ইন্টারনেট বন্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। আমদানি-রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রুদ্ধ হয়ে পড়েছে দেশের রেমিট্যান্স আসার পথও। বন্ধ রয়েছে সরকারের বন্দরকেন্দ্রিক রাজস্ব ও শুল্ক আহরণ কার্যক্রমও। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পাশাপাশি ভেঙে পড়তে শুরু করেছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থ লেনদেন ব্যবস্থাও।
ব্যাংক সূত্রমতে, দেশের ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পুরোপুরি ইন্টারনেটনির্ভর। আমদানি ও রফতানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য বিদেশী ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ই-মেইলসহ অন্যান্য মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। এক্ষেত্রে ই-মেইলে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পাঠাতে হয়। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিদেশী ব্যাংক ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এ কারণে নতুন কোনো এলসি খোলা সম্ভব হচ্ছে না।
আমদানি-রফতানির মতো দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহও কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশী ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জগুলোর মাধ্যমে প্রবাসীরা বৈধ পথে দেশের ব্যাংকগুলোয় রেমিট্যান্স পাঠান। আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা সুইফটের মাধ্যমে আসা রেমিট্যান্সের বার্তা বিটিআরসি গেটওয়ের মাধ্যমে দেশে আসে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সেসব বার্তা নিশ্চিত করা হলে তবেই ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে রেমিট্যান্সের অর্থ জমা হয়। ইন্টারনেট না থাকায় এখন এটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রেমিট্যান্সের ডলার কিনতে বিদেশী এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত দরকষাকষি করতে হয়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। আমদানি ও রফতানির এলসি খোলার ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি একই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বাংলাদেশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’
গত বৃহস্পতিবার সকালে সারা দেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ আসতে থাকে। এ অবস্থায় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরগুলোর ইন্টারনেট সেবা দুর্বল হতে শুরু করে। দুপুরের পর থ্রিজি ও ফোরজি সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আর রাত ৮টার পর থেকে বন্ধ হয়ে যায় ব্রডব্যান্ড সেবাও। এরপর থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দেশ পুরোপুরি ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে অর্থ লেনদেনে মানুষ এটিএম বুথ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস), বিভিন্ন ধরনের অ্যাপস, পিওএস মেশিনসহ অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধের জেরে ডিজিটাল সব লেনদেনও বন্ধ হয়ে গেছে। এটিএম বুথ সচল থাকলেও সেখানে টাকা নেই। কারফিউ ও সহিংসতার কারণে বুথগুলোয় নতুন করে টাকা ঢোকানো যাচ্ছে না। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় বিকাশ, নগদসহ ব্যাংকগুলোর অ্যাপসভিত্তিক ব্যাংকিং পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পিওএস মেশিনগুলোও কাজ করছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মতিঝিল, পল্টন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ এটিএম বুথই বন্ধ। কিছু এটিএম বুথ খোলা থাকলেও সেগুলোয় টাকা নেই। যে কয়টি বুথে টাকা ছিল, সেগুলোর সামনে গ্রাহকদের লম্বা সারি দেখা গেছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী সালাউদ্দিন বণিক বার্তাকে জানান, ‘একাধিক বুথ ঘুরেও এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারিনি। পরিচিত এক ব্যবসায়ীর পিওএস মেশিন ব্যবহার করে কিছু কেনাকাটার বিল পরিশোধ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটিও সম্ভব হয়নি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রমের সবকিছুই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। এ কারণে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে ব্যাংকের শাখায় নগদ অর্থ উত্তোলন কিংবা জমা ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকিং সেবাই বিঘ্নিত হওয়ার কথা। শুক্র ও শনিবার সরকারি বন্ধ থাকায় ব্যাংক বন্ধ ছিল। এখন রোববার ও সোমবারও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ইন্টারনেট সচল থাকলে গ্রাহকরা অ্যাপস, অনলাইন ব্যাংকিংসহ অন্যান্য মাধ্যমে লেনদেন করতে পারত। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এটিএম বুথগুলোর টাকা শেষ হয়ে গেছে বলে শুনছি। কারফিউ ও সংঘাতের কারণে বুথগুলোয় নতুন করে টাকা দেয়া যাচ্ছে না।’
এমএফএস প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’-এর গ্রাহক ইকবাল আহমেদ জানান, ‘ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিকাশের অ্যাপস কাজ করছে না। ম্যানুয়াল নাম্বার ব্যবহার করে বিকাশ থেকে মোবাইলে ফ্লেক্সি করা যাচ্ছিল। কিন্তু শনিবার বিকাল থেকে ম্যানুয়াল লেনদেনও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মোবাইল নাম্বারে ফ্লেক্সি করার পথও বন্ধ।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র (ভারপ্রাপ্ত) সাইফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার সারা দেশে কারফিউ জারি করেছে। কারফিউ চলাকালীন সময়ে যেসব জরুরি পরিষেবা সচল রাখার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ব্যাংকের নাম নেই। ইন্টারনেট বন্ধ থাকলে ব্যাংকিং লেনদেন বন্ধ থাকবে সেটিই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছুই করার নেই।’
ইন্টারনেট না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের স্থলবন্দরগুলোর শুল্কায়ন প্রক্রিয়াও বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে রফতানি পণ্যের সব ধরনের শুল্কায়ন বন্ধ রয়েছে। গতকাল সীমিত পরিসরে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পচনশীল আমদানি পণ্যের শুল্কায়ন শুরু হয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে দেশের অন্য সব স্থলবন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বেনাপোল কাস্টম হাউজের যুগ্ম পরিচালক শাফায়াত হোসেন বণিক বার্তাকে জানান, প্রতিদিন বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৩৫০ ট্রাক পণ্য আমদানি হয়। আর রফতানি হয় ১০০-১৫০ ট্রাক পণ্য। শুল্কায়ন বন্ধ থাকায় শনিবার রাত পর্যন্ত বন্দর এলাকায় ১০ হাজার ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে।
ইন্টারনেট না থাকায় বিদেশী ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট না থাকায় শিপিং বিলের অ্যাসাইকুডা এন্ট্রিসহ সব কার্যক্রম বন্ধ। কাস্টমস পুরোই কলাপস করেছে। আমাদের যেসব পণ্য বন্দরে পৌঁছেছে সেগুলোও পড়ে আছে। এমনও ঘটেছে যে চালান বোঝাই যানবাহন গিয়ে ডিপোয় প্রবেশ করতে পারেনি। ডিপোর বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সব। বলা যায়, পণ্যের চালান অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। মালামাল বন্দরে গিয়েও শিপমেন্ট হতে পারছে না। ক্রেতাদের আমরা বিষয়টি জানাতেও পারছি না।’
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘ইন্টারনেট না থাকায় ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন ক্রয়াদেশ নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ক্রেতারাও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। তাদের পক্ষ থেকে কোনো ই-মেইল এসে থাকলেও সেটা আমরা দেখতে পারছি না। এ পরিস্থিতিতে আমাদের কিছু ক্রয়াদেশও হারাতে হবে। তিনদিন ধরে টানা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’
সহিংস বিক্ষোভ থামাতে শুক্রবার রাত ১২টা থেকে দেশব্যাপী কারফিউ জারি করেছে সরকার। এতে সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সবকিছুই কারফিউর আওতায় এনেছে সরকার। এতে ঢাকাসহ সারা দেশের সব বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে রোববার ও সোমবার সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বন্ধ থাকছে ব্যাংক, পুঁজিবাজার, গার্মেন্টসহ সব ধরনের শিল্প-কারখানা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে অনেক সহিংস আন্দোলন ও সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু এবারের মতো এত বেশি প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি অতীতে কখনো হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ভোটাধিকারসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। কোটা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ও হামলার ঘটনায় জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই ঘটেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো আন্দোলনে এত বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি আর হয়নি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশে অনেক সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। তীব্র আন্দোলনের মুখে অনেক সরকারেরও পতন ঘটেছে। কিন্তু কোনো আন্দোলনেরই অর্থনৈতিক ক্ষতির ব্যাপ্তি এত বড় ছিল না। ইন্টারনেট না থাকায় দেশের সব ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ব থেকেও বাংলাদেশ এখন কার্যত বিচ্ছিন্ন। আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স সেবা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সবকিছুই ইন্টারনেটনির্ভর। অথচ দুইদিন ধরে দেশে ইন্টারনেট নেই। আন্দোলন স্বাভাবিক হয়ে এলেও অর্থনৈতিক ক্ষতির ক্ষত বাংলাদেশকে অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে।’
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিটিভিতে অগ্নিসংযোগ হয়েছে। আন্দোলনকারীরা দীর্ঘ সময় বিটিভির গেট আটকে বিক্ষোভ করেছে। মেট্রোরেল, কারাগারসহ সরকারি বহু ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। সরকার মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, ভোটাধিকারসহ বহু কারণে মানুষ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষও সম্পৃক্ত হয়েছে।’
একই মত বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনেরও। তিনি বলেন, ‘গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই এখন ইন্টারনেটনির্ভর। রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেলে যেমন মানুষ বেঁচে থাকে না, তেমনি ইন্টারনেট ছাড়া অর্থনীতি চলবে না। আমদানি, রফতানি, রেমিট্যান্স, রাজস্ব আদায়, সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম সবকিছুই স্থবির হয়ে গেছে। দেশের লাখ লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সিং করে জীবিকা নির্বাহ করে। ই-কমার্সসহ অনলাইনভিত্তিক শত শত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও এখন বন্ধ। এসবের অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা এতটা ব্যাপক ও বিস্তৃত যে সেটি নিরূপণ করাও সম্ভব নয়।’
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল। সরকার খুব সহজেই এটি সমাধান করতে পারত। কিন্তু সহজ সমাধানকে অনেক বেশি জটিল করে তোলা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দোলনের পরিণতি পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে গেছে। দেশের অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।’