রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র সেলফোন অপারেটর হিসেবে টেলিটকের যাত্রা বিএনপি জোট সরকারের সময়ে। যন্ত্রাংশ কেনা নিয়ে শুরুতেই বিতর্কে জড়ায় প্রতিষ্ঠানটির নাম। যাত্রার ১৬ বছরেও ব্যবসায়িক দিক থেকে লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি টেলিটক। মাঝের দুই বছর বাদে এ দীর্ঘ সময়ের পুরোটাই লোকসানের বৃত্তে আটকে থেকেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখনো টেলিটকের ব্যবসার মূল ভিত্তি রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। আবার গ্রাহকদের উন্নতমানের পণ্য ও টেলিকম সেবা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা এ প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদেরও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অথচ সরকারি নানা সুবিধা নিয়ে দেশের অন্যতম সেরা সেলফোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রমাণের সুযোগ টেলিটকের ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টেলিটক এখন অনেকটাই পৌঁছে গেছে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে’—এমন দাবি টেলিটকের। প্রতিষ্ঠার সময় বলা হয়েছিল, সরকারি সব কাজে অপারেটরটির সংযোগ ব্যবহার হবে। যদিও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাধ্য করা না হলে টেলিটকের সংযোগ ব্যবহারে আগ্রহ নেই সরকারি দপ্তরগুলোতে। প্রতিষ্ঠানটির সেবা গ্রহণে অনীহা রয়েছে আইনপ্রণেতাদের অনেকের। অন্য তিন অপারেটরের মধ্যে সবচেয়ে কম সংযোগ যেটির, তারও সংযোগ সংখ্যা সাড়ে তিন কোটির বেশি। বর্তমান নামে বেসরকারি অপারেটরটি সেবা চালু করেছে টেলিটকের পরে। এদিকে ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর যাত্রা করা দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটরটির সংযোগ অর্ধকোটিও ছাড়ায়নি। ডিসেম্বর শেষে টেলিটকের সংযোগসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ লাখ ২৭ হাজার।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বণিক বার্তাকে বলেন, শুরুতে অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে। সে অবস্থা থেকে টেলিটককে বের করে আনার জন্য এরই মধ্যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে পারেনি টেলিটক। এতে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে তাদের। তবে যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন হলে শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়াবে।
গ্রাহকসংখ্যার হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেলফোন অপারেটর চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না মোবাইল। শীর্ষ তালিকায় থাকা সেলফোন অপারেটরদের বেশির ভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত। অথচ দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের একমাত্র সেলফোন অপারেটর টেলিটক বাজার দখলের লড়াইয়ে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। বাজার দখলের লড়াইয়ে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না পাওয়া, সেবার মনোভাবে অপেশাদারিত্ব, দক্ষ ও উপযুক্ত কর্মী বাহিনীর অভাবে টেলিটক নিয়ে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এর ওপর প্রতি বছর বড় অংকের লোকসান দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের তথ্য মতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৬ বছরে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সেলফোন অপারেটর টেলিটক এ যাবৎ লোকসান করেছে ১ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। গত চার বছরেই টেলিটক লোকসান করেছে ৯৯৩ কোটি টাকা।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে টেলিটকের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুরুর পর থেকে শুধু দুই অর্থবছরেই লাভের মুখ দেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১০-১১ অর্থবছরে ১১ কোটি ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪৬ কোটি টাকা মুনাফা করে টেলিটক। এর বাইরে ২০০৫-০৬ অর্থবছর ৫৬ কোটি টাকা, ২০০৬-০৭ অর্থবছর ৬১ কোটি, ২০০৭-০৮ অর্থবছর ১৬২ কোটি, ২০০৮-০৯ অর্থবছর ১১০ কোটি, ২০০৯-১০ অর্থবছর ২৯ কোটি, ২০১১-১২ অর্থবছর ১৭ কোটি, ২০১৩-১৪ অর্থবছর ২০ কোটি, ২০১৪-১৫ অর্থবছর ২০২ কোটি, ২০১৫-১৬ অর্থবছর ৪১ কোটি, ২০১৬-১৭ অর্থবছর লোকসান ২৫৭ কোটি, ২০১৭-১৮ অর্থবছর ২৭৭ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছর ১৯০ কোটি ও ২০১৯-২০ অর্থবছর টেলিটক ২৬৯ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
লোকসানের বাইরে সরকারের বড় অংকের পাওনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কাছে। টেলিটকের কাছে থ্রিজি তরঙ্গ বরাদ্দ বাবদ সরকারের পাওনা ১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। বকেয়া আদায়ে একাধিকবার তাগাদা দিলেও তা আদায় করতে পারেনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পরে থ্রিজি তরঙ্গ বরাদ্দের ফি বাবদ বকেয়া অর্থ ইকুইটিতে রূপান্তরের প্রস্তাব দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। তবে সে প্রস্তাবে এখনো সাড়া দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়।
টেলিটকের প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ২০১০-১১ সাল পর্যন্ত সময়ের ওপর বিশেষ নিরীক্ষা করে বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল। অডিট অধিদপ্তরের সেই প্রতিবেদনে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আপত্তি তোলা হয়। সেসব আপত্তির মধ্যে ছিল প্রি-পেইড সিমকে পোস্টপেইডে রূপান্তর করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়া, বাজারদরের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে সিমকার্ড কেনা, ভিওআইপির অবৈধ কার্যক্রমে ফ্রি আইএসডি কল করতে দেয়াসহ কোম্পানির ক্ষতির কয়েক ডজন কারণ উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। এর বাইরে বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কমপ্লায়েন্স অডিট প্রতিবেদনেও বড় ধরনের অনিয়মের বিষয় উঠে আসে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, টেলিটক নিয়ে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সেবা তৃণমূলে পৌঁছে দিতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সেই সব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন হলে লোকসানের ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।
আইনপ্রণেতাদের টেলিটকের সংযোগ ব্যবহারে অনাগ্রহের কারণ হিসেবে এ সংসদ সদস্য জানান, আমাদের প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে টেলিটকের সংযোগ দেয়া আছে। দুটি সেট ব্যবহার করতে হয় বলে অনেকেই টেলিটকের সংযোগটি ব্যবহার করে না। একাধিক হ্যান্ডসেট ব্যবহার করলে হারিয়ে যাওয়ায় একটি সেটই ব্যবহার করছি আমি। আর বর্তমান নাম্বারটি সব জায়গায় পরিচিত হওয়ায় নতুন কোনো সংযোগ ব্যবহার করলে সেটি জানাতে সময় লাগবে। তাই পুরনো নাম্বারটিই ব্যবহার করি।
পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে টেলিটক যাত্রা শুরু করে ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর। সে সময় অনুমোদিত মূলধন ধরা হয় ২ হাজার কোটি টাকা। ২০০৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১৫ বছরের জন্য লাইসেন্স পায় টেলিটক। ২০০৮ সালের ২১ মে ৬৪৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে ৬৪ লাখ ৩৮ হাজার ৬৩৯টি সাধারণ শেয়ার ১ হাজার টাকা হারে নির্ধারণ করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নামে ইস্যু করা হয়।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন ‘আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি টেলিটক লোকসানে যাবে, যাচ্ছেও। যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে তা পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। এটার কোনো দরকারই নেই। সরকারের উচিত প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেয়া। সরকারের সঙ্গে কোনো কোম্পানি জয়েন্ট ভেঞ্চারে থেকেও প্রতিষ্ঠানটি চালাতে পারে। নিম্ন আয়ের দেশ ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশে এমন লোকসানি টেলিকম প্রতিষ্ঠান নেই। সরকারি চাকরি ও পাবলিক পরীক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অনেকেই বাধ্য হয়ে প্রতিষ্ঠানটির সেবা নিচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এভাবে টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেকসই হয় না।’
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, টেলিটক একটি রাজস্ব খাতভুক্ত সরকারি কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও প্রেষণের বদলে লিয়েন দেখিয়ে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে উচ্চহারে কোম্পানির পে-স্কেলে বেতন ভাতা পরিশোধ করা হয়। আবার দুর্বলতা রয়েছে টেলিটকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনো কোম্পানিটির বিপুল পরিমাণ পুঞ্জীভূত সম্পদের বাস্তব যাচাই করা হয়নি। রেভিনিউ অ্যাসুরেন্সের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় যথেষ্ট জালিয়াতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফাইন্যান্স ও অডিট বিভাগে উপযুক্ত জনবল নিয়োগ দেয়া হয়নি।
এসব বিষয় নিয়ে টেলিটকের এমডি মো. সাহাব উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে টেলিটকের প্রতিযোগিতা করতে হয়। আবার সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুধু লাভ করবে এ রকম ভাবনা থেকেও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হয় না। বাজারে একটি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতেই টেলিটকের সূচনা হয়, সেই জায়গাটি অনেকটাই অর্জন করতে পেরেছে টেলিটক।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেলিটকের লোকসানের হিসাব খাতাকলমে যতটা বেশি, বাস্তবে তার তুলনায় অনেক কম। টেলিটকের ‘ক্যাশ ফ্লো’ ইতিবাচক ধারাতেই রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো চাইলেই টেলিটক বিনিয়োগ করতে পারে না। তবে বর্তমান সরকার যেভাবে নীতিসহায়তাসহ অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে তাতে টেলিটক অচিরেই গ্রাহক প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হবে। আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের মধ্যেই লাভের মুখ দেখবে টেলিটক।