১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে—পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে ঢাকাসহ তৎকালীন সমগ্র পূর্ববাংলায় চালানো হয় বর্বর সামরিক অভিযান, যার লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিসত্তা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নির্মূল করা। সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বিশেষ করে আবাসিক হলগুলো হয়ে ওঠে হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্রস্থল। রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারও রক্ষা পায়নি এই নির্মম আক্রমণ থেকে। ভয়াল রাতে কোয়ার্টারের ৪৫ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করা হয়। সেই বিভীষিকাময় রাতের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফুল বানু—যিনি গুলিবিদ্ধ হয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। তার স্মৃতিতে আজও জীবন্ত সেই গণহত্যার নির্মম দলিল।
ফুল বানু তখন থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারে। তার স্বামী আব্দুল খালেক ছিলেন হলের মালি। স্বামী, এক বছরের শিশুপুত্র ও ছোট বোন নুরীকে নিয়ে ছোট্ট সংসার। কিন্তু ২৫ মার্চের সেই রাত তাদের জীবন চিরতরে বদলে দেয়।
২৫ মার্চ দিনভর উত্তেজনার পর ফুল বানুর মনে আতঙ্ক বাড়ছিল। তার ভাষায়, ‘আব্বা এসে কয়, ঢাকার শহরে যুদ্ধ বলে লাইগা যাইব।’ তবু স্বামী তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘কিচ্ছু অইব না’ বলে। কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আশ্বাস ভেঙে পড়ে।
ফুল বানুর স্বামী শহীদ আব্দুল খালকের পরিচয়পত্র ছবি : ফুল বানুর সৌজন্যে প্রাপ্ত
রাত প্রায় ১২টা। হঠাৎ শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ। চলে বোমা বিস্ফোরণ ও তীব্র গুলি। ফুল বানু বলেন, ‘ট্যাংক দিয়া আর্মি রোকেয়া হলের গেট ভাঙতাছে শুনলাম। কিছুক্ষণ পরই বাসার বারান্দায় বুটের শব্দ।’ আতঙ্কে তিনি স্বামীকে দরজা না খুলতে অনুরোধ করেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই দরজায় লাথি মেরে ভেঙে ফেলে পাকিস্তানি সেনারা।
এরপর শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ। ‘দরজা থেইকাই গুলি আর গুলি, কি যে গুলি মারতাছে আর মারতাছে’- স্মৃতিচারণ করেন ফুল বানু। স্বামী আব্দুল খালেক ও বোন নুরী গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। ফুল বানু নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার কোলে থাকা এক বছরের শিশুটি রক্তে ভিজে যায়। তবে ভাগ্যক্রমে শিশুটির শরীরে গুলি লাগেনি।
‘আমার রানে গুলি লাগছে। পা নাড়তেও পারি না, অবশ অইয়া গেছে’- বলেন তিনি। চারপাশে তখন শুধু রক্ত আর লাশ। ‘নুরী, আমার ও আমার স্বামীর রক্তে পুরা ফ্লুর ভাইসা গেছে।’
এই নির্মম পরিস্থিতিতেও তিনি বুকের সঙ্গে চেপে রাখেন তার সন্তানকে। আরেক হাতে জড়িয়ে রাখেন একটি কোরআন শরিফ। যেন এই দুইটাই তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। রাতভর তিনি সেভাবেই পড়ে ছিলেন। স্টাফ কোয়ার্টারের পাশের বাসার আহত এক কিশোর এসে তাকে পানি খাইয়ে দেয়। সকালে আবার সেনারা এসে মৃতদেহ সরাতে থাকে। স্বামী ও বোনের লাশ যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন ছোট্ট ছেলেটি তাদের পিছু পিছু হাঁটতে থাকে—‘ও খালি আব্বু আব্বু কইতাছে।’ এই দৃশ্য আজও ফুল বানুর মনে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে।
এক পর্যায়ে এক সেনা শিশুটিকে গুলি করতে উদ্যত হলে আরেকজন বাধা দেয়। ‘আল্লায় বোধহয় আর্মিডারে পাঠাইছে’ বলেন ফুল বানু।
পরদিন ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ কিছু সময়ের জন্য শিথিল করা হলে কয়েকজন ছাত্র এসে তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানো সহজ ছিল না। ‘একটা গাড়িও থামল না’ তিনি স্মরণ করেন। শেষ পর্যন্ত কোলে করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর বর্তমান শামসুন্নাহার হলের গেট সংলগ্ন বধ্যভূমি খনন করে রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারে শহীদদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয় ছবি : দৈনিক আজাদ, ২১ এপ্রিল ১৯৭২।
হাসপাতালে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম। পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে দীর্ঘদিন তিনি কষ্ট ভোগ করেন। ‘খালি ব্যান্ডেজ করছে। চিকিৎসা কিছুই হয় নাই,’ তার অভিযোগ। ১৫ দিন পর ক্ষতস্থানে পচন ধরলে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করা হয়।
দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটানোর পরও তার জীবন স্বাভাবিক হয়নি। পঙ্গুত্ব তাকে আজীবনের জন্য গ্রাস করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, স্বাধীনতার দিনও তার জন্য ছিল বেদনার। ‘সব হারাইয়া দেশ স্বাধীন অইল’ বলতে বলতে সেদিন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
স্বাধীনতার পর কিছু আর্থিক সহায়তা পেলেও জীবনযুদ্ধ থামেনি। স্বামীর অনুপস্থিতি, শারীরিক অক্ষমতা এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাকে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। তবু তার কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে বেশি শোনা যায় বেদনা আর স্মৃতির ভার।
ফুল বানুর এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি ২৫ মার্চের গণহত্যার এক জীবন্ত দলিল। যেখানে আমরা দেখি—কীভাবে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ, নারী-শিশু নির্বিচারে হত্যার শিকার হয়েছে। আর সেই অন্ধকার রাতের ভেতর থেকেও উঠে এসেছে বেঁচে থাকার এক অবিশ্বাস্য গল্প।
ফুল বানুর কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চালানো গণহত্যার সাক্ষ্য বহন করে। তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত বেদনার ইতিহাস নয়; এটি ২৫ মার্চের গণহত্যার এক অকাট্য দলিল। তার বেচে থাকা যেন একদিকে নির্মমতার সাক্ষ্য, অন্যদিকে জীবনের এক অনমনীয় শক্তির প্রতীক।
রোকেয়া হলের সেই রাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং অসংখ্য নিরীহ মানুষের রক্ত, কান্না ও আত্মত্যাগের ফল। ফুল বানুর কণ্ঠে উচ্চারিত প্রতিটি স্মৃতি তাই ইতিহাসের দায় হয়ে থাকে। এই স্মৃতিকথা ভুলে না যাওয়ার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানিয়ে যাওয়ার।
[মো. আল- আমিন ও বাশার খান সম্পাদিত ‘রোকেয়া হল গণহত্যা : আহত ও প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য’ শীর্ষক গ্রন্থে ‘ফুল বানু’র সাক্ষাৎকার অবলম্বনে রচিত।]