সংসদে অর্থমন্ত্রী

তেল গ্যাস বিদ্যুৎ সারে অতিরিক্ত ভর্তুকি প্রয়োজন ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

জাতীয় সংসদে গতকাল ঢাকা-১৮ আসনের সরকারি দলের সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান তিনি। প্রশ্নে সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে কিনা, জানতে চাওয়া হয়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন পর্যন্ত শুধু এ চার খাতেই অতিরিক্ত প্রায় ৪২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।’

তিনি জানান, অতিরিক্ত ভর্তুকির মধ্যে তেল খাতে প্রায় ১০ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, গ্যাস খাতে ১১ হাজার ১৭০ কোটি, বিদ্যুৎ খাতে ১৯ হাজার ৮২১ কোটি ও সার খাতে ১ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তাৎক্ষণিক ও সম্ভাব্য উভয় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।’

তিনি জানান, এ পর্যন্ত এর প্রভাব প্রধানত জ্বালানি, সার, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে ব্যয় বাড়িয়ে বাজারদর ও মূল্যস্ফীতির ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান কর্মক্ষেত্র। ফলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বন এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।’

সিলেট-৩ আসনের সরকারি দলের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালেকের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য কোনো সুদমুক্ত ঋণ কর্মসূচি নেই। তবে সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা চালু করা হয়েছে।’

তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত কুটির, অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে (সিএমএসই) নতুন উদ্যোক্তা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আকার ১০০ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ স্কিমের আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে জামানত ছাড়াই ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এছাড়া জামানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

স্টার্টআপ খাতকে আরো সহায়তা দিতে ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন।’

দেশীয় মূলধন সংগ্রহ বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্কারের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এর কার্যকর অবদান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।’

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আশা প্রকাশ করেন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ও চলমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে আগামী দিনে পুঁজিবাজারে নতুন গতি সঞ্চার হবে এবং এর মাধ্যমে জনগণের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজার আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পুঁজিবাজারকে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

আরও