বর্ষা মৌসুমে ভাঙন রোধে মৌলভীবাজারের ধলাই নদে নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিরক্ষা বাঁধ। তবে সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় নির্মিত বাঁধের অনেক স্থান নাজুক অবস্থায় রয়েছে। প্রতি বছরই কিছু কিছু অংশে ভাঙন দেখা দেয়। শুধু ভাঙনকবলিত অংশ সাময়িক মেরামত করা হলেও স্থায়ী কোনো প্রকল্প নেয়া হয়নি আজ পর্যন্ত। এ কারণে পুরনো ভাঙন এখন বড় আকার ধারণ করেছে। এরই মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে বাঁধের ২৪টি স্থান।
অবশ্য পানি উন্নয় বোর্ড কর্তৃপক্ষের দাবি, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ১১টি। নতুন করে ভাঙন দেখা দেয়ায় আতঙ্কে রয়েছে নদের তীরের মানুষ। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে সৌসুমজুড়ে বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কা তাদের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, ধলাই নদ ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হয়ে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ দিয়ে মনু নদে মিশেছে। নদের প্রতিরক্ষা বাঁধ ছিল ১১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে সত্তরের দশকে অর্ধেক বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাকি অর্ধেক আশি ও নব্বইয়ের দশকে নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন সময় বাঁধ ভেঙে বর্তমানে টিকে রয়েছে ৭০ কিলোমিটার। বাকি ৪০ কিলোমিটার বিলীন হয়েছে। তবে এ অংশটুকু পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে না। এ কারণে ক্ষতি তেমন হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ২৮ মে কমলগঞ্জ উপজেলার চৈত্রঘাটে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। কয়েকদিন পর পানি কিছুটা কমলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৯ জুন পুনরায় ভাঙা অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে প্লাবিত হয় কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়ন ও সদর উপজেলার চাঁদনীঘাট ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম। সড়কে পানি ওঠায় জেলা শহরের সঙ্গে কমলগঞ্জ উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়। ঢলের পানিতে ডুবে মারা যায় দুই শিশু। এরপরই জোর দাবি ওঠে বাঁধ মেরামতের।
রহিমপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের উকিল আলী জানান, নদীপারের তিনটি স্থানে বড় ভাঙন রয়েছে। এর মধ্যে বদাইরচরে ভাঙন সবচেয়ে বড়। এসব স্থানে বাঁধ ভেঙে ১-২ ফুট পরিমাণ মাটি আছে। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকের ঘরবাড়ি বিলীন হতে চলেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভিটেমাটিহারা হবে গ্রামের ১০টি পরিবার।
সরজমিনে দেখা গেছে, রহিমপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বদাইরচরে নদীর বাঁ পাশে প্রায় ৩০০ ফুট অংশ ভেঙে পড়েছে। সেখানে এক ফুট পরিমাণ বাঁধ টিকে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাঁধের এমন অবস্থায় ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকটি পরিবার। নদে পানি বাড়লেই তারা বন্যার কবলে পড়তে পারে। পুরো বাঁধটি নদে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে অস্থায়ীভাবে মাটি ভরাট করে কয়েকবার বাঁধ মেরামত করা হয়েছে। কিন্তু তা টেকসই হয়নি। নদে পানি বাড়লেই বাঁধ ভাঙছে। এজন্য ব্লকের কাজ করে স্থায়ীভাবে মেরামতের দাবি জানান তারা।
পাউবোর তথ্যমতে, খরস্রোতা ধলাই নদের বাঁধ ভেঙে প্রতি বছরই দেখা দিচ্ছে বন্যা। বর্তমানে নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ১১টি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে মাধবপুর ইউনিয়নের ধলাইর পাড়, মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, সদর ইউনিয়ন নারায়ণপুর, কুমরাকাপন ও চৈতন্যগঞ্জে দুটি স্থান, রহিমপুর ইউনিয়নের চৈত্রঘাট, ছয়কুট ও রামচন্দ্রপুর গ্রামের তিনটি স্থান, ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল গ্রামে বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দেড় কিলোটার। কয়েকটি ভাঙন মেরামতের কাজ চলমান।
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঁধের কমলগঞ্জ পৌরসভা অংশের রামপাশা, কুমড়াকাপন, আলেপুর ও নরেন্দ্রপুর—এ চারটি স্থান বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে রামপাশায় প্রায় ২০০ মিটার এলাকা ধসে পড়েছে। ভারি বৃষ্টি হলে পুরো বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে পুরো এলাকা।
অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বাঁধ। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল, গোলেরহাওর ও শ্রীপুর, আদমপুর ইউনিয়নের হকতিয়ারখোলা, তিলকপুর, ঘোড়ামারা, বনগাঁও ও কেয়ালীঘাট, মাধবপুর ইউনিয়নের হিরামতি ও পাত্রখোলা, কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চৈতন্যগঞ্জ, নারায়ণপুর ও রামপুর। এছাড়া মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুরানন্দপুর, বাদে করিমপুর, খুশালপুর, রহিমপুর ইউনিয়নের ছয়কুট, চৈত্রঘাট ও লক্ষ্মীপুরসহ ২৪টি স্থানে বাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
এ ব্যাপারে পাউবো মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ধলাই নদের বাঁধগুলো পুরনো। খুবই নাজুক অবস্থায় রয়েছে বাঁধের বিভিন্ন স্থান। অনেক স্থানে বাঁধের অর্ধেক নদে বিলীন হয়ে গেছে। এরই মধ্যে সব ঝুঁকিপূর্ণ অংশের তালিকা করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই বাঁধের কাজ শুরু হবে। কিছু জায়গায় জরুরি ভিত্তিতে মাটি ভরাটের কাজ চলছে।’