বিবিএস ১৮৫১ টাকা, ডব্লিউএফপি ২৭৯৯ টাকা

মাসে মাথাপিছু ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণ ব্যয়ে বিবিএসের সঙ্গে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ফারাক ৩৪%

একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে খাদ্য গ্রহণ করতে হয় কমপক্ষে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ক্যালরির এ খাদ্য গ্রহণে গড় মাথাপিছু ব্যয় মাসে ১ হাজার ৮৫১ টাকা। এটিকেই ফুড পোভার্টি লাইন বা খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে বিবিএস। আর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাবে, গত ডিসেম্বরজুড়ে এ ন্যূনতম ক্যালরিসমৃদ্ধ খাদ্য

একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে খাদ্য গ্রহণ করতে হয় কমপক্ষে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ক্যালরির এ খাদ্য গ্রহণে গড় মাথাপিছু ব্যয় মাসে ১ হাজার ৮৫১ টাকা। এটিকেই ফুড পোভার্টি লাইন বা খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে বিবিএস। আর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) হিসাবে, গত ডিসেম্বরজুড়ে এ ন্যূনতম ক্যালরিসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করতে দেশের মানুষকে মাথাপিছু ব্যয় করতে হয়েছে ২ হাজার ৭৯৯ টাকা। সে হিসেবে বিবিএসের মাথাপিছু ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণের খরচ ডব্লিউএফপির তুলনায় ৩৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ বা ৯৪৮ টাকা কম।

দুই সংস্থার তথ্যে এ বড় ব্যবধানের কারণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিবিএস যেটিকে খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে দেখাচ্ছে, সে মূল্যে একজন মানুষের পক্ষে খাবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। যে সময় পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে এ হিসাব দেখানো হচ্ছে, সে সময় যুদ্ধের অভিঘাতে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে গেছে বৈশ্বিক পণ্যবাজার। আবার এ-সংক্রান্ত জরিপ শেষ হওয়ার পর দেশে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বেড়েছে। এর সঙ্গে পরিসংখ্যান পরিচালনায় পদ্ধতিগত দুর্বলতার অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে এসব কারণেই দুই সংস্থার মধ্যে তথ্যগত ফারাক দেখা দিতে পারে। 

বিবিএসের হিসাবে একজন মানুষের দৈনিক ন্যূনতম ২ হাজার ১২২ ক্যালরি গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের সেট বা ফুড বাস্কেট গঠন হয় মৌলিক ১১টি খাদ্যের পরিমিত হিসাব বিবেচনায় নিয়ে। এ ১১ খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে মোটা চাল, গম, ডাল, দুধ, ভোজ্যতেল, মাছ, মাংস, আলু, অন্যান্য সবজি, চিনি ও ফল। খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম ক্যালরি অনুপাতে দৈনিক নির্ধারিত পরিমাণে এসব খাবার খেতে হলে একজন মানুষকে কমপক্ষে ১ হাজার ৮৫১ টাকা খরচ করতে হবে। এর কম ব্যয়ে একজন মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় পুষ্টির সংস্থান করা অসম্ভব। সেদিক থেকে এ ব্যয়কে বিবেচনা করা হয় খাদ্য দারিদ্র্যসীমা হিসেবে।

সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দাবি, দুই সংস্থার ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণের খরচ নির্ধারণে পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে একটির সঙ্গে আরেকটির তুলনা করার সুযোগ নেই। বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ প্রকল্পের পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ফুড পোভার্টি লাইন হচ্ছে একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম খাবার ক্রয়ের ব্যয়। অর্থাৎ এক মাসে কমপক্ষে ১ হাজার ৮৫১ টাকা মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণে প্রয়োজন। এটিকে শুধু ফুড বাস্কেটের মূল্য দিয়ে হিসাব করা হয় না। এর সঙ্গে অনেকগুলো পদ্ধতি জড়িত। এক বছরের জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে অনেকগুলো নিয়ম ও পদ্ধতি মেনে এ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ন্যূনতম খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে ডব্লিউএফপির সংজ্ঞা এক রকম। আমাদের সংজ্ঞা আরেক রকম। সুতরাং ডব্লিউএফপি যে ফুড বাস্কেটের মূল্য তার সঙ্গে বিবিএসের খাদ্য দারিদ্র্যসীমাকে তুলনা করার সুযোগ নেই। সাধারণ জরিপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল হচ্ছে দারিদ্র্যসীমার জরিপ।’

খাদ্য দারিদ্র্যসীমা স্থান-কালভেদে আলাদা হতে পারে বলে বিবিএসের তথ্যে উঠে এসেছে। এক্ষেত্রে দেশের আট বিভাগে গ্রাম ও শহরভেদে খাদ্য দারিদ্র্যসীমাও ভিন্ন ভিন্ন। খাদ্য দারিদ্র্যসীমা সবচেয়ে কম বা প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবারে মাথাপিছু সবচেয়ে কম ব্যয় করতে হয় রাজশাহীর শহরাঞ্চলে, ১ হাজার ৭১০ টাকা। আর সবচেয়ে বেশি সিলেটের শহরাঞ্চলে ১ হাজার ৯৬০ টাকা।

আর ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে মাথাপিছু ন্যূনতম চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় খাদ্যের সেট বা ফুড বাস্কেটের ব্যয় ডিসেম্বরে ছিল ২ হাজার ৭৯৯ টাকা। এ ফুড বাস্কেটে রয়েছে ৭ কেজি ৮০০ গ্রাম মোটা চাল, ৯০০ গ্রাম গম, দেড় কেজি আলু, ৯০০ গ্রাম ডাল ও শিম, সাড়ে চার কেজি শাক, সাড়ে চার কেজি সবজি, তিন কেজি ফল, মাছ-মাংস-পোলট্রি তিন কেজি, ডিম ১ কেজি ৮০০ গ্রাম, দুধ সাড়ে চার কেজি, চিনি ৭৫০ গ্রাম, ভোজ্যতেল ৯০০ গ্রাম ও মসলা ৬০০ গ্রাম। এসব খাবার কিনতে ডিসেম্বরে দেশে মাথাপিছু ব্যয় ছিল ২ হাজার ৭৯৯ টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান এবং উন্নয়ন অন্বেষণের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌যে হারে বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমছিল সে হারে ক্ষুধার হার কমছিল না। যেহেতু মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, সেহেতু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ কমেছে। সে কারণে পুষ্টিহীনতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিবিএসের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদনের ভিত্তিবছর এবং দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে ভিত্তিবছর এক নয়, যার ফলে দুটোর মধ্যে সামঞ্জস্য নেই। এতে বিবিএস মূল্যস্ফীতির যে হার দেখাচ্ছে, তাতে বাজারের প্রতিফলন নেই। অর্থাৎ পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণেই বিবিএসের পরিসংখ্যানে বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিফলন উঠে আসছে না।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা দেখতে পেয়েছি করোনা-পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য বেড়েই চলছে। এজন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ত্রুটিমুক্ত করতে হবে। সব স্থানে প্রকৃত মজুরির হার কমে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি কমানোর কার্যকর পদক্ষেপগুলো কাজে আসছে না। পূর্ণ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা জালের দিকে আমরা যাইনি। সেদিকে যেতে হবে।’ 

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, দুই সংস্থার তথ্যে ব্যবধানের একটি কারণ হতে পারে সময়সীমার ব্যবধান। বিবিএস থেকে খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এর তথ্য নেয়া হয় ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। আর ডব্লিউএফপি থেকে প্রকাশিত ফুড বাস্কেটের মূল্য গত ডিসেম্বরের। সে হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণে দুটি প্রতিষ্ঠানের খাদ্য গ্রহণে ন্যূনতম খরচে পার্থক্য হতে পারে। তবে বিবিএসের তথ্যে খাদ্য দারিদ্র্যসীমার যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তাতে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজার বা রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের অভিঘাতে বিপর্যস্ত ২০২২ সালের বাজারের প্রতিফলনও দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রথম বিষয় হলো ন্যূনতম ক্যালরি কিন্তু সবার ২ হাজার ১২২ ক্যালরি প্রয়োজন হয় না। বয়স, লিঙ্গ ও বিভিন্ন কারণে এ মাত্রা আরো কম হতে পারে। আবার দুটো প্রতিষ্ঠানের জরিপের ক্ষেত্রে বা মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকতে পারে। তবে বিবিএস ২০২২-এর তথ্যের ভিত্তিতে খাদ্য দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণ করেছে। আর ডব্লিউএফপি ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের তথ্য নিয়েছে। সে হিসেবে এক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম তো বেড়েছে। এটিও পার্থক্যের একটি বড় কারণ হতে পারে। তবে একজন মানুষের মাসে ন্যূনতম ক্যালরি গ্রহণে ১ হাজার ৮৫১ টাকা প্রয়োজন, বাজারে এ তথ্যের প্রতিফলন এখনো নেই, তখনো ছিল না। কারণ বাজার করতে গেলে বোঝা যায়, আসলে এ টাকায় একজন মানুষের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব না।’

সম্প্রতি ডব্লিউএফপি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ মার্কেট মনিটর ডিসেম্বর ২০২৩’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ফুড বাস্কেটের দাম বেড়েছে ৩৬৪ টাকা বা ১৫ শতাংশ। ২০২২ সালে ফুড বাস্কেটের পেছনে মাথাপিছু ব্যয় ছিল ২ হাজার ৪৩৫ টাকা। মূলত বৈশ্বিক সংকট, খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এ এক বছরে খাদ্যের দাম ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। এর ফলে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে এবং দরিদ্ররাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।

গত এক বছরে খাদ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ ও রসুনের। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল গড়ে ১১৭ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে পণ্যটির দাম ২২৮ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া আলুর দাম ছিল প্রতি কেজি ৫৪ টাকা। প্রতি কেজি কাঁচামরিচ ও রসুনের দাম ছিল যথাক্রমে ৭৬ ও ২০৬ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আলু, কাঁচামরিচ ও রসুনের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ১৩৯ শতাংশ, ৭৭ ও ৭১ শতাংশ। এছাড়া গত ডিসেম্বরে গড়ে প্রতি কেজি মোটা চাল ৪৭ টাকা, গম ৫৫, প্রতি লিটার পাম অয়েল ১৪১ ও সয়াবিন তেল ১৫৮, প্রতি কেজি মসুর ডাল ১১৪, ব্রয়লার মুরগি ১৭০, চিনি ১৪০ ও প্রতি পিস ডিম সাড়ে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সে অনুযায়ী গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মোটা চাল, সয়াবিন তেল ও গম ছাড়া সব পণ্যেরই দাম বেড়েছে। এর মধ্যে পাম অয়েলের দাম ১৩ শতাংশ, মসুর ডালের দাম ১২ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগির ১৮ শতাংশ, ডিমের ১১ শতাংশ ও চিনির দাম ২৭ শতাংশ বেড়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক খাদ্য সচিব আব্দুল লতিফ মন্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর জরিপের তথ্যের মধ্যে সবসময় একটি পার্থক্য দেখা যায়। দারিদ্র্যসীমা বা সূচক ক্যালরির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। খানা আয়-ব্যয় জরিপে বিবিএসের দারিদ্র্যসীমা তুলে ধরা হয়। দেশে খাদ্যপণ্যের দাম তো অনেক বেড়েছে। সে হিসেবে এ ন্যূনতম খাদ্য গ্রহণের মূল্যে একজন মানুষের ন্যূনতম ভোগ চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একটি অংশ আমদানি করতে হয়। আমদানি করা সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও এর সুফল নেই। আবার বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণেও দাম বাড়ছে। এখন দেখতে হবে যে হারে দাম বেড়েছে, সে হারে মানুষের আয় বেড়েছে কিনা। যদি না বেড়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে।’

আরও