নিক্সনের টোস্ট

স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি রিচার্ড নিক্সনকে নিয়ে

স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে বিজয়ের মাসজুড়েই স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন প্রেক্ষিত সম্পর্কে নানা আয়োজন থাকছে বণিক বার্তায়। আজকের উপস্থাপনাটি রিচার্ড নিক্সনকে নিয়ে

১৯৬৯ সালের ১ আগস্ট। ‘অ্যাপোলো-১১’ মিশনের চন্দ্র বিজয়ের অল্প কয়েকদিন পরের কথা। অনেকটা স্বস্তির হাসি নিয়েই লাহোর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ থেকে নেমে এলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। এর ঠিক আগে ভারত ঘুরে এসেছেন তিনি।

এর আগে ১৯৫৩ সালে আইজেনহাওয়ার প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে আরো একবার ভারত-পাকিস্তান সফর করে গিয়েছেন নিক্সন। ওই সময় থেকেই নয়াদিল্লির হর্তাকর্তাদের ওপর এক প্রকার বিরক্ত তিনি। অন্যদিকে জোটনিরপেক্ষতার নামে নয়াদিল্লিও বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এক ধরনের নিরাসক্ত মনোভাব প্রদর্শন করে চলেছে। ফলে বরাবরই ভারতীয়দের নিয়ে বিরূপ মনোভাব দেখিয়ে এসেছেন নিক্সন, যাকে রীতিমতো ‘বর্ণবাদী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন পরবর্তীকালের কোনো কোনো ঐতিহাসিক।

সে তুলনায় পাকিস্তানের শাসক ও সামরিক বাহিনীর প্রতি নিক্সন বরাবরই বেশ ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে এসেছেন। আগের সফরেও তিনি দেখেছেন, পাকিস্তানি নেতাদের ওপর কমিউনিস্টদের কোনো প্রভাবই নেই। উপরন্তু তাদের মনোভাবও বেশ মার্কিনবান্ধব। এ কারণে ভারতে নিরুত্তাপ সফরের পর লাহোরের অনুকূল পরিবেশ নিক্সনের জন্য ছিল বেশ স্বস্তিদায়ক।

রাতে লাহোরের এক সরকারি অতিথিশালায় বেশ উত্ফুল্লচিত্তেই তার সম্মানে দেয়া পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নৈশভোজে অংশ নেন রিচার্ড নিক্সন। সাড়ে ১০টায় নৈশভোজের আগে ইয়াহিয়া খানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে টোস্ট করেন নিক্সন। এ সময় এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যও রাখেন তিনি। এ বক্তব্যেই এশিয়া ও পাকিস্তান সম্পর্কে নিক্সন প্রশাসনের মনোভাব বেশ পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।

বক্তব্যের শুরুর দিকে উচ্ছ্বসিত নিক্সন নিজের ২২ ঘণ্টার পাকিস্তান সফরটিকে তুলনা করলেন অ্যাপোলো-১১-এর নভোচারীদের চাঁদে অবস্থানের সঙ্গে (ওই মিশনের নভোচারীরাও চাঁদে প্রায় ২২ ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন)। নৈশভোজের ওই ভাষণে নিক্সন এশিয়া মহাদেশ সম্পর্কে ওয়াশিংটনের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি আগামী ২৫ বছরের মধ্যে এশিয়ার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৩০০ কোটিতে। এ সময় বিশ্বের এ প্রান্ত হয় সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করবে, যা আমরা এশিয়া-প্যাসিফিক তথা গোটা বিশ্বেই দেখতে চাচ্ছি অথবা বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলো এখানেই ঘটবে।’

নিক্সনের বক্তব্যে উঠে আসে, ওই সময় এশিয়ার যেসব বিষয়কে তখন ওয়াশিংটন তার নিজের জন্য সমস্যা বলে বিবেচনা করছিল, সেসব সমস্যা সমাধানে পাকিস্তানের বন্ধুত্বকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছিল হোয়াইট হাউজ। নিক্সন বলেন, ‘আজ থেকে ২৫ বছর আগে কে ভাবতে পেরেছিল, পৃথিবীর দুজন মানুষ চাঁদের বুকে পা রাখবে? এটি সম্ভব হয়েছে, কারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করেছে, পরিকল্পনা করেছে। এর ফল হিসেবে তারা সাফল্যও পেয়েছে। এ ধরনের পরিকল্পনা ও কাজ বা মেধার প্রাচুর্য কোনো এক জাতিতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং বিশ্বের সর্বত্রই জনগণের মধ্যে তা দেখতে পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে আমরা যেসব বিষয়কে বড় ধরনের সমস্যা বলে বিবেচনা করছি, বিশেষত এশিয়ায়, সেগুলো সমাধানে এসব মেধাকে একসঙ্গে কাজে লাগানোই যায়। আমরা অন্তত এক প্রজন্মের জন্য এ অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি অর্জন করতে পারি। তার অর্থ হবে, এ অঞ্চলসহ গোটা বিশ্বে আমরা যে ধরনের উন্নয়ন দেখতে চাই, তা নিশ্চিত করা।’

ইয়াহিয়া খানকে উদ্দেশ করে নিক্সনের বক্তব্য, ‘মি. প্রেসিডেন্ট আমি এখানে এসেছি পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবে। যখন আমি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এখানে সফর করে গিয়েছিলাম, তখনো আপনারা বেশ উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্ব দিনে দিনে আরো জোরদার হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে আমি নিজেও কিছুটা ভূমিকা রেখেছি। এখন আমি নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এ কারণে এখন আমার প্রভাব আরো বেশি। আমি আশ্বাস দিচ্ছি, আমাদের এ বন্ধুত্বের জন্য, যা আমার হূদয়ের অত্যন্ত কাছাকাছি, আমি আমার কাজ অব্যাহত রাখব; যাতে আমরা একসঙ্গে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারি। আমরা হয়তো চাঁদ বা মঙ্গলে যাওয়ার বিষয় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করব না, যদিও আমাদের পক্ষে এ ধরনের বড় উদ্যোগে একসঙ্গে কাজ করা খুবই সম্ভব। বরং আমি যেসব সমস্যার কথা বললাম, সেগুলো সমাধানের জন্য সমান উত্তেজনাকর অ্যাডভেঞ্চারে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি।’

পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ইয়াহিয়া খানের প্রতি এ বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব ও সমর্থন বজায় রেখেছিলেন রিচার্ড নিক্সন। তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছে ইয়াহিয়া ও নিক্সনের মধ্যে ওই সময় আদানপ্রদান হওয়া চিঠিগুলোয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৭১ সালের ১ জুলাই নিক্সন মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের হাতে ইয়াহিয়া খানের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে ওই সময়ে ইয়াহিয়া খানের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর প্রতি নিজের সমর্থন ব্যক্ত করেন নিক্সন।

এতে দেখা যায়, আগের একটি চিঠিতে ‘উপমহাদেশের শান্তির প্রতি ক্রমবর্ধমান হুমকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ’ এবং ‘পাকিস্তানের দাতা দেশগুলোর কনসোর্টিয়াম দেশগুলোর এ-সংক্রান্ত অবস্থান পরিষ্কার করার গুরুত্ব তুলে ধরায়’ ইয়াহিয়া খানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন রিচার্ড নিক্সন।

নিক্সন বলেন, ‘আপনার ১৮ জুনের চিঠিতে আপনাদের অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান হুমকি নিয়ে আপনার আশঙ্কার বিষয়টিকে আমি বেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এ প্রবণতা আসলে পাকিস্তান ও ভারতের বন্ধুরা সবার জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি আন্তরিকভাবেই বিশ্বাস করি, এ ধরনের প্রবণতাকে সংশ্লিষ্ট সবার সদিচ্ছা ও ধৈর্য দিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব।’

ওই সময় উদ্ভূত শরণার্থী সমস্যার সমাধানে ইয়াহিয়া খানের গৃহীত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে নিক্সন চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘জাতি, বর্ণ  ও ধর্ম নির্বিশেষে সব শরণার্থীকে পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে ও তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আপনি যে বিবৃতিগুলো দিয়েছেন; সেগুলো তাদের প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে আপনার গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে আপনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, সেটির গুরুত্বও আমরা অনুধাবন করতে পারছি। সাংবিধানিক সরকারের পুনঃস্থাপন এবং জনগণের নির্বাচিত সরকারের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ফ্রেমওয়ার্ক সম্পর্কে নিজ দেশের জনগণের উদ্দেশে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন, সেটিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে আমি মনে করি।’

এ সময় দাতাদেশগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ইয়াহিয়ার উদ্বেগ দূর করেন রিচার্ড নিক্সন। তিনি বলেন, ‘প্যারিসে গত ২১ জুন অনুষ্ঠিত এইড-টু-পাকিস্তান কনসোর্টিয়ামের বৈঠক নিয়ে যে বিভ্রান্তির উদ্ভব হয়েছে তা দুঃখজনক। এবং এ নিয়ে আপনার দেশে যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে, সেটিও বোধগম্য। আপনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসংবলিত বৈদেশিক সহায়তা প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়ে দেয়া বক্তব্যের সঙ্গেও আমি একমত।’

চিঠিতে নিক্সন উল্লেখ করেন, ‘আসলে কনসোর্টিয়ামের বৈঠকটি ছিল অনানুষ্ঠানিক। বৈঠকে কেউই পাকিস্তানে অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়া নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চায়নি এবং দিতেও চায়নি। উপরন্তু কনসোর্টিয়ামের সব সদস্য একযোগে প্রতিশ্রুত বা ভবিষ্যৎ সহায়তা প্রত্যাহার করে নেয়ার মতো কোনো সাধারণ অবস্থানও তৈরি হয়নি। কনসোর্টিয়ামের সদস্যরা এখন বিশ্বব্যাংক ও ফান্ড মিশনগুলোর চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং আপনার সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার চূড়ান্ত সংশোধনীর অপেক্ষায় রয়েছে। আমার ধারণা, যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় উন্নয়ন কার্যক্রমগুলোর বাস্তবায়ন আবার শুরু হলে কনসোর্টিয়ামের আনুষ্ঠানিক বৈঠক আয়োজন করা হবে। তাতে পাকিস্তানকেও সঙ্গে রাখা হবে। সেক্ষেত্রে যেসব জায়গায় নতুন করে সহযোগিতার প্রয়োজন, সেগুলো নিয়েও পর্যালোচনা সম্ভব হবে।’

এতে আরো বলা হয়, পাকিস্তানজুড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কার্যক্রম আবার শুরু করার মতো পর্যাপ্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে আমরা মার্কিন আইনি কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে এবং নতুন চুক্তির ভিত্তিতে এগোব। এক্ষেত্রে আমরা জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকে পূর্ব পাকিস্তানে নতুন করে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সম্প্রসারণ ঘটাব। একই সঙ্গে এতে অবদান রাখার জন্য অন্যদেরও আহ্বান জানাব।

আরও