ডলার সংকটের জেরে গত তিন বছরজুড়ে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা বিওপি) যে অস্থিরতা ছিল, সেটি অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মে মাস শেষে (জুলাই-মে) সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতি মাত্র ৪৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতি ছিল ৬১২ কোটি ডলার। বিওপি-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়, যা গতকাল প্রকাশ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে দেশের বিওপিতে ঘাটতি ছিল ১১৫ কোটি ডলার। যদিও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এ সূচকে ৫৮৮ কোটি ডলার ঘাটতি ছিল। আর ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে বিওপির ঘাটতি ছিল ৮২২ কোটি ডলার।
বিওপির ঘাটতি হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে পূরণ করতে হয়। তিন অর্থবছর ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এ গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বড় ঘাটতিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়া রিজার্ভ পরবর্তী তিন বছরে অর্ধেকে নেমে আসে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিওপির ঘাটতি কমে আসায় বাংলাদেশ ব্যাংককে এখন আর রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না। এ কারণে গত মাসে দেশের রিজার্ভ বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারও রয়েছে স্থিতিশীল।
দেশের ডলার প্রবাহ ও বৈদেশিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় ‘ব্যালান্স অব পেমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা বিওপির সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) প্রবাসীরা রেকর্ড ২ হাজার ৭৫১ কোটি বা ২৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। অথচ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসীদের পাঠানো এ বাড়তি অর্থের ওপর ভর করেই সরকারের চলতি হিসাবে ঘাটতি ও সামগ্রিক লেনদেন ঘাটতি কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মে মাসের পর জুনেও প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। পাশাপাশি রফতানি খাতও প্রবৃদ্ধির ধারায় আছে। জুনে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ সহায়তা এসেছে। এ অর্থ রিজার্ভের পাশাপাশি বিওপিতে যুক্ত হওয়ায় বিদায়ী অর্থবছর শেষে বিওপি উদ্বৃত্তের ধারায় চলে গেছে। মে মাসে ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু সরবরাহ ভালো থাকায় ডলারের বিনিময় হার না বেড়ে উল্টো কমেছে।
বিওপির দিক থেকে এ মুহূর্তে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বস্তির জায়গায় রয়েছে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, গত তিন বছরজুড়ে ডলারের যে সংকট ছিল, সেটি এ মুহূর্তে পুরোপুরি কেটে গেছে। ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী স্বাচ্ছন্দ্যে আমদানির এলসি খুলতে পারছেন। বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পর ডলারের দর বাড়েনি। উল্টো চলতি সপ্তাহে কমেছে। বিদেশী ঋণ ও এলসি দায় পরিশোধের জন্য এখন আর ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করতে হচ্ছে না। বহুদিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল বাজার থেকে ১৭ কোটি ডলার কিনেছে বলেও জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলার। গত সপ্তাহে আকুর মাধ্যমে আসা আমদানির দায় পরিশোধ করা হয়েছে। এ কারণে আগামী দুই মাসে রিজার্ভ প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকবে।
গত অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত দেশের আমদানি ব্যয় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। আগের অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানি ব্যয় ছিল ৫৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়ে ৬০ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিগুণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে রফতানি আয়ে। অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত রফতানি আয়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে রফতানি আয় এসেছিল ৩৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৪০ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রফতানিতে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবাসী আয় ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।
রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের ওপর ভর করে সরকারের চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মে মাস শেষে চলতি হিসাবে ঘাটতি ছিল ৬১২ কোটি ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে তা ৪৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। তবে গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট বা আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টে ২০৭ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত থাকলেও গত অর্থবছরের একই সময়ে সেটি মাত্র ২৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই), বিদেশী অনুদান ও বিদেশী ঋণ। গত অর্থবছরের ১১ মাসে নিট এফডিআই এসেছে ১৫৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ১৩৫ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছিল। তবে গত অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি কমে গেছে বিদেশী অনুদান প্রবাহ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মে পর্যন্ত ১১ মাসে ৪৯৯ কোটি ডলার অনুদান এলেও গত অর্থবছরের একই সময়ে সেটি ২৭৮ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।