হাওর : জলের জীবন

জীবিকার লড়াইয়ে নারীরাও

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার সময় অনেক মা নিজেদের খাবার কমিয়ে সন্তানদের জন্য রেখে দেন। অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যরা কাজের জন্য শহরে চলে যান, তখন পুরো সংসার সামলানোর দায়িত্ব একাই পালন করেন নারীরা।

ভোর হতেই হাওরের দূরে কোথাও নৌকার বৈঠার শব্দ, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে পাখির ডাক। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার লংকাপাথারিয়া প্রত্যন্ত গ্রামের ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন রহিমা বেগম (ছদ্মনাম)। হাতে একটি ছোট পাত্র, তাতে আলুভর্তা, ভাত আর শুকনো মরিচ। পাশেই তার আট বছরের ছেলে। স্কুলে যাওয়ার আগে ছেলেকে খাইয়ে দিতে হবে। তারপর নিজে নামতে হবে পানিতে কখনো মাছ ধরতে, কখনো অন্যের জমিতে কাজ করতে। শুধু রহিমা নয়, হাওরে প্রকৃতির বৈরিতা, অভাব-অনটন আর নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখতে প্রতিদিন নতুন করে সংগ্রামে নামতে হচ্ছে লাখো নারীকে। কখনো কৃষিকাজ, কখনো মাছ ধরা, গৃহস্থালির কাজ কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে পরিবারে যোগ করছেন আয়। দুর্যোগে ঘরবাড়ি, ফসল কিংবা আয়ের পথ হারালেও থেমে থাকছেন না তারা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর পরিবারের মুখে দুবেলা খাবার তুলে দিতে প্রতিকূলতার মধ্যেই লড়ে যাচ্ছেন এসব নারী।

জানা গেছে, হাওরাঞ্চলের মানুষের বছরের বড় একটি অংশ কাটে পানিবন্দি অবস্থায়। বর্ষা এলেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে অনেক গ্রাম। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন নারী ও শিশুরা। সন্তানদের নিরাপদ রাখা, খাবারের ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা—সবকিছুর বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়ে মায়ের কাঁধে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বন্যার সময় অনেক মা নিজেদের খাবার কমিয়ে সন্তানদের জন্য রেখে দেন। অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যরা কাজের জন্য শহরে চলে যান, তখন পুরো সংসার সামলানোর দায়িত্ব একাই পালন করেন নারীরা।

সালেহা বেগম বলেন, ‘আমরা তো কষ্ট করেই বাঁচি। কিন্তু চাই, আমার ছেলেটা যেন আমার মতো কষ্ট না করে। সারাটা বছর আমাদের কাজ আর দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পুরুষ মানুষ হাওরে কাজ করে, আর পুরো সংসার আমাকে সামলে রাখতে হয়। এর পাশাপাশি নিজের ছেলের দিকেও নজর রাখতে হয়। আমার ছেলেটা অনেক বড় হোক—এটাই আমার স্বপ্ন।’

দোয়ারাবাজার উপজেলার দক্ষিণ বংশীকুণ্ডা এলাকার স্বপ্না বেগম দুই মেয়েকে নিয়ে থাকেন। তার স্বামী ঢাকায় রিকশা চালান। স্বপ্না বেগম বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমার দুই মেয়ে পড়াশোনায় ভালো। তাদের স্বপ্ন, বড় হয়ে ডাক্তার ও আইনজীবী হবে। কিন্তু জানি না তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব কিনা। তবে আমি ও তাদের বাবা মিলে শেষ চেষ্টা করে যাব।’

হাওরের নারীদের জীবনে শিক্ষার অভাবও বড় একটি সমস্যা। অনেক মা নিজেরা স্কুলে যেতে পারেননি, কিন্তু সন্তানদের পড়াশোনা করানোর ব্যাপারে তারা আপসহীন। স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক জানান, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও অনেক মা সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করেন।

কলেজের প্রভাষক দুলাল মিয়া বলেন, ‘‌এখানে মায়েরা খুব সংগ্রামী। শুধু সংগ্রামী বললেও কম বলা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা আগ্রহী না হলেও মা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে চান। হাওরের এ মায়েরা হয়তো কখনো পুরস্কার পাবেন না, কেউ তাদের নিয়ে বড় করে লিখবে না। কিন্তু এ অঞ্চলে যে ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করে মানুষ হয়েছে, তাদের পেছনে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একজন জেদি মায়ের গল্প আছে।’

আরও