মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন মোড় নেয়া এবং সৌদি আরবে হুথিদের হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) কাঁচামালের বাজারেও। এরই মধ্যে গত মাসের তুলনায় প্রোপেন ও বিউটেনের দাম টনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহের সংকট আরো বাড়লে এলপিজির কাঁচামালের দাম টনপ্রতি ৩০-৫০ ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত এলপিজির বড় অংশই আমদানিনির্ভর। বিশ্ববাজারের ক্রয়মূল্য ও আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে দেশে পণ্যটির দাম সমন্বয় করা হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী মাসে এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও সংকট তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরামকোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে প্রতি টন প্রোপেনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২৫ এবং বিউটেনের ৬৬০ ডলার। গত আগস্টে এ দুই পণ্যের দাম ছিল যথাক্রমে ৬২০ ও ৬৪০ ডলার। তবে এরই মধ্যে প্রোপেনের দাম আরো বেড়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বরের হিসাবে তা টনপ্রতি ৬৫৯ ডলারে উঠেছে। আর আগামী মাসের জন্য বিউটেনের দাম টনপ্রতি আরো ২০ ডলার বাড়তে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস (সিপি) ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর সঙ্গে আমদানি মূল্য, প্রিমিয়াম ও দেশে বাজারজাতের ব্যয় যোগ করে প্রতি কেজি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
চলতি মাসে দেশের বাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। আগের মাসের তুলনায় সিলিন্ডারপ্রতি দাম কমানো হয় ১৩ টাকা। আর প্রতি কেজিতে দাম কমেছে ১ টাকা ৩ পয়সা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে এলপিজির দাম বেড়ে যায়। পরে যুদ্ধবিরতি শুরু হলে দাম কিছুটা কমতে থাকে। তবে দুই মাস ধরে এলপিজির দাম ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। গত মাসে দেশে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছিল ৭০ টাকা।
এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর গত এপ্রিলে দেশে এলপিজির দামে রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা যায়। এপ্রিলের শুরুতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়। একই মাসের ১৯ এপ্রিল আবার বাড়ানো হয় ২১২ টাকা। এরপর জুন ও জুলাইয়ে টানা দুই মাস দেশে এলপিজির দাম কমানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান এলপিজি উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক দেশ সৌদি আরব। বর্তমানে ড্রোন হামলার কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি পাইপলাইন বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি তেলবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা।
জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা এবং তেল উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন রিফাইনারিতে তেল রফতানি বন্ধের ঘোষণাও দিয়েছে সৌদি আরব। এ পরিস্থিতিতে এলপিজিবাহী জাহাজ চলাচলে সংকট, পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও এলএনজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এলপিজির বাজারেও।
দেশের বাজারে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করে বেসরকারি অপারেটররা। আমদানির পর বিইআরসি নির্ধারিত দামে তারা পণ্যটি বাজারজাত করে। অপারেটরদের ভাষ্য, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব এরই মধ্যে এলপিজির দামে পড়তে শুরু করেছে।
ফ্রেশ এলপিজির চিফ মার্কেটিং অফিসার আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে এলপিজির কাঁচামালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। চলতি মাসের তুলনায় বিউটেন ও প্রোপেনের দাম টনপ্রতি প্রায় ১৮ ডলার বেড়েছে। মাস শেষে এ বৃদ্ধি ৩০-৪০ ডলারে পৌঁছতে পারে। এ বাড়তি দাম সমন্বয় হলে দেশের বাজারেও এলপি গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। তবে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হবে, তা নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্য ও সৌদি আরবের সংকট কোন দিকে যায় তার ওপর।’
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, শুধু পণ্যের দামই নয়, এর সঙ্গে প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়াও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় আরো বাড়ছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে সংকট চলছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। এলপিজির কাঁচামালের দাম বাড়ছে, পাশাপাশি প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বহুগুণ বেড়েছে। বর্তমানে ভিএলজিসির (বড় এলপিজিবাহী জাহাজ) দৈনিক ভাড়া প্রায় ১ লাখ ডলার। ফলে এ পণ্য দেশের বাজারে এলে এর দামও বাড়বে।’