পোশাক ক্রেতা ইন্ডিটেক্স

উজবেকিস্তানসহ বিশ্বের ৯৭ দেশে আছে স্টোর নেই বাংলাদেশে

স্পেনভিত্তিক পোশাকপণ্যের ক্রেতা ইন্ডিটেক্স। বৈশ্বিক এ জায়ান্টের উল্লেখযোগ্য পণ্য সরবরাহকারী দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।

স্পেনভিত্তিক পোশাকপণ্যের ক্রেতা ইন্ডিটেক্স। বৈশ্বিক এ জায়ান্টের উল্লেখযোগ্য পণ্য সরবরাহকারী দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া পণ্য বিক্রি হয় ইন্ডিটেক্সের সাড়ে পাঁচ হাজার স্টোর বা বিক্রয় কেন্দ্রে। উজবেকিস্তানসহ বিক্রয় কেন্দ্রগুলো রয়েছে বিশ্বের ৯৭টি বাজার বা দেশে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী চলতি বছর ৯৮তম দেশ হিসেবে বিক্রয় কেন্দ্র চালুর গন্তব্য ইরাক। অথচ ইন্ডিটেক্সের পোশাকের বড় সরবরাহকারী বাংলাদেশে নেই তাদের কোনো স্টোর।

ইন্ডিটেক্স-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিক্রয় কেন্দ্র চালুর আগ্রহ রয়েছে ইন্ডিটেক্সের। ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ সফরে আসা বৈশ্বিক এ জায়ান্টের প্রতিনিধি দলে থাকা কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হলো পোশাকের কাঁচামাল সুতা-কাপড় আমদানিতে আরোপিত উচ্চহারের শুল্ক।

ইন্ডিটেক্স প্রতিনিধি দলটি ৬ এপ্রিল পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সফর করে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও অস্কার গার্সিয়া ম্যাসেইরাসের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে ছিলেন চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার ফ্রান্সিসকো জাভিয়ের লোসাদা মন্টেরো, সিইও অফিসের প্রেস ও কমিউনিকেশন প্রধান রাউল এস্ত্রেডেরা ভাজকেজ, পাবলিক অ্যাফেয়ার্স প্রধান সান্তিয়াগো মার্টিনেজ লাগে সোব্রেডো, কান্ট্রি হেড জাভিয়ের সি সান্তোঞ্জা ওলসিনা ও কমিউনিটি ইনভেস্টমেন্টের প্রধান কার্লোস পিনেইরো আনেইরোস।

সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে মূলত বাংলাদেশের পোশাক খাতের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে সহযোগিতার সুযোগ, ব্যবসা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা এবং বিশ্ববাজারে শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়ানোর কৌশলগুলো আলোচনা হয়েছে। সিইও অস্কার গার্সিয়া ম্যাসেইরাস বাংলাদেশের সঙ্গে ইন্ডিটেক্সের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করে আগামীতে এ দেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সম্প্রসারণের বিষয়েও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

ইন্ডিটেক্সের সঙ্গে বৈঠকে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক, উর্মি গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আসিফ আশরাফ উপস্থিত ছিলেন। জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ইন্ডিটেক্সের স্টোর চালু করা নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশে স্টোর চালুর বিষয়টি তাদের বিবেচনায় আছে। তবে ট্যারিফ অনেক হাই। ট্যারিফ র‍্যাশনালাইজ হতে হবে।’

পোশাক খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের রফতানিমুখী কারখানাগুলো পোশাকের কাঁচামাল আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। তবে শুল্ক সুবিধার আওতায় আমদানি করা কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক স্থানীয় বাজারে বিক্রির সুযোগ সীমিত। আর দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করা আছে। এটাই ইন্ডিটেক্স বা বিশ্বের অন্যান্য পোশাক ক্রেতার স্টোর বাংলাদেশের চালু না হওয়ার মূল কারণ।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার বাইরে অভ্যন্তরীণ বাজারে পোশাক সরবরাহের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে প্রস্তুতকারক কারখানার ক্ষেত্রে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ আছে। কটন বা সিনথেটিক কাপড় আমদানিতে ন্যূনতম ২৫ শতাংশসহ সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম আয়করসহ নানা শুল্কের হার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। ফলে এসব কাঁচামাল থেকে প্রস্তুতকৃত পোশাকের মূল্য অনেক বেশি হয়ে যায়, যা বাংলাদেশে ইন্ডিটেক্স বা বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর বাজার বিকাশে অন্যতম বাধা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পোশাক শিল্পোদ্যোক্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে স্টোর কেন চালু হয় না এটা তাদের (ইন্ডিটেক্স) কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছে, কাঁচামালের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপের কারণে স্টোর চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছেন না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্টোর চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করে ইন্ডিটেক্স। কিন্তু শুল্ক বাধার কারণে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটি সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে না। ১৮ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশে বাজার হিসেবে কম বড় না। উজবেকিস্তানের মতো দেশে ইন্ডিটেক্সের স্টোর রয়েছে, যেখানে জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটির কিছু বেশি।’

ইন্ডিটেক্সের ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো। ইন্ডিটেক্সের আওতায় জারাসহ রয়েছে মোট সাতটি ব্র্যান্ড। বাকিগুলো হলো জারা অ্যান্ড জারা হোম, পুলঅ্যান্ডবিয়ার, মাসিমো দুত্তি, বেরস্‌কা, স্ত্রাদিভারিয়স ও ওয়শো। এসব ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হয় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আট হাজারেরও বেশি কারখানায়। এর মধ্যে বাংলাদেশের কারখানাও রয়েছে।

বৈশ্বিক এ জায়ান্টের ২০২৪ সালে বিক্রি বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। সেই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইন্ডিটেক্সের বিক্রয় কেন্দ্রগুলোয় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে নতুন পরিসর। আর নতুন করে গত বছর বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয়েছে মোট ৪৭টি বাজারে। এর মধ্যে উজবেকিস্তানও রয়েছে। সব মিলিয়ে ২০২৪ সাল শেষে ইন্ডিটেক্সের মোট বিক্রয় কেন্দ্রের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫৬৩টিতে। ইন্ডিটেক্সের রয়েছে অনলাইন বিক্রয় কেন্দ্রও। অফলাইন ও অনলাইন মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট বাজার ২১৫টি।

বৈশ্বিক এ জায়ান্টের বাংলাদেশ কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে ন্যূনতম ৩০০ পোশাক কারখানা রয়েছে, যেগুলো ইন্ডিটেক্সের বৈশ্বিক বিক্রয় কেন্দ্রগুলোর জন্য পোশাক সরবরাহ করে। দুই বছর আগেও বাংলাদেশ থেকে ইন্ডিটেক্স ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক কিনেছে। বাংলাদেশ কার্যালয়ে কর্মী রয়েছেন শতাধিক। পোশাক সরবরাহ সক্ষমতা ও বাজার বিবেচনায় ইন্ডিটেক্সের বাংলাদেশে স্টোর চালুর আগ্রহ অনেক আগে থেকেই।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত চার দিনব্যাপী বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন শেষ হয়েছে গতকাল। ৯ এপ্রিল এ আয়োজনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তব্য দেন ইন্ডিটেক্সের সিইও অস্কার গার্সিয়া ম্যাসেইরাস। তার বক্তব্যেও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির স্টোর চালুর বিষয়টি উঠে এসেছে। বিনিয়োগ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে ইন্ডিটেক্সের সিইও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের ৯৭টি দেশে ফিজিক্যাল উপস্থিতি রয়েছে। আমরা ৯৮তম দেশে স্টোর চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছি। যদি শর্ত পূরণ হয় তাহলে নতুন বাজার হিসেবে বাংলাদেশ কেন আমাদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে না?’

ইন্ডিটেক্সের গত ৫০ বছরের ব্যবসায়িক সাফল্যের মূল সূত্র হলো উদ্ভাবন ও নমনীয়তা। এ দুই বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য উল্লেখ করে অস্কার গার্সিয়া বলেন, ‘এ দেশে আমাদের অনেক শক্তিশালী অংশীদার রয়েছে, যারা আমাদের গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত পণ্য উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিশ্চিত থাকুন, ইন্ডিটেক্স বাংলাদেশে থাকবে। আমরা আমাদের অংশীজনদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করব।’

আরও