১৬, ডিসেম্বর ১৯৭১। দিনটি শুরু হয়েছিল এক অস্বাভাবিক নীরবতা নিয়ে। ঢাকার শীতের সকালের বাতাসে তখন কুয়াশার সঙ্গে মিশে ছিল চাপা উৎকণ্ঠা। নয় মাস ধরে গোলাগুলি, বোমাবর্ষণ, মৃত্যুর সংবাদের সঙ্গে আশা-নিরাশার দোলাচলে বাস করা এক জনপদ যেন সেদিন ভোরে হঠাৎ থমকে গিয়েছিল। মানুষ জানত, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক কী ঘটবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছিল না কেউই।
মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মৃতিকথা ও দিনলিপিতে জানা যায়, ১৬ ডিসেম্বরের সকাল থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন গোলাগুলি ও প্রতিরোধ কমে আসতে শুরু করে। পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান ছিল রক্ষণাত্মক ও ভঙ্গুর। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যখন মিত্রবাহিনীর সাঁজোয়া যান ও মুক্তিসেনারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে ঢাকার অভ্যন্তরে প্রবেশ শুরু করেন, তখন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। ঘরের জানালা, ছাদ, বারান্দা থেকে মানুষ সেই দৃশ্য দেখছিল—কেউ হাত নেড়ে, কেউ চোখ মুছতে মুছতে।
১৫ ডিসেম্বর থেকেই আত্মসমর্পণের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের দমন–পীড়ন ও প্রতারণার অভিজ্ঞতা মানুষকে সহজে আশাবাদী হতে দেয়নি। জাহানারা ইমাম তার দিনলিপিতে লিখেছেন, ১৬ ডিসেম্বরের সকালে মনে হচ্ছিল—‘আজ হয়তো শেষ, আবার হয়তো সবচেয়ে ভয়ংকর দিন।’ এই দ্বন্দ্বই ছিল সেই সকালের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
দুপুরের দিকে পরিস্থিতি দ্রুত স্পষ্ট হতে থাকে। আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়া তখন সামরিক ও কূটনৈতিক—উভয় পর্যায়েই চূড়ান্ত হচ্ছিল। ভারতীয় ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে এফ আর জেকব শর্তাবলি নিয়ে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরে পৌঁছান। শর্ত ছিল একটাই—নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
জেকব তার স্মৃতিকথা সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা -এ লিখেছেন, আত্মসমর্পণের শর্তাবলি পড়ার সময় লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজীর চেহারায় পরাজয়ের গ্লানি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসে অশ্রু। একটি সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর পক্ষে একটি নিরস্ত্র জাতির কাছে আত্মসমর্পণ ছিল তার জন্য চরম অপমান। ঐ মুহূর্তটি ছিল মূলত ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রতি পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি।
বেলা আড়াইটার দিকে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ঘটে যায় ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। মিত্রবাহিনীর পক্ষে স্বাক্ষর করেন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে সেখানেই।
আত্মসমর্পণের ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, এটি ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসে সবচেয়ে অপমানজনক মুহূর্ত। আর বাঙালির কাছে, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত।
বিজয়ের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশ। ছবি- সংগৃহীত
আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত লক্ষাধিক জনতা বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে। ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। মুক্তিসেনাদের বুকে জড়িয়ে ধরে মানুষ। আনন্দ আর অশ্রু মিলেমিশে তখন একাকার।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, আত্মসমর্পণের খবর শোনার পর মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়—তারপর এক ধরনের নীরব আনন্দ। কেউ খুব জোরে হাসছিল না, কেউ খুব জোরে কাঁদছিল না; যেন সবাই একসঙ্গে বুঝে নিচ্ছিল, এই আনন্দের ভেতর গভীর শোক লুকিয়ে আছে (স্মৃতি ১৯৭১)।
দীর্ঘ নয় মাসের বন্দীত্ব ও মৃত্যুভয়ের মধ্য দিয়ে ঢাকা সেদিন দেখেছিল এক নতুন সূর্যোদয়। সন্ধ্যার পর নামে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাত। অনেক ঘরে দীর্ঘদিন পর ভয় ছাড়া আলো জ্বলে। কারফিউ নেই, হঠাৎ গুলির শব্দ নেই। রাস্তায় মানুষ দাঁড়িয়ে কথা বলছে, কেউ কেউ শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে—এই স্বাধীন আকাশ সত্যিই কি না, তা যেন নিশ্চিত করে দেখছে।
শত শত সেলাই মেশিন তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে নতুন লাল-সবুজ পতাকা বানাতে। কোথাও আনন্দ, কোথাও নীরবতা। তবে এই বিজয়ের রাতেই নেমে আসে গভীর এক ছায়া। ১৪ ডিসেম্বর হত্যা করা বুদ্ধিজীবীদের লাশ খুঁজে পাওয়া যেতে থাকে রায়েরবাজার, মিরপুরসহ বিভিন্ন বধ্যভূমিতে। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, বিজয়ের দিনেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র সামনে আসতে শুরু করে; আনন্দ তখন দ্রুত শোকে রূপ নেয় (মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড)।
১৬ ডিসেম্বর শুধু পতাকা ও স্লোগানের দিন নয়। এটি একই সঙ্গে স্মরণের দিন, আত্মজিজ্ঞাসার দিন। এটি মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, দুই লাখ নারীর নির্যাতন আর অসংখ্য মানুষের না-বলা কষ্টের ইতিহাস।
পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর আজও প্রশ্ন তোলে—আমরা কি সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখতে পেরেছি? বিজয়ের মানে কি শুধু উৎসব, নাকি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার দায়ও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে?
জাতিসত্তা যখন পেছন ফিরে তাকায়, দেখে—বিজয়ের সেই স্মৃতিকথায় ছিল যুগপৎ হাসি ও কান্নার গল্প। স্বাধীনতার আনন্দে তখন মানুষ হাসছে। আবার আপনজন হারানোর বেদনায় উৎসারিত কান্নার স্রোতে সেই হাসির ভেসে যাওয়াও ছিল সেই স্মৃতিতে। ছিল জনতার দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে স্বাধীন দেশকে প্রথমবারের মতো প্রাণভরে দেখার এক অনির্বচনীয় আনন্দ, যেন কান্নাভেজা চোখে ফুটতে দেখা এক অনিন্দ্য সুন্দর কার্পাস ফুল।