ঢাকার মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার চালু হয় ২০১৭ সালে। নির্মাণের মাত্র আট বছরের মাথায় জায়গায় জায়গায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে ফ্লাইওভারটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা। পানি নিষ্কাশনের পাইপ কোথাও ময়লা-আবর্জনা জমে বন্ধ হয়েছে, কোথাও ফেটেছে, আবার কোথাও চুরি গেছে। তাই সামান্য বৃষ্টিতে ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে পানি জমছে। জমে থাকা পানির সহায়তায় বেড়ে উঠছে বট-অশ্বত্থসহ বিভিন্ন গাছ।
মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের অন্তত ১২টি জায়গায় বটগাছ থাকার কথা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, ‘ফ্লাইওভারটি যে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এসব বটগাছ।’ এ গাছগুলো ফ্লাইওভারের কাঠামোর স্থায়ী ক্ষতি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যে এসব বটগাছ কংক্রিটে ফাটল তৈরি করবে। সেই ফাটল দিয়ে পানি ভেতরে ঢুকে রড পর্যন্ত চলে যাবে। রডে পানি লাগলে মরিচা ধরে কাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি হবে।’
শুধু মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নয়, ড্রেনেজ সমস্যা রয়েছে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একাধিক ফ্লাইওভারে। খিলগাঁও এবং গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের বিভিন্ন জয়েন্ট সরে গিয়ে অস্বাভাবিক ফাঁকা হয়ে আছে। অনেক ফ্লাইওভারে রেলিং, সড়ক বিভাজক ভেঙে পড়েছে। কোথাও পিচ কিংবা কংক্রিটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকছে দিনের পর দিন। নাটবল্টুসহ বিভিন্ন কাঠামো চুরি হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি লাইট নষ্ট থাকার কারণে রাতে ফ্লাইওভারগুলোতে ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক ঘটনাও ঘটছে। গত রোববার ফার্মগেটে মেট্রোরেলের একটি পিলার থেকে বিয়ারিং প্যাড মাথায় পড়ে এক পথচারী নিহতের পর মেট্রোরেলের উড়ালপথসহ দেশের ফ্লাইওভারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বড় অভিযোগ না উঠলে, দুর্ঘটনা না ঘটলে কিংবা গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত না হলে কোথাও ফ্লাইওভার রক্ষণাবেক্ষণ করতে দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, ‘ফ্লাইওভার নির্মাণের পর নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। যেমন বর্ষার আগে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করে দিতে হয়। এছাড়া ফ্লাইওভারের জয়েন্টগুলোকে ঠিক রাখা, বিয়ারিং প্যাডগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা, লাইট ঠিকমতো জ্বলছে কিনা—এমন নানা বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ সংস্কৃতি একেবারেই নেই। আমাদের এখানে সংস্কৃতি হলো ফ্লাইওভারের কোনো অসংগতি সম্পর্কে আগে অভিযোগ উঠতে হবে। গণমাধ্যমে খবর হতে হবে। তারপর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।’
ঢাকা মহানগর এলাকায় ফ্লাইওভার বা সমজাতীয় অবকাঠামো রয়েছে আটটি। এগুলো হলো মহাখালী ওভারপাস, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, বিজয় সরণি-তেজগাঁও লিংক রোড ওভারপাস, বনানী ওভারপাস, কালশী ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার ও মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। রামপুরা ও বাড্ডায় রয়েছে দুটি ইউলুপ। ফ্লাইওভার ছাড়াও ঢাকায় রয়েছে একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। আরেকটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলমান। মহানগর এলাকার বাইরে টঙ্গীতে একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর পর্যন্ত সাতটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে একটি এক্সপ্রেসওয়েসহ ফ্লাইওভার রয়েছে সব মিলিয়ে ছয়টি। বিগত সরকারের আমলে রাজশাহীতেও তৈরি করা হয় একটি ফ্লাইওভার। শহরাঞ্চল ছাড়াও ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কেও নির্মিত হয়েছে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার।
ফার্মগেটে বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেট্রোরেল ও দেশের সব ফ্লাইওভারের বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান নির্ণয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। গতকাল দায়ের করা এ রিটে মেট্রোরেল ও সব ফ্লাইওভারে ব্যবহার করা বিয়ারিং প্যাডের গুণগত মান ঠিক আছে কিনা, তা যাচাই করতে একটি কমিটিও গঠন করতে বলা হয়েছে।
যেকোনো ফ্লাইওভারে ‘পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স’ আবশ্যিকভাবে করতে হয় বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ফ্লাইওভারের পিরিয়ডিক মেইনটেন্যান্স হলো একটি গ্লোবাল প্র্যাকটিস। তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে ফ্লাইওভারের জয়েন্টগুলো সম্প্রসারিত বা সংকুচিত হতে পারে। এ কারণে অবকাঠামোগত ত্রুটি তৈরি হতে পারে। ফাটল দেখা দিতে পারে। আরো নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে, যেগুলো নির্দিষ্ট সময় পর পর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ কাজ করা হয় না। যখন কোথাও সমস্যা দেখা দেয়, তখন সবাই নড়েচড়ে ওঠেন। ততদিনে সমস্যা জটিল আকারে চলে যায়।’
এদিকে বিয়ারিং প্যাড দুর্ঘটনার পর মেট্রোরেল, ফ্লাইওভারসহ এ-জাতীয় সব অবকাঠামো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে এ বিষয়ে চিঠি দিয়ে নির্দেশনা দেব। সংস্থাগুলো নির্দেশনা পালন করছে কিনা তা পর্যবেক্ষণে একটি কমিটিও গঠন করে দেব।’