আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল হলেও মূলত আশ্বিন পর্যন্ত চলে বৃষ্টিপাত। এ সময় নদ-নদীর ভাঙনে বিলীন হয় তীরবর্তী স্থাপনা ও কৃষিজমি। অসংখ্য নদ-নদী ও বঙ্গোপসাগরের সান্নিধ্যে থাকা বরিশাল বিভাগও ভাঙা-গড়ায় বারবার আপন রূপ পরিবর্তন করছে। উপকূলবর্তী এ বিভাগের ছয় জেলার ৪০ উপজেলায় বিভিন্ন নদ-নদীর তীরে অন্তত ১৫৮টি স্থান ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বরিশাল সদর উপজেলা, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ। এছাড়া পটুয়াখালী ও ভোলার কিছু স্থান রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। এসব স্থানে ভাঙনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কমপক্ষে ১৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা, কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ, তেঁতুলিয়া, ইলিশা, আন্ধারমানিক, পায়রা, আগুনমুখা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, জয়ন্তি, বলেশ্বর ও কচা নদ-নদীর ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে শত শত ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এর মধ্যে শুধু বরিশালের ১০ উপজেলায় বসতিপূর্ণ ৮০টিরও বেশি স্থান ভাঙনের অতিঝুঁকিতে রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভাঙনরোধে এসব স্থানে প্রায় ৬০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চিহ্নিত ৮০টির মধ্যে ৩৫ স্থানের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। বাকি ৪৫টি স্থানে ভাঙন ঠেকাতে বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ পেলে দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে।
আড়িয়াল খাঁর পাড়ের বাসিন্দারা জানান, বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের দক্ষিণ আইচা গ্রামের প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। এ স্থানে ভাঙন নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই ভাঙছে গ্রামটি।
ওই গ্রামের কৃষক বারেক মুন্সী বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। এখন আমাদের নতুন করে জমি খুঁজতে হবে।’
দক্ষিণ আইচা গ্রামের পাশেই চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামছড়ি গ্রাম। কীর্তনখোলা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি বিলীন হলেও টেকসই পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বিগত সরকারের সময় ভাঙনরোধে কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও বর্ষায় আবারো ভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হাওলাদার বলেন, ‘দুই দফায় ভিটা বদলেছি। নদী আমাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। গত বছর কিছুটা কম ভাঙলেও এবার মনে হয় বেশি ভাঙবে। টানা বৃষ্টি আর জোয়ার-ভাটার স্রোতও প্রবল। পানি উন্নয়ন বোর্ড দুই বছর আগে ব্লক দিলে কিছু এলাকা রক্ষা পায়।’
পাউবোর তথ্য বলছে, আড়িয়াল খাঁর বাবুগঞ্জ অংশে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের শিকারপুর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিমানবন্দর এলাকার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে অপরাংশের ভাঙন। এছাড়া মুলাদী উপজেলা অংশের সফিপুর ইউনিয়নের ভেদুরিয়া থেকে ঘুলিঘাট পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার জায়গা নদে বিলীন হয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় চার শতাধিক পরিবার। একই উপজেলার জয়ন্তী নদীর তীরবর্তী মৃধারহাট, ষোলঘর, ভেদুরিয়া, বাটামারা, আলীমাবাদ এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। বানারীপাড়া ও উজিরপুর উপজেলার সন্ধ্যা নদীতীরের ১০ ইউনিয়ন, বাকেরগঞ্জ উপজেলার কারখানা নদীতীরের চারটি ইউনিয়নে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
হিজলা উপজেলার মেমানিয়ার চর দুর্গাপুর গ্রামের সুফিয়ান সরদার বলেন, ‘অবহেলিত এ চরে নদীভাঙন নিত্যদিনের ঘটনা। গত পাঁচ বছরে সাত বার বসতভিটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। তার পরও নদী আমাদের পিছু ছাড়ছে না। এখন আবার নদী বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। আবার ভাঙনের কবলে পড়লে কোথায় ঘর তুলব তা জানি না। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুষ্ক মৌসুমেও জিওব্যাগ বা ব্লক দিয়ে বাঁধের ব্যবস্থা করলে বর্ষা মৌসুমে আমরা ভাঙন থেকে রক্ষা পেতাম। বর্ষা মৌসুমে জিওব্যাগ দেয়া হয় ঠিকই, তবে সেগুলো স্রোতে চলে যায়।’
বরিশাল নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক কাজী মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ভাঙন দেখা দিলে ছোট ছোট প্রকল্প নিয়ে প্রকারান্তরে পাউবোর কিছু কর্মকর্তারই লাভ হয়। নদী ভাঙনরোধে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। হোয়াংহো নদীকে বলা হতো চীনের দুঃখ। নদীটি এত বেশি ভাঙত যে লোকালয় হারিয়ে যেত। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে হোয়াংহো এখন আর ভাঙে না। এ অঞ্চলে নদীভাঙন থাকবে। ভূমি রক্ষায় নদীর গতিপথ পর্যালোচনা করে মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করলে নদী শাসন হবে, ভাঙনও রোধ হবে। সেসব না করে বালির বস্তা আর ব্লক ফেলে বড় বড় এসব নদীর ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়।’
বরিশাল পাউবোর প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের মধ্যে বরিশাল জেলায় ১০ নদীর বাঁধ দুর্বল। এছাড়া পিরোজপুরে ১২, ঝালকাঠিতে ১০, পটুয়াখালীতে ৫৭, বরগুনা ২৬ ও ভোলায় ৪৩টি বাঁধ দুর্বল।
সার্বিক বিষয়ে পাউবো বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরিশাল জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কীর্তনখোলা, সন্ধ্যা, তেঁতুলিয়া, আড়িয়াল খাঁ ও মেঘনার তীরবর্তী ৮০টিরও বেশি স্থান ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভাঙনরোধে এসব স্থানে প্রায় ৬০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। চিহ্নিত ৮০টির মধ্যে ৩৫ স্থানের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। বাকি ৪৫টি স্থানে ভাঙন ঠেকাতে বরাদ্দ আসেনি। বরাদ্দ পেলে দ্রুতই কাজ শুরু করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলে নদীভাঙন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বর্ষায় ভাঙন দেখা দেয়। বিশেষ করে অতিবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাসে নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও ভাঙন শুরু হয়। নদীর প্রবল স্রোতেও দেখা যায় ভাঙন। পাউবো এ সমস্যা সমাধানে স্থায়ী পরিকল্পনা করছে।’