বরিশাল বিভাগের আঞ্চলিক ও মহাসড়কের ১৮টি পয়েন্টে ৩০টি ফেরি পরিচালনা করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ (ফেরি ডিভিশন) এবং বিআইডব্লিউটিসি। এর মধ্যে ১৭টি পয়েন্টে ২৬টি ফেরিই সওজের ফেরি বিভাগের। বাকি চারটি ফেরি পরিচালনা করছে বিআইডব্লিউটিসি। এসব ফেরির অধিকাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে প্রতিদিনই কোনো না কোনো পয়েন্টে দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে চরম ঝুঁকি নিয়ে এসব রুটে চলাচল করে যাত্রী ও চালকরা। তাছাড়া জরাজীর্ণ ফেরি প্রায়ই মাঝনদীতে বিকল হয়ে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
সওজ ও বিআইডব্লিউটিসি সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল-পিরোজপুর জেলা মহাসড়কের বেকুটিয়া, বরিশাল-মুলাদী জেলা সড়কের মীরগঞ্জ ও বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের লেবুখালীসহ ১৮টি পয়েন্টে ফেরি চলাচল করছে। সওজ বিভাগের ১৭টি পয়েন্টে পরিচালিত ২৬ ফেরির মধ্যে ২৪টির অবস্থাই জরাজীর্ণ। মাত্র দুটি নতুন ফেরি রয়েছে সওজের ফেরি ডিভিশনের। এছাড়া বাকি চারটি পয়েন্টে ফেরি পরিচালনা করছে বিআইডব্লিউটিসি। সওজ ও বিআইডব্লিউটিসি পরিচালিত অধিকাংশ ফেরির বয়স পাঁচ থেকে ২০ বছর। নেই অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। এজন্য তীব্র স্রোতের কারণে প্রায়ই মাঝনদীতে বিকল হচ্ছে ফেরিগুলো। অনেক সময় ঘন কুয়াশার কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা।
সূত্রটি জানায়, বিআইডব্লিউটিসি ভোলা ও বরিশালের মধ্যবর্তী লাহারহাট-ভেদুরিয়া সেক্টরে চারটি ইউটিলিটি ফেরি পরিচালন করছে। এর মধ্যে দুটির বয়স ১০ বছরের বেশি। এছাড়া কিছুদিন ধরে একটি ফেরি বিকল অবস্থায় মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী মেঘনা নদীতে ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ রুটে মাত্র তিনটি ফেরি চলাচল করছে। এজন্য যানবাহন পারাপারে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
সওজ পরিচালিত ফেরির মধ্যে বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কের লেবুখালী ও বরিশাল-খুলনা মহাসড়কের বেকুঠিয়া পয়েন্টে দুটি ফেরি নতুন। অন্য ২৪টি ফেরিই পুরনো। এ বিভাগের অধিকাংশ ফেরির ইঞ্জিন বারবার মেরামত করেও পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
সর্বশেষ গত শনিবার বরিশাল-বাবুগঞ্জ-মুলাদী-হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ সড়কের মীরগঞ্জ পয়েন্টে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ ওজনের বৈদ্যুতিক খুঁটিবাহী একটি ট্রাক ফেরির গ্যাংওয়ের উপরে উঠে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এতে পেছনে ছিটকে পড়ে পল্টুনসহ ট্রাকের অর্ধেক নদীতে নিমজ্জিত হয়। এ দুর্ঘটনার পর ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ওই রুটে যানাবাহন পারাপার বন্ধ ছিল। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে ওই রুটে চলাচলকারীরা।
এছাড়া গত নভেম্বরে চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর-ভোলা-বরিশাল-মোংলা-খুলনা মহাসড়কের বেকুঠিয়া পয়েন্টের কঁচা নদীতে কয়েকটি বাস ও ট্রাক নিয়ে পারাপারের সময় জ্বালানিবাহী নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষে সওজের একটি ফেরির তলা ফেটে যায়। ওইসময় চালক দ্রুত নিকটবর্তী একটি চরে ফেরিটি তুলে দেন। এতে বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া গেলেও নৌযানটি ডুবে যায়।
এদিকে দক্ষিণাঞ্চলে সড়ক বিভাগের অধিকাংশ ফেরিতেই রাতে চলাচলের জন্য ফগলাইটসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কোনো সরঞ্জাম নেই। এজন্য প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষায় পায়রা, কঁচা ও বলেশ্বরের মতো বড় নদী পাড়ি দিতে অনেক সময় ফেরির ইঞ্জিন মাঝনদীতে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে খরস্রোতা নদ-নদীর প্রবল স্রোতে যাত্রী, যানবাহনসহ ফেরিগুলো ভেসে যায়। এছাড়া শীতে প্রচণ্ড কুয়াশায় এসব ফেরি চলাচলের মতো ফগলাইটসহ প্রয়োজনীয় নৌ-সংকেত সরঞ্জামেরও অভাব রয়েছে। অথচ এসব ফেরি দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ নৌপথ অতিক্রম করেই প্রতিদিন পারাপার হচ্ছে হাজারো যাত্রী ও যানবাহন।
বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা জানান, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনের অর্ধেকটা সময় ফেরিঘাটে কাটে। ফেরির কারণে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হচ্ছে না।
বরিশাল-মুলাদী সড়কের মীরগঞ্জ পয়েন্টে চলাচলকারী ফেরির চালক কবির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ ফেরির অবস্থাই বেহাল। এজন্য ঘাট থেকে ছেড়ে মাঝনদীতে গেলে প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। এতে যাত্রী ও চালকরা চরম বিপাকে পড়ে।
এ ব্যাপারে বরিশাল সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সুশীল কুমার সাহা বণিক বার্তাকে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে নতুন ও ভালো মানের ফেরির চাহিদা আমরা সদর দপ্তরকে জানিয়েছি। সড়ক দপ্তরও চেষ্টা করছে ফেরিগুলো মেরামত করে পরিচালনা করতে। অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত ওজনের কারণেই ফেরি দুর্ঘটনা ঘটে। ফেরিগুলো আধুনিকায়নে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।