দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য চাল ও গম। বর্তমানে এ দুই খাদ্যশস্যের সরকারি মজুদ রয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টন। এ মজুদ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার পাশাপাশি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে বড় সহায়তা দেয়। কিন্তু বৈশ্বিক সংকট কিংবা আকস্মিক ধাক্কা সামাল দিতে দেশের জ্বালানি খাতে জরুরি মজুদ এবং দরকারি অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। বিশেষত আমদানিনির্ভর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ক্ষেত্রে এ ধরনের মজুদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় ‘বাফার’ সুবিধা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ঝুঁকি বহন করতে হচ্ছে দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি পণ্য যেকোনো দেশের কৌশলগত মজুদ। অনেক জ্বালানি পণ্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের ওপর নির্ভরশীল। ফলে দেশে মজুদ অবকাঠামো অত্যন্ত জরুরি। অতীতের বিভিন্ন সরকার এলএনজি ও এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলার কথা বললেও আদতে তা করতে পারেনি। যে কারণে বিশ্ববাজারের চলমান সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে। এলএনজি ও এলপিজির ক্ষেত্রে দেড়-দুই মাসের মজুদ থাকলে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ ছিল।
দেশে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংকট এখন এলপিজিতে। সরকারি আমদানি তথ্যে চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা হলেও বাজারে পণ্যটি তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকটের জন্য অপারেটর থেকে রিটেইলার বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানালেও এমন সংকটের পেছনে সরকারি মজুদ ব্যবস্থা না থাকাকেই বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা।
দেশে এক লাখ টন এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) দীর্ঘদিন ধরে এ অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা বললেও আদতে তা করা যায়নি। এমনকি সংস্থাটি এ ধরনের মজুদ সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় জমি বরাদ্দ পেলেও বাস্তবে কোনো কাজ শুরু হয়নি।
দেশে এলপিজি মজুদ সক্ষমতা নির্মাণে কাজ করছে বিপিসির সাবসিডিয়ারি এলপি গ্যাস পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটি এরইমধ্যে মংলায় বাৎসরিক এক লাখ টন ধারণ সক্ষমতার মজুদ সক্ষমতা গড়ে তুলতে কাজ করছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে এলপি গ্যাস পিএলসি ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তুলতে বাগেরহাটের মংলায় বাৎসরিক এক লাখ টন সক্ষমতা মজুদ অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এ প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পে সেখানে সাড়ে ৮ হাজার টন স্টোরেজ ক্যাপাসিটি থাকবে। এখানে সরকারের কাছ থেকে কোনো অর্থ না নিয়ে বিপিসি ও বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কাছ থেকে কীভাবে অর্থায়ন পাওয়া যায় সেই বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। এর পাশাপাশি মহেশখালীর মাতারবাড়িতে একটি চ্যানেল ও আমদানিভিত্তিক অবকাঠামো নিয়েও কাজ চলছে। এসব বিষয় দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।’
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি করতে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বিপিসি বৃহৎ এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পটি ২০২৪ সালে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা। যদিও এখনও এই প্রকল্পের মাঠ পযায়ের কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে বিপিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে। নির্মাণ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, মাতারবাড়িতে এলপিজির এটি হবে রেফ্রিজারেটেড মাদার টার্মিনাল। এ টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন এলপিজি কোম্পানির নিকট বাল্ক আকারে এলপি গ্যাস বিক্রয় হবে। প্রস্তাবিত এলপিজি টার্মিনালের অপারেশন ক্ষমতা হবে বার্ষিক প্রায় ১০-১২ লাখ টন।সরকারি উদ্যোগে এলপিজি আমদানি এবং এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের লক্ষ্যে প্রি ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি জন্য বিপিসি ও পেট্রোবাংলা, মালয়েশিয়ার সাথে সমঝোতা সইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
দেশে এলপি আমদানিতে বেসরকারি অপারেটরদের বাইরে বিপিসি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পণ্যটি আমদানি করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিপিসি নিজস্ব সক্ষমতায় এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি অপারেটরদের সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। চলতি মাসে বেসরকারি অপারেটররা বিপিসির কাছ থেকে এলপিজি কিনে বাজারে সরবরাহ করবে এমন প্রত্যাশাও করেছিল। কিন্ত দফায় দফায় চেষ্টা করেও বিপিসি এলপিজি আমদানি করতে পারেনি।
দেশে এ ধরনের সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে সংকট পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় মজুদ থেকে বেসরকারি অপারেটরদের সরবরাহ করা গেলে বাজারে এলপিজির সংকট স্বাভাবিক নিয়মে কেটে যেত। বেসরকারি আমদানিকারক ও সরবরাহকারীদের পক্ষে বাজারের ৯৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকত না।
দেশে গতকাল এলপি গ্যাসের দাম ১২ কেজির দাম ২৫২ টাকা বেড়েছে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন জানিয়েছে, বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম ও জাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় এ দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বন্ধ হরমুজ প্রণালি কবে খুলবে কিংবা বাব আল মানদেব প্রণালিতে অচালাবস্থা কতদিন চলবে, কিংবা আদৌ এ সংকট দূর না হলে দাম বাড়িয়ে কতদিন বাজার স্বাভাবিক রাখা যাবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশ্ববাজার থেকে জ্বালানি আমদানিতে এমন পরিস্থিতি শুধু যে এলপিজিতে তা নয়, একই পরিস্থিতি চলছে এলএনজির ক্ষেত্রেও। দেশে এলএনজি মজুদ সক্ষমতা না থাকায় সরাসরি স্পট মার্কেট এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। কোনো কারণে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম বাড়লে বা কখনো চুক্তির কার্গো সরবরাহ না এলে দেশের গ্যাস খাতে বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়; যার প্রভাব পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎসহ সব খাতে।
স্থানীয় গ্যাস সংকটে দেশে আবাসিক গ্যাসের বড় অংশ এখন রূপান্তরিত জ্বালানিতে ঝুঁকছে। আবাসিক, সিএনজি, অটোগ্যাস ও শিল্পের বড় অংশ এলপিজিতে যাচ্ছে। বর্তমানে দেশে মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি এলপিজির ব্যবহার আছে। প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটে অনেক শিল্পই এখন এলপিজিতে রূপান্তর হয়েছে। এতে শিল্প খাতে এলপিজির চাহিদা ৫০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। দেশে এলপিজির ব্যবহার ভবিষ্যতে আরো বাড়বে। ফলে শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার জন্য শুধু এলপিজি আমদানি নয়, মজুদ অবকাঠামোও গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে মজুদ সক্ষমতা না থাকায় বিশ্ববাজার থেকে কার্গো আমদানিতে সংকট তৈরি হলে এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ রাখতে হয়। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দিতে হয় টার্মিনাল না চালিয়েও। আবার অনেক ক্ষেত্রে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জাহাজ ভিড়তে না পারায় বছরে তিন-চারবার এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয় পেট্রোবাংলাকে। ল্যান্ডবেজ এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ হলে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো যেত। অনেকে ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীল দামে অন্তত এক-দুই মাস দাম না বাড়িয়ে ব্যয় সামাল দেয়া সম্ভব হতো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানি যেকোনো পণ্যের “বাফার স্টক” থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ মজুদ বাজার ব্যবস্থাপনা ও পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাতে বড় ভূমিকা রাখে। দেশে মজুদ অবকাঠামোর কথা বলতে গেলে এলপিজি ও এলএনজি টার্মিনাল স্টোরেজ সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো কৌশলগত পণ্য, যা বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করতে হয়।’
বর্তমানে দেশে এলপিজির যে সংকট তৈরি হয়েছে সেখানে স্থানীয় সরবরাহ চেইনে একটা মজুদপ্রবণতা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ম. তামিম আরো বলেন, ‘কারণ বিশ্ববাজারে সিপি প্রাইস এখন সবাই দেখতে পারে। ফলে দাম বাড়তে থাকলে বাজারে সরবরাহকারীদের মজুদের নিয়ন্ত্রণ থাকে। এক্ষেত্রে যদি সরকারের স্টোরেজ থাকত, সেখান থেকে বাজারে এলপিজির সরবরাহ বাড়িয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যেত। মজুদের বিষয়টি একইভাবে প্রযোজ্য এলএনজির ক্ষেত্রেও। অন্তত এক মাসের মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে যুদ্ধবিগ্রহ, উচ্চমূল্য কিংবা সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে তা বড় ভূমিকা রাখত।’
আমদানিনির্ভর উন্নত দেশগুলো আপৎকালীন জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় মজুদের কৌশল অবলম্বন করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সময়ে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকটে তারা পরিস্থতি সামাল দিতে পেরেছে।
আপৎকালীন জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় সুপরিকল্পিত জ্বালানিনিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে জাপান। মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশটি একটি শক্তিশালী ত্রিস্তরীয় মজুদ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় জাপানের এ মজুদ কৌশল অত্যন্ত সফলভাবে তাদের বাজার স্থিতিশীল রাখছে বলে নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এশিয়ার বৃহৎ আমদানিকারক দেশ চীন এলপিজি ও এলএনজিতে শুধু মজুদের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং দেশটি বিভিন্ন ধাপে জ্বালানিনিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে চীন সরকারি-বেসরকারি উৎপাদন সক্ষমতা ও মজুদ উৎস একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। ভূগর্ভস্থ মজুদকে তারা মৌসুমি রিজার্ভ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এলএনজি টার্মিনালে শুধু স্টোরেজ সিস্টেম নয়; উপকূলীয় টার্মিনাল, জরুরি সরবরাহ ও আঞ্চলিক এলএনজি ট্যাংক ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছে।
আপৎকালীন জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ। বিশ্বের বৃহত্তম জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুদ ব্যবস্থা রয়েছে তাদের। ১৯৭০-এর দশকের জ্বালানি সংকটের পর ১৯৭৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ও বিশ্ববাজারে অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটি নতুন মজুদ সংরক্ষণ কৌশল অবলম্বন করছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামের ধাক্কা সামাল দিতে আমেরিকা তার মজুদ থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে। এছাড়া সরবরাহ করা প্রতি এক ব্যারেল তেলের বিপরীতে তেল কোম্পানিগুলোকে এক বছর বা নির্দিষ্ট সময় পর ১ দশমিক ২৫ ব্যারেল তেল ফেরত দিতে হবে। ফলে করদাতাদের অর্থ খরচ না করেই রিজার্ভ আগের চেয়ে বাড়ানো হবে। এছাড়া দেশটি সরকারি মজুদ থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বেসরকারি কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তেল ধার হিসেবে দিচ্ছে।
অনেকে দেশে এলএনজির জন্য বেশকিছু জরুরি মজুদ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমত, এলএনজি টার্মিনালের স্টোরেজ, ভূগর্ভস্থ গ্যাস স্টোরেজ, ভাসমান টার্মিনালে সংরক্ষণ, আমদানির একাধিক সরবরাহকারী নির্ধারণ। আর এলপিজিতে বড় আকারে স্টোরেজ ও বাল্ক ট্যাংক সংরক্ষণ, বন্দরভিত্তিক স্টোরেজ ক্যাপাসিটি, আমদানিকারকদের বাধ্যতামূলক ন্যূনতম মজুদ, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারি মজুদ ছাড়, আমদানির ক্ষেত্রে একাধিক বন্দর ও নদীবন্দর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে।
সংকট মোকাবেলায় বিশ্ববাজার থেকে অনেক বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি। এসব কৌশলগত জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে গিয়ে অর্থ সংকট ও সরবরাহ শৃঙ্খলে আটকে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ সংরক্ষণাগার রয়েছে ৬০ দিনের। এ মজুদ বাড়িয়ে ৯০ দিন করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে বর্তমান সরকার। বিপিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরে জ্বালানি তেলের মজুদ সংরক্ষণাগার ৭১ দিনে উন্নীত হবে।
দেশের গ্যাস খাতে এলএনজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারির তুলনায় বর্তমানে তিন গুণ দামে পণ্যটি আমদানি করছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে বিপুল ভর্তুকিও দিতে হচ্ছে সরকারকে। বিদ্যমান দাম বজায় থাকলে এলএনজি আমদানিতে চলতি বছর ৯০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
শিল্প উদ্যোক্তা ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলপিজি-এলএনজির মজুদ অবকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হচ্ছে। বেসরকারি খাতও প্রস্তাব দিয়েছে। এলপিজি-এলএনজি ও হাইড্রোজেন নিয়ে তিনটি প্রস্তাব দিয়েছি আমরা (ইস্ট কোস্ট গ্রুপ)। তিন-চার বছর আগের এ প্রস্তাব ঠিক কী কারণে আটকে আছে তা অজানা। জ্বালানি খাতে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি থাকলে সংকটকালে বড় সুবিধা দেয়। গভীর সমুদ্রবন্দর এলাকায় জ্বালানি খাতের এসব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে দাম নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বড় জাহাজ আমদানি—অনেক কিছুই করার সুযোগ আছে। জ্বালানি একটা কৌশলগত পণ্য, এটা জাতীয় স্বার্থ, এগুলো নিয়ে সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা দরকার।’
দেশে এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলার গুরুত্ব নিয়ে বেসরকারি খাতের শীর্ষ কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সময় কথা বলেছে। তাদের ভাষ্য, এলপিজি স্টোরেজ সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং সাশ্রয়ী মূল্যে এলপিজি দেয়া গেলে অনেক অপারেটর আগ্রহী হবে।
ফ্রেশ এলপিজির চিফ মার্কেটিং অফিসার আবু সাঈদ রাজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বেসরকারি অপারেটররা দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহ করছে। এখানে সরকার অবকাঠামো সুবিধা তৈরি করতে পারলে বেসরকারি খাত সুবিধা নিতে পারবে। বিশেষত তা সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সহায়তা দেবে। অনেক দিন ধরে এলপিজির স্টোরেজ নিয়ে আলোচনা চলছে। এটা হওয়া জরুরি। তাতে দেশের জ্বালানিনিরাপত্তা আরো এগিয়ে যাবে।’
দেশে স্থানীয় গ্যাস সংকটে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি স্টোরেজ বা মজুদ সক্ষমতা তৈরির বিষয়টি তুলে ধরা হয় বিদ্যুৎ-জ্বালানির সমন্বিত মহাপরিকল্পনা (আইইপিএমপি)-২০২৩-এ। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের পর এলএনজি আমদানি টার্মিনালগুলোর বার্ষিক সক্ষমতা ৩০ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়।
এর আগে বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে করা পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি)-২০১৬-তে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির মজুদ ও উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি অবকাঠামোর কথা তুলে ধরা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এককভাবে গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল না থাকারও পরামর্শ দেয়া হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এসব মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণ, বহুমুখী উৎস ও মজুদ সক্ষমতার ওপর জোর দেয়া হয়। কিন্তু দেখা গেছে, অতীতে জ্বালানি মজুদে জোর না দিয়ে বরং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় এককভাবে আমদানি করে গ্রিডে সরবরাহ দিয়েই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি আমদানি ঝুঁকি, যুদ্ধবিগ্রহ, উচ্চমূল্য এমনকি স্থানীয় জ্বালানির ক্রমবর্ধমান হ্রাসকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
দেশে সরকারিভাবে এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তুলতে এরই মধ্যে জমি বরাদ্দ পেয়েছে সরকারি এলপি গ্যাস কোম্পানি। কোম্পানিটি তিনটি জায়গায় জমি বরাদ্দ পেয়েছে—চট্টগ্রামের কর্ণফুলী, বাগেরহাটের মোংলা ও মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে। যদিও এ প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। দেশের বাজারে এলপিজি দাম নির্ধারণ করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। দামের পাশাপাশি কমিশন এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারকে কোনো পরামর্শ দিতে পারে কিনা এমন প্রশ্নে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেল এলএনজির জন্য আপৎকালীন একটা মজুদ ব্যবস্থাপনা সরকার করতে পারে। যদিও এখানে ইনভেনটরি কস্ট বেড়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
দেশে এলপিজি ও এলএনজি স্টোরেজ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনায় রয়েছে বর্তমান সরকারের। জ্বালানিনিরাপত্তায় এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করে সরবরাহ স্থিতিশীল ও দাম স্বাভাবিক রাখারও বড় অগ্রাধিকার রয়েছে সরকারের।
বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য জানতে গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাৎক্ষণিকভাবে তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।