ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড দ্বৈরথে আজ শুরু বিশ্বকাপ

চার বছর আগে যেখানে শেষ হয়, আজ ঠিক সেখান থেকেই আবার শুরু। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবহুল লর্ডসের সবুজ গালিচায় ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনালের অংশ হয় ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। ক্রিকেটে আগের সব নাটকীয়তাকেই যেন হার মানানো এ ফাইনাল শেষে শিরোপার উচ্ছ্বাসে ভেসেছিল স্বাগতিক দেশ, আর ক্রিকেটের নিষ্ঠুরতম ট্র্যাজেডির শিকার হয় তাসমান

চার বছর আগে যেখানে শেষ হয়, আজ ঠিক সেখান থেকেই আবার শুরু। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় ঐতিহ্যবহুল লর্ডসের সবুজ গালিচায় ক্রিকেট বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে নাটকীয় ফাইনালের অংশ হয় ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। ক্রিকেটে আগের সব নাটকীয়তাকেই যেন হার মানানো এ ফাইনাল শেষে শিরোপার উচ্ছ্বাসে ভেসেছিল স্বাগতিক দেশ, আর ক্রিকেটের নিষ্ঠুরতম ট্র্যাজেডির শিকার হয় তাসমান সাগরপাড়ের দেশ নিউজিল্যান্ড। বর্তমানে সাদা বলের ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা এ দুটি দল ২০২৩ আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে। আজ বাংলাদেশ সময় বেলা আড়াইটায় ভারতের আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে শুরু হবে হাইভোল্টেজ এ ম্যাচ। 

জোফরা আরচার থেকে মার্টিন গাপটিল...গাপটিল থেকে জেসন রয়...রয় থেকে জস বাটলার এবং বাটলার স্টাম্প ভেঙে ইংল্যান্ডকে শিরোপার গৌরবে ভাসিয়েছেন।

চার বছর আগের লর্ডসের স্মৃতিটা ক্রিকেট অনুরাগীদের মনে এখনো তাজা। ভোলার কথাও নয়। ক্রিকেটে এমন রোমাঞ্চকর ঘটনা কমই ঘটেছে। নিউজিল্যান্ডের করা ২৪১ রান তাড়া করতে নেমে ইংল্যান্ডও সবক’টি উইকেট হারিয়ে তোলে ২৪১ রান। এরপর সুপার ওভারও টাই! তখন দুই দলকে আলাদা করা হয় বাউন্ডারির সংখ্যা গুনে। কিউইদের চেয়ে বেশি বাউন্ডারি মারার সুবাদে সেদিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয় ইংল্যান্ডকে। প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়ে ইংলিশরা, আর কিউইরা প্রথমের খুব কাছাকাছি গিয়েও ব্যর্থ হয়। 

লর্ডসের সেই ফাইনালের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে আজ আইকনিক নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে। ১ লাখ ৩৪ হাজার ধারণক্ষম স্টেডিয়ামটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ছয় সপ্তাহের এ আসরে এই মাঠে চলতি আসরের উদ্বোধনী ম্যাচ ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ অক্টোবর ভারত-পাকিস্তান মহাদ্বৈরথও এখানে বসছে। 

এ মাঠে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও আয়োজনের কথা ছিল, যা শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়। যদিও গতকাল নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে এক হয়েছিলেন অংশগ্রহণকারী ১০ দলের অধিনায়করা। তারা ঐতিহ্য মেনে ফটোসেশনে অংশগ্রহণ করেন। ক্যাপ্টেন্স মিটে কথাও বলেন। নিজ নিজ দেশের বিশ্বকাপ ভাবনার কথাগুলো অধিনায়করা তুলে ধরেন এ স্টেডিয়ামে। আজ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ক্রিকেট ইতিহাসে ঢুকে পড়বে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম। 

২০১৯ সালে পঞ্চমবারের মতো আয়োজক হয়ে আর চতুর্থবারের মতো ফাইনাল খেলে অবশেষে সফলতা পায় ইংল্যান্ড। ইংলিশদের সামনে এখন নতুন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। শীর্ষ র‍্যাংকধারী দলটির সামনে ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় দল হিসেবে টানা দুবার বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি। আগে এ কীর্তি আছে কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজ (১৯৭৫ ও ১৯৭৯) ও অস্ট্রেলিয়ার (১৯৯৯, ২০০৩ ও ২০০৭)।   

২০১৯ সালে ইয়োন মরগানের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো ওয়ানডের শ্রেষ্ঠত্ব পায় ইংল্যান্ড। এবার ইংলিশ ব্রিগেডের নেতৃত্বে আছেন সাদা বলে বিশ্বের অন্যতম আগ্রাসী ব্যাটার জস বাটলার। অধিনায়ক বদল হলেও ইংল্যান্ডের অ্যাপ্রোচে কোনো বদল হয়নি। প্রতিপক্ষকে স্রেফ গুঁড়িয়ে দেয়াই তাদের দর্শন। 

২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের মহানায়ক বেন স্টোকস ২০২২ সালের টি২০ বিশ্বকাপ শেষে ওয়ানডে ক্রিকেটটাই ছেড়ে দেন। যদিও এবার বিশ্বকাপ শুরুর কিছুদিন আগেই অবসর ভেঙে ফিরে আসেন ওয়ানডে ফরম্যাটে, জায়গা করে নেন বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও। তিনি আসায় আগেই শক্তিশালী ইংলিশদের শক্তি আরো বাড়বে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১২৪ বলে ১৮২ রানের বিস্ফোরক ইনিংস খেলে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধুই ফেরার জন্য ফিরছেন না। তার ক্ষুধাটা যে এখনো মরেনি। 

হাঁটুতে অস্ত্রোপচার করানোয় এবার শুধু স্পেশালিস্ট ব্যাটার হিসেবে খেলার কথা স্টোকসের। নতুন করে যোগ হয়েছে নিতম্বের ব্যথা। ফলে আজ তাকে একাদশে দেখা না-ও যেতে পারে। তাকে নিয়ে বাটলার কাল বলেছেন, ‘আমরা সঠিক সিদ্ধান্তই নেব। তিনি যদি খেলার জন্য ফিট না হন, তবে খেলবেন না। টুর্নামেন্টের এ পর্যায়ে ঝুঁকি নেয়ার মতো সময় আসেনি।’

এবারো ভয়ংকর স্কোয়াড ইংল্যান্ডের। জনি বেয়ারস্টো, ডেভিড মালান, হ্যারি ব্রুক, জস বাটলার, স্টোকস, লিয়াম লিভিংস্টোন, মঈন আলী, ক্রিস ওকস, স্যাম কারান—ইংলিশ ব্যাটিং লাইনআপের গভীরতা সহজেই অনুমান করে নেয়া যায়। বোলিংয়ে ওকস, কারান, মার্ক উড, রিস টপলির পেসের সঙ্গে স্পিনে ভরসা করার মতো নাম আদিল রশিদ। পাশাপাশি হাত ঘোরাবেন মঈন আলীও। 

ইংলিশরা ভালো ফর্ম নিয়েই বিশ্বকাপের শিরোপা রক্ষার মিশন শুরু করতে চলেছে। গত মাসে এ নিউজিল্যান্ডকেই হোম সিরিজে হারিয়েছে বাটলারের দল। আর বিশ্বকাপের ওয়ার্মআপ ম্যাচে বাংলাদেশকে চার উইকেটে হারিয়েছে তারা। বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৯৭ রান তাড়া করতে গিয়ে ইংলিশরা ১১৪ রানে ৫ উইকেট হারালেও পরে মঈন আলীর বিস্ফোরক ব্যাটিং তাদের সহজ জয় এনে দেয়। 

বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে ৬ ছক্কা ও ২ চারে ৩৯ বলে ৫৬ রান করা মঈন আলী ম্যাচ শেষে বলছিলেন, ‘বোলাররা বল করতে পেরেছে ও ব্যাটাররা খানিকটা সময় পেয়েছে বলে ম্যাচটি আমাদের কাছে দারুণ ছিল। নিউজিল্যান্ড ম্যাচের জন্য আমরা এখন তৈরি। এটা বিরাট এক ম্যাচ। তারা খুবই বিপজ্জনক একটি দল।’

নিউজিল্যান্ডের জন্যও আবার নতুন স্বপ্ন, নতুন শুরু। টানা দুটি ফাইনাল খেলেও বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে না পারার কষ্ট বুকে জমা করেই এবার ভারতে মিশনে নামছেন কিউইরা। যদিও কিউইদের যে মানসিকতা তাতে চার বছর আগের লর্ডস ট্র্যাজেডি তাদের কোনোভাবেই দুর্বল করতে পারবে না। মূল লড়াইয়ে ও সুপার ওভারে তারা হারেনি। অন্তত এ বিষয়টি কেন উইলিয়ামসনের দলের বিশ্বাসটা অটুট রাখতে সাহায্য করবে। 

এবার কিউইদের স্বপ্নপূরণে বড় বাধা হতে পারে ইনজুরি। দলের দুই বড় খেলোয়াড় চোটের সঙ্গে লড়ছেন। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন হাঁটুর অস্ত্রোপচার করানোর পর ধীরে ধীরে সেরে উঠছেন। পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ার্মআপ ম্যাচে ১০১ বল মোকাবেলা করে ৯১ রান করেছেন তিনি। যদিও পূর্ণ ফিট না হওয়ায় আজ তিনি খেলবেন না এবং সেটা এক সপ্তাহ আগেই জানিয়ে দেয় কিউই ম্যানেজমেন্ট। অভিজ্ঞ ফাস্ট বোলার টিম সাউদি গত মাসে ইংল্যান্ড সফরে হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির চোটে পড়েন। তিনি সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। 

চোটে থাকলেও দুই খেলোয়াড়ই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছেন। বাকি ১৩ জনের মধ্য থেকেই আজ একাদশ গঠন করতে হবে নিউজিল্যান্ডকে! রাচিন রবীন্দ্র আর মার্ক চ্যাপম্যানকে সাইডবেঞ্চে বসে থাকতে হবে। 

উইলিয়ামসনের অনুপস্থিতিতে কিউইদের নেতৃত্ব দেবেন টম ল্যাথাম। তিনি অলরাউন্ড স্কোয়াডই পাচ্ছেন। স্পিনার ইশ সোধি ও মিচেল স্যান্টনারের উপমহাদেশের কন্ডিশনে ভালো করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজের শেষ বিশ্বকাপে গতির ঝড় তুলতে তৈরি ট্রেন্ট বোল্ট। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে নেতৃত্ব দেয়া লোকি ফার্গুসন, ম্যাট হেনরি আর জেমস নিশামকে নিয়ে থাকছে কিউইদের বোলিং ব্রিগেড। 

ব্যাটিংয়ে ওপেন করবেন উইল ইয়াং ও ডেভন কনওয়ে। এরপর ড্যারিল মিচেল, গ্লেন ফিলিপস, ল্যাথাম আর নিশাম। 

পরের ম্যাচে উইলিয়ামসন ফিরলে, আর টুর্নামেন্টের শেষ দিকে সাউদি যোগ দিলে আগের আসরের মতোই প্রতিপক্ষের জন্য বিপজ্জনক এক দল হয়ে উঠবে নিউজিল্যান্ড। 

২০১৫ সাল থেকে আইসিসির প্রতিটি সাদা বলের আসরেই সেমিফাইনাল খেলেছে নিউজিল্যান্ড। কিউইদের সোনালি প্রজন্মের এ দলটি এবারো ন্যূনতম সেমিফাইনালের আশা করতেই পারে। আর নিশ্চিতভাবেই আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শুভসূচনা চাইবে ল্যাথামের দল। 

বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচ সামনে রেখে কিউইদের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক ল্যাথাম গতকাল বলেছেন, ‘আমাদের এ গ্রুপটির জন্য ভালো যে দিকটি তা হলো, আমরা একটি নির্দিষ্ট মান ধরে রেখেছি এবং বেশ কয়েক বছর ধরেই আমরা সেটি করে যাচ্ছি। কাজেই আগামীকাল (আজ) বড় একটি ম্যাচ ও উপলক্ষ হলেও এটি আমাদের জন্য স্রেফ আরেকটি ম্যাচই। আর আমরা যেটা ভালো পারি সেটা যদি করতে পারি, তবে দিনশেষে ভালো অবস্থানেই থাকব।’ 

আরও