২০১৯ সালে চট্টগ্রামের শিকলবাহায় রোগটি প্রথম শনাক্ত হলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। গত বছর রোগটির প্রাদুর্ভাব সীমিত থাকলেও চলতি বছর রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। এলএসডিতে আক্রান্ত গরুর মাংস ও দুধ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে আক্রান্ত গরু নিয়ে আশঙ্কায় আছেন খামারিরা।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্ত বাছুর ভবিষ্যতে কম দুধ ও মাংস উৎপাদন করতে পারে। এতে কয়েক বছর পর খামারিদের উৎপাদন ও আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক বছর বা তার কম বয়সী বাছুর আক্রান্ত হওয়ার পর পূর্ণবয়স্ক গরু থেকে দুধ উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদে আক্রান্ত গরুর পেছনে অর্থ বিনিয়োগকে ঝুঁকি বলে মনে করছেন খামারিরা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এলএসডি ১৯২৯ সালে প্রথম আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়ায় দেখা যায়। পরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রোগটি ছড়িয়ে পড়লে আক্রান্ত গরু মারা যায় এবং শত শত খামার বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৯ সালে চীন ও ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহার খামারগুলোয় প্রথম রোগটি দেখা যায়। কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি উপযোগী না হওয়ায় রোগটি ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশেও।
চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোয় প্রতিদিনই বাড়ছে এলএসডিতে আক্রান্ত গরুর চিকিৎসা নিতে আসার সংখ্যা। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে চিকিৎসা নিতে আসা গরুগুলোর বেশির ভাগই শাহিওয়াল জাতের। ফ্রিজিয়ান জাতের বাছুরও আছে। আক্রান্ত বেশির ভাগ বাছুরের বয়স এক বছরের নিচে। তবে এক বছরের বেশি বয়সী বাছুরও রয়েছে। এর মধ্যে লোহাগাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে চিকিৎসা নিতে আসা ২৫ শতাংশ, আনোয়ারায় ৩০, হাটহাজারীতে ৩০, কর্ণফুলীতে প্রায় ৩০, ফটিকছড়িতে ৪০ ও বোয়ালখালীতে ২০ শতাংশের বেশি গরু এলএসডিতে আক্রান্ত। অন্যান্য উপজেলায়ও এলএসডিতে আক্রান্ত হয়েছে গরু। সরকারি হিসাবের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চিকিৎসা দিচ্ছেন মালিকেরা। সেজন্য বাস্তবে এ রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা আরো বেশি।
এ প্রসঙ্গে ফটিকছড়ি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল মোমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএসডিতে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা বাড়ছে। বেশির ভাগই এক বছরের নিচে। শাহিওয়াল জাতের বাছুর বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এক মাস আগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা কম থাকলেও এখন প্রতিদিনই আক্রান্ত গরু আসছে। সরকারি ভ্যাকসিন কিছু বরাদ্দ পাওয়ায় আমরা সেগুলো বিতরণ করেছি। অনেকেই নিজ উদ্যোগে গরুর চিকিৎসা করছেন।’
বোয়ালখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রুমন তালুকদার বণিক বার্তাকে জানান, এক বছর এ রোগে আক্রান্ত গরুর সংখ্যা বাড়লে পরের বছর কমে যায়। কারণ খামারিরা এক বছর ভ্যাকসিন দিলেও পরের বছর গরু ভালো থাকে। পরের বছর আবারো গরু এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত বাছুর, গরু বা গাভীকে প্রতি বছর ভ্যাকসিন দিলে রোগটির প্রভাব কমিয়ে আনা সম্ভব।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, দেশী জাতের গরুর এলএসডির সংক্রমণ তেমন দেখা যায়নি। মূলত বিদেশী জাতের গরুই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। রোগটি ছোঁয়াচে হওয়ায় বাছুর-গরু আক্রান্ত হচ্ছে। বাছুরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে। সে কারণে এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। খামারিরা যদি নিয়ম মেনে প্রতি বছর ভ্যাকসিন দিতে পারেন, তাহলে রোগটির সংক্রমণ কমে আসবে। সরকারি ভ্যাকসিনের সরবরাহ কম। তবে বাজারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। দুই-আড়াই হাজার টাকা দাম হলেও একটি দিয়ে ১০টি গরুকে ভ্যাকসিন দেয়া যায়। খরচও কম। সে কারণে খামারিদের আরো সতর্কতা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আলমগীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শাহিওয়াল জাতের গরু এলএসডিতে আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা বিশেষ করে আক্রান্ত বাছুরকে যাতে প্রতি বছর ভ্যাকসিন দেয়া হয়, সে বিষয়ে কর্মকর্তা ও খামারিদের পরামর্শ দিচ্ছি। বাছুরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকায় সংক্রমণ বেড়েছে। সেজন্য বাছুরের বয়স কম হলেও ভ্যাকসিন দেয়ার কথা জানিয়েছি।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এলএসডি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। মশা, মাছি, আটালি, আক্রান্ত পশুর লালা, নাক-চোখের ডিসচার্জ, ব্যবহৃত ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। অনুকূল পরিবেশে এ ভাইরাস ছয় মাস পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে। এ রোগে গরু দুর্বল হয়ে ওজন কমে যায়, দুধ উৎপাদন কমে যায় এবং চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়। চামড়ার নিচের মাংসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আক্রান্ত পশুর শরীরে ১০৪-১০৬ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে এবং গরু খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেয়।
কর্ণফুলী উপজেলার খামারিরা জানান, এ উপজেলা থেকে দেশে এলএসডির প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছে। প্রতি বছরই রোগটি বিভিন্ন জেলা বা উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ছে। বাছুর আক্রান্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি গরু লালন-পালন করা হয় দুধ কিংবা মাংস উৎপাদনের জন্য। এ রোগে আক্রান্ত গরুর থেকে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাছুর ছোট থেকে বড় করতে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। বিশেষত শাহিওয়াল ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু লালন-পালনে খামারিদের আগ্রহ থাকলেও এসব রোগব্যাধির কারণে খামারিরা বিকল্প পেশায় চলে যাচ্ছেন।
সার্বিক প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলএসডি খুবই ছোঁয়াচে রোগ। শাহিওয়াল জাতের বাছুরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে সময় লাগে। বিদেশী জাতের গরু এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত গরুকে প্রতি বছর ভ্যাকসিন দিলে রোগের প্রাদুর্ভাব কমে আসবে।’