যন্ত্রাংশ, সুতা, রঙসহ তাঁত পণ্যের বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। রয়েছে বিদ্যুৎ সমস্যা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ফলে তাঁতিরা এখন খুব একটা লাভবান হতে পারছেন না। তার পরও দুই বছর করোনা মহামারীসহ নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে বাংলা নববর্ষ ও দুই ঈদকে সামনে রেখে কিছুটা সরগরম হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাঁতপল্লী। সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তাঁত মালিকরা।
তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া ও চৌহালী উপজেলায় বেশির ভাগ মানুষ তাঁত শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। ২০০৩ সালের তাঁতশুমারি অনুযায়ী সিরাজগঞ্জে তাঁতি পরিবারের সংখ্যা ১৪ হাজার ৮৭০ এবং তাঁত সংখ্যা ১ লাখ ৩৫ হাজারের অধিক। প্রতি বছর এ জেলায় তাঁত থেকে প্রায় ২৩ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদন হয়।
কালের পরিক্রমায় প্রয়োজনের তাগিদে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে কারখানাগুলোয়। উৎপাদন বাড়ায় প্রতিটি কারখানায় হস্তচালিত তাঁতের পাশাপাশি যন্ত্রচালিত পাওয়ার লুম দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ও থ্রি-পিস তৈরি করা হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন সরকারি হিসাব যা-ই হোক জেলায় অন্তত চার লাখ তাঁত (হ্যান্ডলুম, পাওয়ার লুম) রয়েছে। জেলার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির অন্যতম এ শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ১০ লাখ মানুষ। এসব তাঁতে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের জামদানি, সুতি জামদানি, কাতান, সুতি কাতান, সিল্ক, গ্যাস সিল্ক ও বেনারশি শাড়িসহ নানা নামের ও মানের শাড়ি। এছাড়া উন্নতমানের লুঙ্গি, থ্রি-পিস, থান কাপড় ও গামছাসহ বছরে প্রায় ৪০ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদন হচ্ছে। এখানে উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি ও গামছার কদর রয়েছে দেশে-বিদেশে।
তাঁত মালিকরা বলছেন, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাঙালি নারীর চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন নান্দনিক ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করা হচ্ছে, যা ৩০০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই সঙ্গে ২০০ থেকে ৩ হাজার টাকা মূল্যের লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে হরেক রকম গামছা, যা ৪০-৩০০ টাকা পর্যন্ত পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। এর পরও রঙ-সুতার দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয় মূল্যের সমন্বয় হচ্ছে না। ফলে তাঁতিরা লাভবান হতে পারছেন না। তার পরও টিকে থাকার স্বার্থে অনেকেই আঁকড়ে আছেন এ পেশা।
শাহজাদপুরের তাঁত শ্রমিক শাহ আলম ও সাহেদ আলী বলেন, ‘নববর্ষ ও ঈদকে সামনে রেখে এখন কাজ বেশি। তাঁত মালিকরা এখন বেশি সময় কারখানা চালু রাখছেন। ফলে আমাদের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আয়ও বেড়েছে।’
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাওঐতারা গ্রামের তাঁত মলিক আল আমিন বলেন, ‘তাঁত শিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে। তাঁতের বিভিন্ন উপকরণের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় এ পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শাড়ি তৈরি করে নামমাত্র মুনাফায় বিক্রি করতে হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী দেশের স্বনামধন্য কোম্পানিগুলো ওই শাড়ি কিনে তাদের লেবেল সাঁটিয়ে বাজারে বিক্রি করে কয়েক গুণ লাভে। ফলে আমরা উৎপাদনকারীরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পাওয়ারলুম অ্যান্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বৈদ্য নাথ রায় বলেন, ‘ব্যবসা যত খারাপ হোক তাঁত তো একেবারে বন্ধ করে দেয়া যায় না। তাঁত পণ্যের ওপর অনেকটা নির্ভর করে জেলার মানুষের ভালো মন্দ। জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এ শিল্পের কাঁচামাল ও উপকরণের বাজার নিয়ন্ত্রণ নেই। কাঁচামাল ও উপকরণের বাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় তারা ইচ্ছেমতো সুতা, রঙের দাম বৃদ্ধি করছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাঁতি। উপকরণের দাম বৃদ্ধিও কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। যার কারণে আগের তুলনায় এ বছর অর্ডার পেয়েছি অনেক কম। এ শিল্প রক্ষায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে এ বছর বাজার ভালো হবে বলে আশা করছি। ফলে কিছুটা হলেও তাঁত মালিকরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।’
সিরাজগঞ্জ তাঁত বোর্ডের লিয়াজোঁ অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মিথুন কুমার সরকার বলেন, ‘তাঁত মালিকদের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি সরকারি সব সুবিধা দেয়া হচ্ছে। আশা করছি, এবার সব মন্দা কাটিয়ে তাঁত মালিকরা লাভবান হবেন।’