চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় গত কয়েক দশকে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নানা ধরনের র্যাংকিং করে। তাদের র্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের সেরা ১০০টির মধ্যে চীনের পাঁচটি, মালয়েশিয়ার একটি ও সিঙ্গাপুরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ভারতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ১০০-তে জায়গা না পেলেও দেড়শর মধ্যে স্থান পেয়েছে তিনটি।
বিশ্ব র্যাংকিংয়ে সামনের সারিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণার দক্ষতা এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে তারা। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা পিএইচডি ডিগ্রি। কিউএস র্যাংকিংয়ে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের স্থান অষ্টম, চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটি ১৪তম, সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় ১৭তম, মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া ৫৮তম, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি দিল্লি ১২৩তম, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মুম্বাই ১২৯তম। এ ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে পিএইচডি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতো কিছু বিষয়ের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে পিএইচডির পরিবর্তে স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ট্রেনিংয়ের শর্ত দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এন্ট্রি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণার দক্ষতা কিংবা পিএইচডি ডিগ্রিকে এখনো ততটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। সম্প্রতি শিক্ষক নিয়োগে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)। নীতিমালাটি এখনো অনুমোদন না হলেও খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। এ নীতিমালা অনুযায়ী প্রভাষক নিয়োগে ১০০ নম্বরের বাছাই পদ্ধতিতে এসএসসি, এইচএসসি, অনার্স ও মাস্টার্সের রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে যথাক্রমে ৫, ১০, ৪৫ ও ২০ নম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে পিএইচডির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে কেবল ৫ নম্বর, যা উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফলের জন্য নির্ধারিত নম্বরের তুলনায়ও কম।
শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, একই চিত্র প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই। কোন স্তরের ফলাফলের জন্য কত নম্বর নির্ধারণ করা না থাকলেও এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু নিয়োগেই পিএইচডিধারী প্রার্থীদের উপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে জাবি উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের আগে কোনো নীতিমালা ছিল না। দীর্ঘদিন পর আমরা নীতিমালা কমিটির মাধ্যমে একটা খসড়া নীতিমালা করে তারপর তা শিক্ষা পর্ষদে আলোচনা করেছি। সিন্ডিকেটে এটির আরো সংশোধন হয়েছে। এতে সবার অভ্যস্ততার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা জোর করে কিছু করতে চাই না। আর এ নীতিমালা এখনো পরীক্ষামূলক। এখানে পিএইচডিতে আপাতত নম্বর নিয়ে যে আলাপ চলছে ভবিষ্যতে এসব নিয়ে আবারো আলোচনার সুযোগ রয়েছে।’
দেশের প্রথম উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে ১৯২১ সালে। এরপর গত এক শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোট ১৭১টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি আর বেসরকারি ১১৫টি। তবে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেলেও প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার গুণগত মানে যে এগোতে পারেনি তা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়েই ফুটে উঠেছে। চলতি বছর প্রকাশিত কিউএস র্যাংকিং অনুযায়ী বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্থান পায়নি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারার অন্যতম কারণ দুর্বল নিয়োগ ব্যবস্থা। তাদের মতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশ শিক্ষক নিয়োগে গবেষণা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দিলেও বাংলাদেশে তা করা হয় না। এছাড়া নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের জন্য যোগ্য প্রার্থীরা উপেক্ষিত হন। আর সার্বিকভাবে এসবের প্রভাব পড়ে শ্রেণীকক্ষে, শিক্ষকরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং বর্তমান সময়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের গড়ে তুলতে ব্যর্থ হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কতটা দক্ষ হবে সেটি নির্ভর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা কতটা দক্ষ তার ওপর। আমাদের শিক্ষা খাতে বাজেট ঘাটতিসহ নানা সংকট রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ।’
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী গত দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৮ হাজার ৮০০ জন। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কর্মরত শিক্ষকদের ৫৪ শতাংশই নিয়োগ পেয়েছেন গত ১৫ বছরে। তাদের বড় অংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় স্বজনপ্রীতি, দলীয় বিবেচনা, শর্ত শিথিল, আর্থিক লেনদেনসহ অবৈধ উপায়ে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০১৬ সালের এক প্রকাশনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, বিজ্ঞপ্তির বাইরে মাত্রাতিরিক্ত নিয়োগ, পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করাসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদে নিয়োগে ৩ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে ওই প্রকাশনায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তুহিন ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের এমন অনেক শিক্ষক ছিলেন যারা ভালোভাবে পড়াতে পারতেন না, প্রশ্ন করলে রেগে যেতেন এবং এর জেরে অনেক সময় পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দিতেন। এছাড়া অনেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকায় নিয়মিত ক্লাসও নিতেন না। মূলত তারা নিয়োগও রাজনৈতিকভাবে পেয়েছিলেন। অনেকের ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা একধরনের ঘাটতি নিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করেছি। শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে এমন অনেক কিছু আমাদের নতুনভাবে পড়তে হয়েছে, যা একাডেমিক জীবনেই শিখে আসার কথা ছিল।’
এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘যদি শিক্ষক নিয়োগের শর্ত কঠোর হতো এবং গবেষণায় গুরুত্ব দেয়া হতো তাহলে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হতো না। শিক্ষকরাও তখন শিক্ষকতা বাদ দিয়ে এত বেশি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তেন না।’
চীনের সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৫ সালে স্নাতক পর্যায়ের কার্যক্রম চালু হয়। সমসাময়িক হলেও কিউএস র্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ৫৬৭ ধাপ এগিয়ে। ২০২৫ সালের কিউএস র্যাংকিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের অবস্থান ৫৮৪তম। সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে কেউ তরুণ শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে চাইলে তার পিএইচডি ডিগ্রির পাশাপাশি অন্তত দুই বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগে বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী প্রার্থীদের শুধু অন্যান্য যোগ্যতা সমান থাকলে প্রার্থীদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি এবং স্বীকৃত মানের জার্নালে গবেষণা প্রকাশনা থাকলে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির উর্দু বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ভালো ফল এবং পিএইচডি থাকা সত্ত্বেও এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল না থাকায় এক প্রার্থীকে বাদ দেয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘পিএইচডি ডিগ্রি থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর মান এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও প্রকাশনাকেই আমরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, জার্নাল পাবলিকেশন এবং শিক্ষকের একাডেমিক অবদানকে কীভাবে শিক্ষক নিয়োগে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, সেই বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। এ প্রক্রিয়াটি এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটিকে আরো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয়া হবে। আমরা অনেক সময় মেধাবী তরুণদের মাস্টার্স শেষ করার পরপরই শিক্ষকতায় আসার সুযোগ দিই, যাতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গবেষণার পথে অগ্রসর হতে পারেন। এরপর তাদের পিএইচডি করতে উৎসাহিত করা হয়। এটা আমাদের জন্য একধরনের গ্রুমিং প্রসেস।’
দীর্ঘমেয়াদে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষক তৈরি এবং পিএইচডিধারী শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে। ভবিষ্যতে শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডিকে আরো গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দিকেই আমাদের যাত্রা। তবে সেটি করতে হলে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, সুযোগ-সুবিধা এবং গবেষণার কাঠামোকেও সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে।’
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যে পরিমাণ শিক্ষক প্রয়োজন সে পরিমাণ পিএইচডি ডিগ্রিধারী নেই বলে জানান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এসএমএ ফয়েজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নিয়োগে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের গুরুত্ব দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সরাসরি সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ পান। বিগত সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল, আমরা সবাই চাই এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে যেন স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। সবার পক্ষ থেকেই এ প্রচেষ্টা আছে।’
শিক্ষক নিয়োগে নম্বর বণ্টনে পিএইচডির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষাগত যোগ্যতার মার্কিং করা হলে পিএইচডি নম্বর অবশ্যই ৫-এর অধিক হওয়া উচিত। তবে নম্বর যা-ই হোক পিএইচডিধারী প্রার্থী তো এমনিতেই এগিয়ে থাকবেন অন্যদের তুলনায়। আমরা শিক্ষকদের গবেষণায় উৎসাহিত করার জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছি, গবেষণায় ফান্ডিং করছি, আশা করছি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভালো অবস্থানে পৌঁছবে।’