মানবতার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান

স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি সদরুদ্দিন আগা খানকে নিয়ে

স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি সদরুদ্দিন আগা খানকে নিয়ে

প্লেবয় ইমেজের কারণে পিতা যে কখনই তাকে নিজারি ইসমাইলি সম্প্রদায়ের পরবর্তী নেতা হিসেবে বেছে নেবেন না, সে কথা বেশ ভালোভাবেই জানতেন প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান। এ কারণে আধ্যাত্মিক সাধনার বদলে মানবিক সাধনাকেই পথ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি, যার শুরু ১৯৫৮ সালে জাতিসংঘে যোগদানের মাধ্যমে।

সদরুদ্দিন আগা খানের পিতা স্যার সুলতান মাহোমেদ শাহ (তৃতীয় আগা খান) ছিলেন নিজারি ইসমাইলি সম্প্রদায়ের ৪৮তম ধর্মীয় নেতা ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের সাবেক সভাপতি। অন্যদিকে মা ছিলেন ফরাসি। সে হিসেবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য—এ দুই বিপরীতমুখী সংস্কারেরই উত্তরাধিকারী ছিলেন সদরুদ্দিন আগা খান।

তবে সদরুদ্দিনের সাংস্কৃতিক ঝোঁকটা ছিল পাশ্চাত্যের দিকেই বেশি। পড়াশোনা করেছেন হার্ভার্ডে। সেখানে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছেন হেনরি কিসিঞ্জারকেও। এক ধরনের প্লেবয় ইমেজও ছিল। দীর্ঘদেহী সদরুদ্দিনের চেহারাও ছিল খানিকটা শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ান ধাঁচের। সব মিলিয়ে তার বহিরঙ্গে পাশ্চাত্যের ছাপ ছিল শতভাগ।

কিন্তু মননে পুরোপুরি প্রাচ্যের মানুষই থেকে গিয়েছেন আগা খান। বর্ণবৈষম্যের মতো বিষয়গুলোকে বরাবরই ঘৃণার চোখে দেখে এসেছেন তিনি। ছাত্রাবস্থাতেই যোগ দিয়েছেন অশ্বেতাঙ্গ মার্কিন জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে গঠিত ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপলে। জাতিসংঘে যোগদানও অনেকটা সে জায়গা থেকেই। ১৯৫৮ সালে মিসরে আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের সময় আবু সিম্বেলের পুরাকীর্তি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তহবিল সংগ্রহের জন্য তাকে নিয়োগ দেয় ইউনেস্কো। শুরু হয় জাতিসংঘে সদরুদ্দিন আগা খানের দীর্ঘ ও বর্ণিল ক্যারিয়ার।

চার বছরের মাথায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনে (ইউএনএইচসিআর) ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। একই সংস্থায় হাইকমিশনার পদে নিয়োগ পান ১৯৬৫ সালে। ওই সময় থেকে টানা ১২ বছর ইউএনএইচসিআর প্রধানের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন সদরুদ্দিন আগা খান।

মানবিক দায়িত্বে নিয়োজিত থাকলেও আগা খান সবচেয়ে বেশি দক্ষতা দেখিয়েছেন মধ্যস্থতাকারী ও কূটনীতিক হিসেবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়েও তাকে এ ভূমিকাই নিতে হয়েছে বেশি।

ইউএনএইচসিআরের প্রধানের পদটি পুরোপুরি অরাজনৈতিক। এক্ষেত্রে তাকে মানবিক ও সামাজিক বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলতে হয় বেশি। অর্থাৎ সংকটের গোড়ায় হাত দেয়ার বদলে ইউএনএইচসিআরকে ব্যস্ত থাকতে হয় মূলত প্রভাব প্রশমন নিয়ে।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্ভূত শরণার্থী সংকটের মোকাবেলা করতে গিয়ে আগা খানকে তার পেশাগত দায়িত্বের বাইরে ভূমিকা রাখতে হয়েছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও। পরবর্তী সময়ের নীতিগবেষক ও ঐতিহাসিকরা জানাচ্ছেন, আগা খান বুঝতে পেরেছিলেন সংকট সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সদিচ্ছা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এছাড়া সংকট সমাধানের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য সব পথও তাকে খোলা রাখতে হয়েছে।

এক্ষেত্রে আরো একটি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় সদরুদ্দিন আগা খানকে। কার্যোদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গেই যতটা সম্ভব ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়েছে তাকে।  যেকোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের অবনমন হলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার  গ্রহণযোগ্যতা হারানোর যে আশঙ্কা ছিল, সে বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন তিনি।

শরণার্থী সংকটের সমাধান খুঁজতে গিয়ে ওই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সঙ্গেও ক্রমাগত জড়িয়ে পড়ছিলেন আগা খান। এক্ষেত্রে তার নিরপেক্ষ অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা ছিল অনেক। কোনো এক পক্ষের প্রতি তার  পক্ষপাতিত্ব প্রমাণ হলে তিনিসহ গোটা ইউএনএইচসিআরই ওই সময় বিতর্কিত হয়ে পড়ত।

তাকে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে জনসম্মুখে কথা বলতে গিয়ে। ওই সময় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময়ে সদরুদ্দিন আগা খানকে সতর্ক থাকতে হয়েছে, যাতে তা কোনোভাবে কাউকে ক্রুদ্ধ করে না তোলে। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে তাকে কথা বলতে হয়েছে ইউএনএইচসিআরের সংজ্ঞায়িত কার্যপরিধির আওতায় থেকেই।

কিন্তু ইতিহাস বলছে, বিষয়টি তখন ছিল প্রায় অসম্ভব। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ চলে গিয়েছিল পয়েন্ট অব নো রিটার্নের দিকে। এ কারণে ইউএনএইচসিআরের কর্মপরিধির লঙ্ঘন না করে শুরুতে শরণার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের যে লক্ষ্য হাতে নিয়েছিলেন সদরুদ্দিন আগা খান, তা ছিল অসম্ভব।

এক পর্যায়ে বিষয়টি অনুধাবনের পর ইউএনএইচসিআরের ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক সংলাপের পথ ধরেন তিনি। এ সময় ইরান ও পাকিস্তানের ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারত-পাকিস্তান এবং আওয়ামী লীগ ও ইসলামাবাদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু তার এ উদ্যোগেরও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তত্কালীন আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি।

বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার সব পথ খোলা রাখতে গিয়ে তখন কঠিন সমস্যায় পড়তে হয়েছে আগা খানকে। জুনে ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে এক বৈঠকের পর ঢাকা, চুয়াডাঙ্গা ও বেনাপোলের কয়েকটি শরণার্থী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র ঘুরে যান তিনি। এ সফর শেষে তিনি জাতিসংঘের তত্কালীন আন্ডারসেক্রেটারি ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স মি. গায়ারকে বলেছিলেন, এসব প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে কয়েকজন প্রত্যাবাসিত শরণার্থীকে দেখে আমি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছি, এরা ইসলামাবাদের সাজানো শরণার্থী।

যদিও সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আগা খান দাবি করেন, তিনি দেখে এসেছেন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসার পথে। যেকোনো সময় শরণার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে সে সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ সমালোচনার শিকার হন তিনি। এক পর্যায়ে ওই সময় যে বিষয়টি তিনি এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলেন, সেটিই ঘটে। তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানিদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ওঠে।

আগা খান পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে এ অবস্থানের কারণ সম্পর্কে বলেছিলেন, শরণার্থী সংকট সমাধানের জন্য ওই মুহূর্তে ‘পাকিস্তানে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ (ইয়াহিয়া খান) সঙ্গে তার সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই হতো। এর পরও তাকে নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত থাকে। বিষয়টি নিয়ে ওই সময় ভারতের রাজ্যসভায়ও তুমুল সমালোচনা হয়। এমনকি কেউ কেউ তার ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এক পর্যায়ে সদরুদ্দিন আগা খান এক সংবাদমাধ্যমে বলেন, আমি ভারতপন্থীও নই, পাকিস্তানপন্থীও নই। আমি শরণার্থীপন্থী। ওই সময় তিনি ঘোষণা দেন, সংকট সমাধানের প্রয়োজনে ইউএনএইচসিআরের প্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন তিনি। আগা খানের সে বক্তব্যের সারমর্ম ছিল, যদি তার পরিচয় ও এ-সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিষয়াদি জাতিসংঘের প্রয়াসকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়, তাহলে তিনি সরে দাঁড়াতে প্রস্তুত।

ওই সময় পাকিস্তানের মতো ভারতের সঙ্গেও সুসম্পর্ক নষ্ট করতে চাইছিলেন না আগা খান। ভারতের রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে যা-ই বলা হোক না কেন, জাতিসংঘের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে দেশটির সরকারের মনোভাবে তার প্রতিফলন ঘটবে না। 

পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেয়ার সময় আরো সতর্কতা অবলম্বন করেন তিনি।

প্রকৃতপক্ষে ওই সময় গোটা সংকট নিয়ে নয়াদিল্লির যে পরিকল্পনা ছিল, তার বড় একটি অংশজুড়ে ছিলেন সদরুদ্দিন আগা খান। কারণ নয়াদিল্লির নেতৃস্থানীয়রাও সে সময় প্রমাণ করতে চাইছিলেন, ভারত বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। যদিও ততদিনে সবাই বুঝে গিয়েছিল পূর্ব বাংলার নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর ছাড়া শরণার্থী সংকটের সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব না। এ কারণে সদরুদ্দিন আগা খান শরণার্থীদের স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসনের যে প্রস্তাবকে ঘিরে তার কার্যক্রম সাজিয়েছিলেন, তাকে কোনোভাবে প্রত্যাখ্যান না করেই সেটিকে ভুল প্রমাণ করতে চাইছিল ভারত।

ইতিহাস বলছে, নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্তও ইন্দিরা গান্ধী পূর্ব পাকিস্তান সংকটের সামরিক ও কূটনৈতিক—দুটি পথকেই সমস্যা সমাধানের জন্য একটিকে আরেকটির বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছিলেন। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর জন্য সদরুদ্দিন আগা খানকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি।

ভারত সরকারের প্রতিনিধিরাও তাকে বারবার বলেছিলেন, নিজস্ব ব্যক্তিগত পরিচিতি ও ইসলামাবাদের প্রভাবশালীদের সঙ্গে তার খাতিরকে কাজে লাগাতে, যাতে করে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর জন্য রাজি হন।

সদরুদ্দিন আগা খান ওই সময়ে গোটা সংকটকেই বিবেচনা করছিলেন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। শুধু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নয়, ইউএনএইচসিআরের দায়িত্বে থাকাকালীন প্রতিটি সংকটকেই নিরপেক্ষ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাধানের প্রয়াস নিয়েছিলেন। কিন্তু তার এ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিকে বরাবরই সবাই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখেছে। এ কারণে পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ ও ১৯৯১ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব পদে মনোনীত হওয়ার পরেও নিয়োগ পাননি তিনি। প্রথমবার অতিপাশ্চাত্যমুখী অবস্থানের অজুহাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন, পরেরবার ইরাকে মানবিক সহায়তা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের ভেটোক্ষমতা প্রয়োগ করে তার মনোনয়ন ভণ্ডুল করে দেয়।

আরও