মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়নি ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির’

কোনো মুক্তিযোদ্ধাই পাননি খেতাব

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যে কয়টি বেসামরিক সংগঠন দেশে থেকে প্রশিক্ষণ, যুদ্ধ পরিচালনা ও পাকহানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তার মধ্যে অন্যতম সিরাজগঞ্জের ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির’। এ ক্যাম্পের অধীনে প্রায় ৭০০ গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ছোটবড় ৫১টি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে এপ্রিলের শুরুর দিকে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিতে সিরাজগঞ্জের বেশ কিছু যুবক ও ছাত্রনেতা ভারতে রওনা হন। সবাই যেতে পারলেও সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি সোহরাব আলী সরকার, প্রো-ভিপি লুৎফর রহমান মাখন, আব্দুল আজিজ সরকার, শফিকুল ইসলাম শফি ও মনিরুল কবির ঈশ্বরদীর মুলাডুলি রেল স্টেশনের কাছে পাকবাহিনীর বাধার মুখে পড়েন।

সেখান থেকে ফিরে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকা কামারখন্দের জাঙ্গালিয়াগাতি গ্রামের অছিম উদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয় নেন তারা। শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ। প্রথমে স্থানীয় জহির উদ্দিনের নেতৃত্বে ১৫ জন যুবক জাঙ্গালিয়াগাতিতে আসেন। অছিম উদ্দিনের বাড়িতে সবার জায়গা না হওয়ায় পাশের বসাকপাড়ার হরেন্দ্রনাথ বসাক ওরফে হারান মাস্টারসহ গ্রামের আরো কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। অছিম উদ্দিন ও হারান মাস্টারের বাড়ির দুটি টিনের ঘরে তারা থাকতেন। আরেকটিকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। বাড়িটি ঘিরে তৈরি করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। গ্রামের লোকজন ক্যাম্পটিতে খাদ্য সরবরাহ করতেন।

অছিম উদ্দিন, হারান মাস্টার ছাড়াও কিছুদিন পর বাঙালি সেনা সদস্য লুৎফর রহমান অরুণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে এসে ক্যাম্পে যোগ দেন। শুরু করেন যুবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া। ধীরে ধীরে শত শত মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা এ ক্যাম্পে যোগ দিতে থাকেন। অপরদিকে ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এসে এ বাহিনীতে যুক্ত হন সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল লতিফ মির্জা, বিমল কুমার দাস, শহীদুল ইসলাম, আমিনুল ইসলাম হীরু, খোরশেদ আলমসহ ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। এভাবে পলাশডাঙ্গা যুব শিবির একটি বেসামরিক বাহিনী রূপে দাঁড়িয়ে যায়।

৬ জুন সবার সম্মতিক্রমে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংগঠনের নাম দেন ‘পলাশডাঙ্গা যুব শিবির’। আব্দুল লতিফ মির্জাকে এ শিবিররেরর পরিচালক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসুর সাবেক জিএস আব্দুস সামাদ ও মনিরুল কবিরকে সহকারী পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ কলেজের সাবেক ভিপি মরহুম গাজী সোহরাব আলীকে সর্বাধিনায়ক (কমান্ডার ইনচার্জ) করা হয়। এ ছাড়া সহকারী অধিনায়ক নিযুক্ত হন বিমল কুমার দাস ও আমজাদ হোসেন মিলন (প্রয়াত সাবেক সংসদ সদস্য)। আর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার করা হয় মরহুম লুৎফর রহমান অরুণকে। তার অধীনে থাকে কয়েকটি কোম্পানি।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবির বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন হলেও পরিচালিত হতো সম্পূর্ণ সামরিক কায়দায়। শিবিরের একটি ব্যাটালিয়ন, ছয়টি কোম্পানি, ১৮টি প্লাটুন ও ৫০টি সেকশন ছিল। সংগঠনটিতে ধীরে ধীরে যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে সাত শতাধিক যোদ্ধার বিশাল এক বাহিনীতে পরিণত হয় এটি।

যুদ্ধের দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের তৎকালীন সহকারী পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আব্দুল আজিজ সরকার বলেন, নবাব সিরাজদ্দৌলার পলাশীর প্রান্তরের নামানুসারে ‘পলাশ’, একটি খালের ওপরে অবস্থিত বাড়িতে প্রথম আশ্রয় নেয়ার সূত্রে ‘ডাঙ্গা’, সবাই ছিলাম যুবক সেই কারণে ‘যুব’ আর সংগঠন মানে ‘শিবির’। এ চার শব্দের মিলে নামকরণ হয়েছিল পলাশডাঙ্গা যুব শিবির। তিনি আরো বলেন, তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক এ কে শামসুদ্দিন (পরবর্তীতে ঢাকায় শহীদ) প্রথম এ সংগঠনে ১৩টি অস্ত্রের (রাইফেল) যোগান দিয়েছিলেন। খুবই গোপনে অজপাড়া গাঁয়ে এ সংগঠনের কার্যক্রম চলছিল।

কিন্তু এক সময়ে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের কার্যক্রম টের পেয়ে যায় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা। এ অবস্থায় ১৯৭১ সালের ১৭ জুন ভোরে হঠাৎ ক্যাম্পটিতে আক্রমণ করে পাকিস্তানীরা। তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ক্যাম্পে থাকা শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। প্রচন্ড যুদ্ধে মৃত্যু হয় এক পাক সেনার। পরে পাকিস্তানিদের আরো একটি ব্যাটালিয়ন এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ করলে বাধ্য হয়ে পিছু হটেন তারা। এরপর পাকিস্তানিরা গ্রামটিকে হামলা চালিয়ে অন্তত ২৬জন মানুষকে হত্যা করে।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের নেতৃত্বে ছোট-বড় মোট ৫১টি যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে। এর মধ্যে বৃহৎ আকারের ছিল ১৮টি। সিরাজগঞ্জের দক্ষিণাঞ্চল ছাড়াও পাবনার ফরিদপুর, সাঁথিয়া, চাটমোহর, নাটোরের গুরুদাসপুর ও বগুড়ার শেরপুরসহ চলনবিলের সীমান্তবর্তী এলাকায় সংগঠনের সদস্যদের বিচরণ ছিল ।

উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত হয় সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ শাহ শরীফ জিন্দানীর (রহ.) মাজার এলাকায়। ১১ নভেম্বর সংগঠিত এ যুদ্ধে ১৩০ জন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার নিহত হন। যুদ্ধ শেষে ক্যাপ্টেন সেলিমসহ নয় পাকিস্তানী সেনা, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধসরঞ্জামসহ আত্মসমর্পণ করেন। এ যুদ্ধের স্মৃতি রক্ষায় ২০১৫ সালের ৭ অগাস্ট এখানে উদ্বোধন করা হয় রণাঙ্গনে পলাশডাঙ্গা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ও স্মৃতি জাদুঘর।

তবে মুক্তিযুদ্ধে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের বিশাল অবদান থাকলেও ইতিহাসের তেমনভাবে জায়গা পায়নি। এ সংগঠন সম্পর্কে দেশের মানুষও তেমন জানে না। এ সংগঠনের নেতৃত্বে এতোগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হলেও সংগঠনটি বা কোনো মুক্তিযোদ্ধাই কোনো স্বীকৃতি পাননি।

আরও