রংপুর জেলায় বছরে পেঁয়াজের গড় চাহিদা রয়েছে ৫০-৫৮ হাজার টন। চাহিদার তুলনায় বছরে গড় উৎপাদন হয় ৩০-৪৪ হাজার টন। সে হিসাবে এ জেলায় প্রতি বছরই পেঁয়াজের ঘাটতি রয়েছে। তবে ২০২২-২৩ মৌসুমে ৩ হাজার ৩২ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদন হয় ৪৪ হাজার ৫২৩ টন। সেই হিসোবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় উৎপাদন বাড়ায় ঘাটতি কিছুটা কমেছে। চলতি রবি মৌসুমে ঘাটতি আরো কমবে বলে মনে করেন কৃষি কর্মকর্তারা। মৌসুমে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৮৭৫ টন, যা গত বছরের চেয়ে ৪৬৮ হেক্টর বেশি।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ মৌসুমে পেঁয়াজের চাহিদা ছিল ৫৫ হাজার ৪৪৮ টন। ২ হাজার ২১৩ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ২৭ হাজার ৯৯৫ টন। ঘাটতি ছিল ৩০ হাজার ৭ টন। ২০২০-২১ মৌসুমে চাহিদা ছিল ৫৬ হাজার ৬৯০ টন। বিপরীতে ২ হাজার ৮৩৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৩৫ হাজার ৪০০ টন। ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ৮৩২ টন। ২০২১-২২ মৌসুমে চাহিদা ছিল ৫৭ হাজার ৪৬৯ টন। বিপরীতে ২ হাজার ৯০৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৩৮ হাজার ৫২৫ টন। ঘাটতি ছিল ২২ হাজার ৭৯৬ টন। এছাড়া ২০২২-২৩ মৌসুমে চাহিদা ছিল ৫৮ হাজার ২৫০ টন। ৩ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৪৪ হাজার ৫২৩ টন। ঘাটতি ছিল ১৮ হাজার ১৮৫ টন।
রংপুর বিএডিসির (সবজি বীজ) উপপরিচালক নির্ম্মাল্য কুমার দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষকরা উৎপাদিত পেঁয়াজ ঘরের মধ্যে ছায়াযুক্ত স্থানে অনেক দিন সংরক্ষণে রেখে বাজারজাত করতে পারবেন। যে স্থানে পেঁয়াজ আবাদ বেশি হয়, সেখানে যেকোনো প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষায়িত হিমাগার নির্মাণ করলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি সরকারের আমদানি ব্যয়ও সাশ্রয় হবে। সাধারণত কৃষক যেকোনো পণ্যের বাজার মূল্য পেলেই আবাদে উৎসাহী হন।’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, পেঁয়াজ আবাদে অনুকূল পরিবেশ থাকলেও সংরক্ষণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এছাড়া উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে না পারায় কৃষকও উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। যদিও পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদার চেয়ে ঘাটতিতে থাকা রংপুর জেলায় উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পরামর্শ অব্যাহত রেখেছে কৃষি বিভাগ।
রংপুর জেলার মধ্যে পীরগঞ্জ উপজেলা পেঁয়াজ আবাদ বেশি হয়। এ উপজেলার বড়দারগা ইউনিয়নের পার্বতীপুর গ্রামের কৃষক মো. তোসাদ্দেকুর রহমান বাদল বণিক বার্তা বলেন, ‘৩৫ শতক জমিতে ২০ দিন আগে মুড়ি কাটা পেঁয়াজ বপন করেছেন। ১২ শতকে বড় আকারের চার মণ পেঁয়াজ বীজ বপন করেছেন। বাকি জমিতে ছোট আকারে দুই মণ বীজ বপন করেছেন। বড় আকারের পেঁয়াজ বীজ কিনেছেন প্রতি মণ ৪ হাজার টাকা এবং ছোট আকারের পেঁয়াজ বীজ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। সব মিলিয়ে প্রায় ৫৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। প্রতি শতকে যদি মোটামুটি আবাদ হয় তাহলে দেড় মণের মতো পেঁয়াজ উৎপাদন হবে। মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকার নিচে বিক্রি হলে আর্থিক ক্ষতি হবে। গত বছর সাড়ে ১৭ শতক জমিতে ৩০ মণ পেঁয়াজ পেয়েছিলাম। প্রতি মণ পেঁয়াজ প্রকারভেদে ১ হাজার ১০০-১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছিলাম।’
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ চাষের উপযোগী। বছরে দুইবার (খরিপ এবং রবি) পেঁয়াজ উৎপাদন হলেও মূল উৎপাদন হয় রবি মৌসুমে। সাধারণত সরাসরি জমিতে বীজ ছিটিয়ে অথবা অন্যত্র বীজ ছিটিয়ে ২০-৩০ দিন পর চারা তুলে জমিতে রোপণ করা হয়। আবার সরাসরি পেঁয়াজ (কন্দ) বা মুড়ি কাটা পেঁয়াজ জমিতে বপন করা হয়। পাতা পেঁয়াজ ৪৫ দিনে খাবার উপযোগী হলেও বীজ থেকে উৎপাদিত গাছে পেঁয়াজ পেতে চার-পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হয়। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পেঁয়াজ আবাদের উত্তম সময় হলেও নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত আবাদ করেন কৃষক। চলতি রবি মৌসুমে ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলার আটটি উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে ৬৯০ হেক্টর জমিতে।
পীরগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘গত বছর যে বীজ প্রতি মণ শুরুতে ১ হাজার ৫০০-২০০০ টাকায় কিনেছিলাম, এখন তা ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। মূলত পাবনা, কুষ্টিয়া এবং নরসিংদী থেকে পাইকাররা বীজ এনে বিক্রি করেন। এ বছর এমনিতে দেশব্যাপী পেঁয়াজের বাজার ঊর্ধ্বমুখী। এরপর আবার হরতাল ও অবরোধ শুরু হওয়ায় সময়মতো মানসম্পন্ন বীজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। আবার পাওয়া গেলেও সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। এবার ২৫ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছি।’
মিঠাপুকুর উপজেলার রাণীপুকুর ইউনিয়ন দৌলতনূরপুর গ্রামের কৃষক সহিদুজ্জামান শাহী প্রতি বছর পেঁয়াজের আবাদ করেন। এখন পর্যন্ত ৫০ শতক জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। আরো জমি প্রস্তুত করছেন। গত বছর দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলেন। প্রতি বিঘায় তিনি পেঁয়াজ পেয়েছিলেন প্রায় ৮০ মণ। খরচ হয়েছিল ৭৫ হাজার টাকা। প্রতি মণ বিক্রি করেছিলেন ১ হাজার ১০০-১ হাজার ২০০ টাকা। তবে প্রথম দিকে ভালো দাম পাওয়া গেলেও যখন সবার পেঁয়াজ বাজারে উঠতে শুরু করে তখন দাম নিম্নমুখী হয়ে যায়। তাই লোকসানের ভয়ে অনেক কৃষক পেঁয়াজ আবাদে আগ্রহী হন না বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জেলায় পেঁয়াজ আবাদ বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের পেঁয়াজ আবাদে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন পরামর্শ অব্যাহত রয়েছে। ফলে জেলায় পেঁয়াজের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।’