উৎপাদন ঘাটতিতে আমদানির মাধ্যমেই মেটানো হয় দেশে পেঁয়াজের চাহিদার বড় অংশ। চার মাস উৎপাদন মৌসুম না থাকা, চাহিদায় ঘাটতি, একক দেশনির্ভর আমদানির কারণে পেঁয়াজের বাজার মাঝেমধ্যেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। প্রতি বছর নিয়ম করে এক কিংবা দুবার পণ্যটির দামের এ অস্থিতিশীলতা কমাতে প্রশাসনের তত্পরতা ও অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। যদিও তা সীমাবদ্ধ থাকে পাইকারি বাজার পর্যন্তই।
গত সোমবার দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিক রাখা ও ক্রয় রসিদ না থাকার পরিপ্রেক্ষিতে ১০টি কমিশন এজেন্ট প্রতিষ্ঠানকে ৭৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ বিক্রি বন্ধ করে দেন। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের ব্যবসায়ী নেতারা ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘট থেকে সরে আসেন। আমদানিকারকরা পণ্য আড়তে পাঠালে কেজিপ্রতি কমিশনের মাধ্যমে আড়তগুলো পণ্য বিক্রি করে। এক্ষেত্রে আমদানিকারক ও তাদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়কারী ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেয়া দামের বাইরে পেঁয়াজ বিক্রির সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা।
জানা গেছে, দেশে বছরব্যাপী পেঁয়াজ আমদানির অন্যতম উৎস দেশ ভারত। উত্তরাঞ্চলের ভোমরা, হিলি, সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে দেশে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ ভারত থেকে আমদানি হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দেশীয় প্রতিনিধিরা স্থলবন্দর এলাকার পাইকারি বাজারে কমিশনের মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি করেন। ওইসব ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ কিনে সারা দেশের বড় বড় পাইকারি বাজারগুলোতে পাঠিয়ে দেন। আড়তে আসার পর আমদানিকারক কিংবা ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেয়া দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে স্থানীয় আড়তগুলো। এক্ষেত্রে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রিতে ৫০ পয়সা, প্রতি কেজি আদা ও রসুন বিক্রিতে ১ টাকা হারে কমিশন পায় আড়তগুলো। পণ্য বিক্রির পর টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে আমদানিকারক কিংবা স্থলবন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
পেঁয়াজ আমদানি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনও। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময় বাজার তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় পেঁয়াজের মতো পণ্যের দামের ওঠানামার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়েছে। মূলত আমদানিকারকসহ স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা দেশের পাইকারি বাজারগুলোতে পেঁয়াজ সরবরাহ ও দাম নির্ধারণ করেন। আমরা বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানিয়েছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ডেপুটি সেক্রেটারি পর্যায়ের কর্মকর্তা শিগগিরই পাইকারি বাজারগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরেজমিনে এসে বৈঠক করে আগামীতে পেঁয়াজসহ অতি নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে কাজ করবেন।’ তবে পাইকারি বাজারের আড়তগুলোতে পণ্যের ক্রয় রসিদ না থাকার কারণে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা আদায় করে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করে খাতুনগঞ্জের একাধিক কাঁচাপণ্য বিক্রয়কারী ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা বণিক বার্তাকে বলেন, মোবাইলে যোগাযোগ সহজতর হওয়ায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় পেঁয়াজের দামের খোঁজ নেন স্থলবন্দরের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। চাহিদা বেশি থাকা সাপেক্ষে অনেক সময় তারাই দাম পাল্টে বাড়িয়ে দিতে বলেন। আমদানিকারক ব্যবসায়ীদের নির্দেশমতো দামে পণ্য বিক্রি করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আড়তগুলোতে পণ্য পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করেন আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা। ফলে স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত দামেই পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন বলে দাবি করেছেন খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের আড়তগুলোর ব্যবসায়ীরা। কিন্তু প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় আড়তগুলোকেই জরিমানাসহ বিভিন্ন ভোগান্তি পোহাতে হয়। অধিকাংশ সময়ই পেঁয়াজ ক্রয়ের রসিদ চাওয়া হলেও কমিশন এজেন্ট পদ্ধতির কারণে সেটি দেখাতে ব্যর্থ হলে জরিমানার কবলে পড়ে পাইকারি বাজারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়ে পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণসহ সার্বিক বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান চান তারা।
পেঁয়াজের উৎপাদনের তথ্য নিয়ে সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যগত বিভ্রাট রয়েছে। ফলে কতটুকু উৎপাদন হচ্ছে আমার কতটুকু আমদানি করতে হবে সেই তথ্য পর্যালোচনা করতে হিমশিম খেতে হয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে দেশে প্রতি বছর সাত থেকে আট লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পেঁয়াজ আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশের বাজারে কোনো না কোনো সময় পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। দেশীয় উৎপাদন মৌসুমে ভারতের পেঁয়াজের রফতানিমূল্য কম থাকায় দেশের বাজারে সস্তা থাকলেও অন্যান্য সময় পেঁয়াজের দাম ক্রমান্বয়ে ঊর্ধ্বমুখী দেখা যায়। এ কারণে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া বছরব্যাপী পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের কাঁচাপণ্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বণিক বার্তাকে বলেন, এক সময় খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ আমদানি করতেন। কিন্তু এখন স্থলবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলো পেঁয়াজ আমদানির সঙ্গে যুক্ত। খাতুনগঞ্জ ও দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারের প্রতিষ্ঠানগুলো কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আড়তগুলোর মুখ্য ভূমিকা না থাকলেও প্রশাসনের তোপের মুখে পড়তে হয় আড়তগুলোকে। রমজান, কোরবানির ঈদ কিংবা বৈশ্বিক সংকটের সময় দাম বৃদ্ধিজনিত কারণে মূল আমদানিকারকদের পরিবর্তে আড়তগুলোকে জরিমানা করা, শ্রমিক-কর্মচারীদের গ্রেফতার করা হয়। প্রশাসনের এসব উদ্যোগে কখনই দামে প্রভাব পড়ে না। আট মাস আগেও একই ধরনের অভিযান পরিচালনা করে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ সময় ধরে যেসব সংকট ও সংকট থেকে উত্তরণের দাবি করেছিল, শেষ পর্যন্ত সেই পথেই হাঁটতে হয়েছে সরকারকে।
বর্তমানে ভারতে বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ফসলহানি ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কারণে মজুদ দেশীয় পেঁয়াজের সংকটে নিত্য এ পণ্যটির দাম নিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু না হলে পেঁয়াজের বাজার বিগত বছরের মতো ফের ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাতুনগঞ্জের বৃহস্পতিবারের বাজার দর অনুযায়ী, প্রতি কেজি আমদানীকৃত ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকায় (মানভেদে)। যদিও একই দিন সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পেঁয়াজের দাম ছিল ৩৯ থেকে ৪১ টাকা। স্থলবন্দরে তুলনামূলক কয়েক টাকা কম থাকায় ট্রাকপ্রতি পেঁয়াজ পাঠিয়ে লাভ করেন আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
জানতে চাইলে হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজের কমিশন এজেন্ট ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. ওমর আলী ফকির বণিক বার্তাকে বলেন, ভারতের বাজারে পেঁয়াজের রফতানিমূল্য প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। এ কারণে দেশের বাজারেও পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। রফতানিমূল্য বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে পেঁয়াজ আমদানিও কমে গেছে। তাছাড়া ভারতীয় রফতানিকারকরা কমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করায়। ফলে পচনশীল এ পণ্যটির দাম একক কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো পাইকারি বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বলে দাবি করেন তিনি।