে নতুন করে। গ্রাহকদের
চাহিদার কথা মাথায় নিয়ে বাড়ানো হয়েছে সুযোগ-সুবিধা। সংস্কারকাজ শেষে ২০১৮ সালের
সেপ্টেম্বরে আবারো ইন্টারকন্টিনেন্টাল নামে চালু হয় হোটেলটি।
তবে চার বছর ধরে চলা সংস্কারকাজের জন্য অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় ৯৪৪ কোটি
টাকা ঋণ নিতে হয়েছে হোটেলটিকে। তিন মাস পরপর পরিশোধ করতে হচ্ছে ঋণের ১৬ কোটি টাকার
বেশি। অথচ অতিথি কম থাকায় সে অনুযায়ী আয় আসছে না। শুরু হয়েছে আর্থিক সংকট।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত
এপ্রিলে অনুষ্ঠিত বৈঠকের আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে। যানজটের কারণে অনেক অতিথিই
বিমানবন্দরের কাছাকাছি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে বিদেশী পর্যটক-ব্যবসায়ীরা
ইন্টারকন্টিনেন্টালকে এড়িয়ে চলছেন বলে জানায় হোটেল কর্তৃপক্ষ।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোকাম্মেল হোসেন
বলেন, ‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের
রয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণের বোঝা। অন্যদিকে হোটেল ভাড়া বেশি হওয়ায় আগের তুলনায়
কাঙ্ক্ষিতসংখ্যক পর্যটক আসছে না।’ পর্যটক আকৃষ্ট করতে তিনি ভাড়া কমানোসহ অন্যান্য সুবিধা আরো
সহজলভ্য করার অনুরোধ জানান সংসদীয় কমিটির বৈঠকে।
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘সংস্কারকাজের জন্য চার বছর হোটেলের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। অথচ নিয়োজিত
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিতভাবেই বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে। সংস্কারকাজের জন্য
হোটেলটিকে ৯৪৪ কোটি টাকা ঋণের বোঝা বহন করাতে হচ্ছে। এখন তিন মাস অন্তর ১৬ কোটি
টাকা ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি অন্যান্য খাতেও ভ্যাট, ট্যাক্স ও মূল্য সংযোজন কর দিতে হচ্ছে।’ এ সময় তিনি আরো দুই-তিন বছর পর এ হোটেল থেকে সিটি ট্যাক্স আদায়ের অনুরোধ
জানান।
বৈঠকে উপস্থিত কমিটির সদস্য সৈয়দা করিনা আক্তার বলেন, ‘এত টাকা ব্যয় করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাজ করা হয়েছে। অন্যান্য
প্রাইভেট হোটেল সিটি ট্যাক্স দিয়ে যদি লাভ করতে পারে তাহলে সোনারগাঁও ও
ইন্টারকন্টিনেন্টাল তা না দিতে চাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের আর্থিক সংকটের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয়
বাংলাদেশ সার্ভিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আতিকুর রহমানের
সঙ্গে। তবে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার কারণে বর্তমানে তিনি দেশের বাইরে আছেন
জানিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত এমডি ও কোম্পানি সেক্রেটারি এসএম তরিকুল ইসলামের সঙ্গে এ
বিষয়ে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে এসএম তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বণিক
বার্তাকে বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বরে ব্যাংকঋণ
পরিশোধ শুরু হয়েছে। তিন মাস পরপর যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে সেটা আয় হচ্ছে
না। এজন্য সংস্থার ব্যাংক হিসাবে থাকা কিছু স্থায়ী আমানত নগদায়ন করা হয়েছে। আমরা
ব্যাংকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছি, যাতে আমাদের
কিস্তি পরিশোধের বিষয়টি আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করে ধরা হয়। একই সঙ্গে ঋণের মেয়াদ
বাড়ানোর বিষয়েও কথা চলছে। এটি কার্যকর হয়ে গেলে আমরা সহজেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ
করতে পারব।’
হোটেলটির আয় বাড়ানোর জন্য এ খাতে অভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে জানিয়ে তরিকুল
ইসলাম বলেন, ‘অনেকেই এটিকে সরকারি হোটেল
মনে করেন। কিন্তু এ খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতোই এটি প্রতিযোগিতামূলক একটি
প্রতিষ্ঠান। আমরা এর আয় বাড়াতে সম্ভাব্য সব রকম উদ্যোগ নিচ্ছি।’