জলবায়ু পরিবর্তন ও অপুষ্টির প্রভাবে হাম-ডেঙ্গুর হটস্পট বরিশাল বিভাগ

একটা সময় ডেঙ্গু ছিল নগর এলাকার রোগ। ২০১৯ সালের পর থেকে রোগটি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে গত বছর থেকে রোগটি বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে শনাক্ত হচ্ছে।

একইভাবে আলোচিত হাম ও হাম উপসর্গের রোগীও এ বিভাগে বেশি শনাক্ত হচ্ছে। আক্রান্তের মতো দুটো রোগে মৃত্যুর হারও ঢাকার পরই এ বিভাগে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপুষ্টিজনিত কারণে দ্রুত রোগ-ব্যাধির হটস্পটে পরিণত হয়ে উঠছে বরিশাল বিভাগ। চলমান সংকট কমাতে বিভাগে জলবায়ুর ঝুঁকি প্রশমনের পাশাপাশি পুষ্টি কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১৭ হাজার ২১৪ জন। বিভাগ হিসেবে ঢাকার পরই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী রয়েছে বরিশালে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৫০ জন। আর বরিশালের ছয় জেলা মিলিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৫৭৯ জন। এর পরই চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৯৪১ ও খুলনায় ২ হাজার ২১২ জন।

ডেঙ্গুতে আক্রান্তের মতো মৃত্যুর পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের পরই বরিশালের অবস্থান। চলতি বছর গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ২৬ জন ঢাকা বিভাগে ও ১২ জন খুলনা বিভাগে মারা গেছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বরিশাল বিভাগে মৃত্যু হয়েছে সাতজনের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরগুনা বা বরিশালের অন্য জেলাগুলো দারিদ্র্যপীড়িত। এসব জেলার মানুষের প্রধান পেশা হলো কৃষি ও মৎস্য আহরণ। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত মেগা অবকাঠামো পরিবেশ ও কৃষি উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলেছে। আমরা ধারণা করতে পারি, একটি জেলা হঠাৎ করে রোগাক্রান্ত হওয়ার পেছনে এ বিষয়গুলো ভূমিকা রাখতে পারে। হয়তো সেখানে মাছ আহরণ কমে গেছে। কিংবা কোনো বিশেষ ফসল বা যে ফল সেখানে বেশি হতো সেটা এখন কম হচ্ছে। অথবা মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। এক কথায় আমিষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। আর এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক পুষ্টির ওপর। ফলে এখানের জনস্বাস্থ্যের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে উঠেছে।’

২০২৫ সালে হঠাৎ করে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু সংক্রমণ বেড়ে যায়। ওই বছর শুধু বরগুনা জেলাতেই ১০ হাজারের মতো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। মারা যান ৫৮ জন। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বরগুনাকে ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই আলোচনায় আসে বরগুনাসহ পুরো বরিশাল বিভাগই। চলতি বছর বরগুনায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩৯৮ জন। অন্যদিকে ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে এবার বেড়েছে রোগী। এ বছর ঝালকাঠিতে ৯৬০ ও পিরোজপুরে ৮৪৫ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগের ডেঙ্গু পরিস্থিতি বাড়ার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় খাবার পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও পানিতে আয়রন, কোথাও আর্সেনিক বেশি। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সেখানে রান্না ও খাওয়ার জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। আর ডেঙ্গুর জন্মই হয় পরিষ্কার পানিতে। আরেকটি বিষয় আমরা দেখেছি, নোনা পানিতেও ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা জন্মায়। ফলে উপকূলবর্তী জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গু বেশি ছিল। এ বছর পিরোজপুর ও ঝালকাঠিতে বেশি। সঠিক ব্যবস্থাপনা না করলে পরিস্থিতি আরো খারাপ আকার ধারণ করবে।’

ডেঙ্গুর মতো হাম পরিস্থিতিও বরিশাল বিভাগে উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮ হাজার ৪০৮ জনের শরীরে। এ রোগে মারা গেছে ৯৬ জন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের হাম শনাক্তের সংখ্যা ৫৮১ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৯ জন। হাম শনাক্তে বরিশাল বিভাগের ওপরে আছে ঢাকা ৯৮৯, চট্টগ্রাম ২ হাজার ৩১৫, রাজশাহী ১ হাজার ৩৩৮, সিলেট ৭০১ ও ময়মনসিংহে ৬৯৬ জন।

নিশ্চিত হাম আক্রান্তের দিক থেকে বরিশাল বিভাগের অবস্থান নিচে হলেও মৃত্যুতে ঢাকার পরই বরিশালের অবস্থান। ১৫ মার্চ থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৬ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৬০ জন ও এর পরই বরিশালে ১৯ জন। পরের অবস্থান চট্টগ্রামে ১০ জন।

বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত বছর এ জেলায় হঠাৎ ডেঙ্গু বেড়ে যায়। এ বছর পাশের জেলাগুলোতে সংক্রমণ বেশি। এর পেছনে অপুষ্টিই বড় কারণ বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। এসব এলাকায় মা তার শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বুকের দুধ পান করাতে পারেন না। মা নিজেও অপুষ্টিতে ভুগছেন এবং শিশুরাও অপুষ্টিতে ভুগছে। যে কারণে এখানে যেকোনো রোগ সহজেই মানুষকে কাবু করে ফেলতে পারছে।’

সার্বিক বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরিশাল ক্রমেই ডেঙ্গু ও হামের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে পরিবেশগত প্রভাবের পাশাপাশি পুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। পুরো বিভাগেই অপুষ্টির সমস্যা রয়েছে। এখানের মায়েরা শিশুদের দুধ পান করাতে পারেন না। শিশুরাও দুর্বল। আসলে অপুষ্টি যেকোনো রোগীকে সহজেই কাবু করে ফেলে। সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি।’

আরও