দাতা সংস্থার সঙ্গে ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষের আগেই বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধনের পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের (বিবিএ)। কিন্তু কভিড অতিমারীসহ বিভিন্ন কারণে সময়মতো শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। বিশেষায়িত প্রকল্পটির পূর্তকাজ অবশ্য শেষের পথে। যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে আরো কয়েক মাস দেরি হলেও ২৬ নভেম্বর শেষ হচ্ছে টানেল টিউবের পূর্তকাজ। সেই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চায় সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওইদিন সকালে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে টানেলের সবচেয়ে জটিল টানেল টিউবের শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার উদযাপনে অংশ নেবেন।
সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে, টানেল বোরিং ছাড়াও দুটি টানেলের মধ্যে ক্রস প্যাসেজ নির্মাণের কাজ সবচেয়ে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই এসব কাজ শেষ করা হয়েছে। তাছাড়া বিশ্বজুড়ে কভিডের ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দাতা সংস্থার ঋণচুক্তির নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই মূল কাজ শেষ করার বিষয়টিকে বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখছে সেতু কর্তৃপক্ষ। যদিও টানেলের উভয় প্রান্তে স্ক্যানার বসানো, সার্ভিস এরিয়া নির্মাণ, সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। প্রকল্পে স্ক্যানারসহ বেশ কয়েকটি কাজের পরিকল্পনা না থাকলেও দেশীয় বাস্তবতায় পরবর্তী সময়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের একটি সংশোধনীসহ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উঠতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে স্ক্যানারসহ বেশকিছু কাজই প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব বা ডিপিপিতে ছিল না। কিন্তু দেশীয় বাস্তবতায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে টানেলবহির্ভূত বেশকিছু নতুন কাজ যুক্ত হয়েছে। মূল টানেলের পূর্তকাজ কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই শেষ হওয়ায় সেটি আপাতত উদযাপন করা হবে। বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকৌশলী ছাড়াও দেশীয় অনেক কর্মী ও প্রকৌশলী টানেল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। সফল এ প্রকল্পের মূল কাজ সমাপ্তি উদযাপনের মাধ্যমে টানেল নির্মাণের প্রকল্পটি স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এজন্য ২৬ নভেম্বর টানেল নির্মাণ প্রকল্প অংশে অনুষ্ঠান করবে সেতু কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টানেল প্রকল্পের মূল ভৌত কাজ শেষের পথে। কিন্তু মেগা প্রকল্পটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে আনুষঙ্গিক অনেক কাজ করতে হবে। এ কারণে প্রকল্পটির মেয়াদ আরো এক বছর বাড়াতে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মূলত টানেল নির্মাণকাজ শেষ হলেও অর্থ ছাড়করণ, বাহ্যিক বিবিধ কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত সরকারি উচ্চপর্যায় থেকে আসেনি। তবে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের মধ্যে উদ্বোধনের মাধ্যমে যানবাহন চলাচলের জন্য টানেল খুলে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৩ শতাংশ। তবে আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৮৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম টানেল টিউবের (নর্থ) ২ হাজার ৪৪৬ মিটার ও দ্বিতীয় টানেল টিউবের ২ হাজার ৪৫৮ মিটার বোরিং কাজ, প্রথম ও দ্বিতীয় টিউবের লেন স্লেভ, তিনটি ক্রস প্যাসেজের (সংযোগ পথ) কাজ, ভায়াডাক্ট, উভয় টিউবের পেভমেন্ট স্লেভ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। পূর্ব অংশ ও পশ্চিম অংশের রেইন শেল্টারের আর্ক মেশ শেল ইনস্টলমেন্ট ও পেইন্টিং কাজ শেষ হলেও পিসি এনডোরেন্স শিট ইনস্টলমেন্ট কাজ এখনো চলমান। পশ্চিম অর্থাৎ পতেঙ্গা প্রান্ত ও পূর্ব (আনোয়ারা) প্রান্তে ২ মেগাওয়াটের সাময়িক বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। উভয় প্রান্তে স্থাপন করা হয়েছে ১৫ মেগাওয়াটের সাব-স্টেশন। টানেল নির্মাণ এলাকার উভয় প্রান্তে সারফেসে মিঠা পানির প্রবাহের লক্ষ্যে দুটি করে মোট চারটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। ২৬ নভেম্বরের মধ্যে বাকি পূর্তকাজও শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
পূর্তকাজ শেষপর্যায়ে হলেও উত্তর ও দক্ষিণ টিউবের ফায়ার প্রুপ বোর্ড ও ডেকোরেটিভ বোর্ড স্থাপনের কাজ শেষ হয়নি এখনো। টানেলের ইলেকট্রোমেকানিক্যাল ওয়্যার্সের মধ্যে কেবল কানেকশন, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, লাইটিং কাজ চলমান থাকলেও জেট ফ্যান ইনস্টলমেন্ট সম্পন্ন হয়েছে। উভয় প্রান্তের অ্যাপ্রোচ সড়কের ৫ হাজার ৩৫০ মিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৯৮ শতাংশ। তাছাড়া প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ৩৭৯ দশমিক ৪২৬১ একরের মধ্যে ৩৬৫ দশমিক ৩৯১১ একর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আনোয়ারা প্রান্তের নতুন প্রস্তাবিত ১৪ দশমিক শূন্য ৩৫ একর ভূমির যৌথ তদন্তের ফিল্ডবুক চূড়ান্তের কাজ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চলমান। ভূমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৮৭১ ব্যক্তির মধ্যে ২ হাজার ৩১৫ জনকে এরই মধ্যে ক্ষতিপূরণের চেক দেয়া হয়েছে। সার্ভিস এরিয়ার বাংলো, দুটি সেতু, ড্রেনেজ ও অভ্যন্তরীণ রোডসহ অন্যান্য কাজও চলমান। তবে সার্ভিস এরিয়া নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে কেবল ৫৮ শতাংশ।
জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশীদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির পূর্তকাজ শেষপর্যায়ে। তবে পূর্তকাজ শেষ হলেই চালু করা সম্ভব নয়। বিশেষায়িত প্রকল্প হওয়ায় নিরাপত্তাসহ আনুষঙ্গিক কাজ শেষ করার পরই যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে। যদিও জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টানেলের দুটি টিউবের বোরিং কাজ শেষ করতে পারায় সরকার সেটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করবে।
চীনা অর্থায়নে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিতব্য বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পটির ঠিকাদার চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি)। ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ ৪০ হাজার টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নে তাদের সঙ্গে ২০১৫ সালের ৩০ জুন চুক্তি হয়। পরে ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পাঁচ বছর অর্থাৎ ১ হাজার ৮২৬ দিনের মধ্যে ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। কাজ সমাপ্তির পর দুই বছর ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড রয়েছে চুক্তিতে।
মূল টানেলের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০৫ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া প্রভিশনাল সামের জন্য ৬৪৬ মিলিয়ন ডলার, সার্ভিস এরিয়ায় ৫৯ দশমিক ৮০ মিলিয়ন ডলার, ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে ৩ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন ডলার ও টাগবোটের জন্য ৯ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার চুক্তি করা হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও বেশ কয়েকটি কাজ ডিপিপিতে না থাকায় প্রকল্পের মূল ব্যয় কয়েকশ কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।