একসময় আয়তন ও দৈর্ঘ্যে বেশ বড় ছিল রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর খাল। ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ খালটি এখন কোনোমতে নালার আকার নিয়ে টিকে আছে। একদিকে আবাসিক এলাকা, অন্যদিকে সরকারি অবকাঠামোর ফলে সংকুচিত হয়ে গেছে খালের সীমানা। অভিযোগ রয়েছে, খালের জায়গা দখল করে নির্মাণ হচ্ছে নতুন নতুন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। খোদ তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিরুদ্ধেও রয়েছে খালের জায়গা সংকুচিত করে সড়ক সম্প্রসারণের অভিযোগ।
সম্প্রতি রূপনগর আবাসিক এলাকায় নির্মিত নতুন রাস্তা পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, এক সময়ের খালের ওপর নির্মিত সড়কের কাজ প্রায় শেষ। এটি এখন কংক্রিটের ঢালাইয়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে নতুন করে বেশকিছু ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আগে থেকে বিদ্যমান সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে বহাল তবিয়তে।
এর আগে ২০১৯ সালে ডিএনসিসির বিরুদ্ধে মিরপুর-১ নম্বরের রূপনগর খাল দখল করে রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ তোলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এ নিয়ে একটি মামলাও হয়েছে। মামলার নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, খালটি এখন দেখাশোনা করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এর আগে এটি দেখভালের দায়িত্বে ছিল ঢাকা ওয়াসা। যদিও খালটির প্রকৃত মালিক জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
খালের বিদ্যমান বেহাল দশা নিয়ে কথা হয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খালটি আমরা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ওয়াসাকে দিয়েছি। এখন ডিএনসিসি দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করছে। খালের মালিকানা আমাদেরই রয়েছে। এর সীমানায় যদি কোনো অবকাঠামো থাকে তাহলে যথাযথভাবে কাগজপত্র দেখা সাপেক্ষে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) জানিয়েছে, এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে রূপনগর ঝিল সংরক্ষণ ও এর ভেতরকার সব ধরনের অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়ে আগের অবস্থায় কেন ফিরিয়ে আনা হবে না এই মর্মে সরকারকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেয়া হয় ২০১৬ সালে। অথচ হাইকোর্টের এ নির্দেশনা উপেক্ষা করে ধীরে ধীরে খালটিকে আরো দখলের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
কাগজে-কলমে রূপনগর আবাসিক এলাকার পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটির শুরু মিরপুর চিড়িয়াখানা সড়কের কাছ থেকে। আর শেষ হয়েছে দ্বিগুণ নামের আরেকটি খালের সঙ্গে মিশে। খালের পূর্বদিকে রূপনগর আবাসিক এলাকা, পশ্চিমে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। সীমানা নির্ধারণ না করায় নানাভাবে খালটি দখল হয়েছে। অনেক জায়গায় ভরাট করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রূপনগর খালের পরিধি ছিল অনেক বড়। এক দশক আগেও খালটি প্রকাণ্ড আকার নিয়ে দৃশ্যমান ছিল। করোনার আগে আগে এখানে রাস্তা নির্মাণ হয়। পরবর্তী সময়ে সরকারি অফিস নির্মাণ শুরু হয়।
তবে ডিএনসিসি দাবি করছে, রাস্তাটি ঝিলের বাইরে। মেয়র আতিকুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা নকশা দেখেই রাস্তা নির্মাণ করছি। কিছুদিন আগেই আমি রাস্তার নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেছি। এখানে অসংখ্য স্কুল শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। এলাকাবাসীর অনুরোধেই এ রাস্তা নির্মাণ করা হচ্ছে।’
রূপনগর খাল ও ঝিল দখল সম্পর্কে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘আমরা খালে অবৈধ দখলদারত্ব উচ্ছেদে নেমেছি। আগেই উচ্ছেদ করার কথা ছিল। নির্বাচনের কারণে পুলিশ পাইনি। আগামী মার্চে রূপনগর খালে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব। সেখানে বিসিআইসিসহ যারাই দখলে আছে তাদের সবাইকে সরে যেতে হবে। খালে কোনো অবৈধ দখলদারের থাকার সুযোগ নেই।’
নগরীর খাল-জলাশয় দখল করে রাস্তা নির্মাণের বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যখনই পরিবেশ-প্রতিবেশবিরুদ্ধ কোনো কাজ হয়েছে, তখনই “মানুষের দাবি” এমন অজুহাত দিয়ে প্রকল্প নেয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষে দেখা গেছে সাধারণ মানুষ নয়, বরং একটা গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে। নগরপিতা হলেন খালের অভিভাবক। তিনিই যদি জনগণের দাবির কথা বলে খালের ওপর রাস্তা নির্মাণ করেন তাহলে ঢাকার প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় জনগণ কার কাছে যাবে? একদিকে ডিএনসিসি খাল পরিষ্কার করছে, অন্যদিকে খাল দখল করে রাস্তা বানাচ্ছে। খুবই অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এ খাল হয়ে নৌকা দিয়ে তুরাগ নদে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল ডিএনসিসি। তাহলে সেখানে তো নৌপথ সংস্কার করার কথা। তা না করে নির্মাণ হচ্ছে সড়ক পথ!’
রূপনগর খালটি রাজধানীর উত্তর অংশের পানি নিষ্কাশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যানেল। একইভাবে খালসংলগ্ন ঝিলটিও বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ খালটির সঙ্গে সংযোগ ছিল ঢাকা উত্তরের অন্যান্য খালেরও। নথিপত্র বলছে, মিরপুরের পলাশনগরে বাইশটেকি খাল মিলিত হয়েছে সাংবাদিক কলোনি খালের সঙ্গে। এটি মিরপুর ১৪-বাউনিয়া খালের সঙ্গে মিলেছে। বাউনিয়া খাল-দ্বিগুণ খাল-রূপনগর মেইন খালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে মিলেছে তুরাগ নদে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার বাসযোগ্যতা তলানিতে যাওয়ার পেছনে এ খালটি মরে যাওয়া একটি বড় কারণ।
নগরবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিএনসিসির আওতায় যখন নতুন ১৮টি ওয়ার্ড আসে তখন এসব ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত খাল-জলাশয় দখলমুক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে দেয়া হয়। সেখানে রূপনগর খালের কথাও ছিল। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এখনো সে খাল উদ্ধার হয়নি। রূপনগর খাল যদি উদ্ধার করা না যায় তাহলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তিতে পড়বে। এ খাল হয়েই ঢাকার উত্তর অংশের পানি তুরাগ নদে গিয়ে পড়ে। এখানে ব্যক্তি বা সরকারি এক-দুটো প্রতিষ্ঠানের বিল্ডিং বাঁচানোর অজুহাতে যদি হাজার হাজার মানুষের জীবন ও পরিবেশ বৈচিত্র্য উপেক্ষা করা হয় তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’